অ্যামাজন প্রাইমে ২ নভেম্বর মুক্তি পায় তামিল ভাষার ছবি জয় ভীম। মুক্তির পর পরই চমকে দিয়েছে এ ছবি। মুক্তির মাস পেরোতে না পেরোতেই আইএমডিবি রেটিংয়ে শীর্ষ অবস্থানটি পেয়ে গেছে এ ছবি, গডফাদার ও শশাঙ্ক রিডেম্পশনকে পেছনে ফেলে। এ ঘটনায় ছবিটি দেখতে আগ্রহী ছিলেন না এমন কেউও নড়েচড়ে বসবেন নিশ্চয়ই।

জয় ভীম পরিচালনা করেছেন টিজে গনানভেল, চিত্রনাট্যও তার লেখা। গনানভেল দীর্ঘদিন সাংবাদিকতাও করেছেন। ছবির গল্প তৈরি হয়েছে একটি আলোচিত সত্য মামলার পরিণতি অনুসরণে। পুলিশি হেফাজতে নীচু জাতের এক তরুণ নিহত হওয়ার ঘটনায় তার স্ত্রী মামলা করেন। এ মামলাকে ঘিরেই আবর্তিত হয়েছে ছবির কাহিনী। অভিনেতা সুরিয়াকে দেখা গেছে আইনজীবী চান্দ্রুর চরিত্রে। বাস্তবেও উকিলের নাম ছিল চান্দ্রুই। তামিলনাড়ুর কাডালোর জেলার কাম্মাপুরাম থানায় নিহত হন রাজাকান্নু, তার স্ত্রী পার্বতী স্বামীর খোঁজ চেয়ে হেবিয়াস কর্পাস মামলা দায়ের করেন।

চান্দ্রু পরে মাদ্রাজ হাইকোর্টের বিচারক হন। জয় ভীমের পরিচালক গনানভেল ১৫ বছর আগে ২০০৬ সালে সাক্ষাত্কার নিয়েছিলেন সেই চান্দ্রুর। এটি ছিল মাদ্রাজ হাইকোর্টে সবচেয়ে লম্বা সময় ধরে চলা হেবিয়াস কর্পাস মামলা। সাক্ষাত্কার দেয়ার সময় চান্দ্রু গনানভেলকে বলেছিলেন এটাই তার উকিল জীবনের সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং মামলা ছিল। এ সাক্ষাত্কার নেয়ার পর থেকেই ঘটনাটি চলচ্চিত্রের মাধ্যমে তুলে ধরার ভাবনা মাথায় আসে গনানভেলের।

জয় ভীমের জন্য পরিচালক গনানভেল দর্শক, সমালোচক ও সহকর্মীদের প্রশংসায় ভাসছেন। ২০১৯ সালে গনানভেল সে ঐতিহাসিক মামলাকে বড় পর্দায় তুলে ধরার সিদ্ধান্ত নেন। ততদিনে সেই আইনজীবী চান্দ্রু বিচারক পদ থেকে অবসর নিয়েছেন। তার কাছে গিয়ে গনানভেল ছবি নির্মাণের অনুমতি চাইলেন। গনানভেলের পরিকল্পনা শুনে সেদিন চান্দ্রু খুব খুশি হয়েছিলেন এবং কালবিলম্ব না করে অনুমতি দিয়ে দেন। ছবিটি মুক্তির পর অনেকে সমালোচনা করে বলেছেন যে গনানভেল নিপীড়নের চিত্র রঙ চড়িয়ে দেখানো হয়েছে। কিন্তু গনানভেল জবাবে বলেছেন, তিনি বরং সবকিছু সীমিত করেই দেখিয়েছেন। সঙ্গে এটাও বলেছেন, তিনি এক বর্ণের মানুষের ওপর অন্য বর্ণের অত্যাচার দেখাতে চেয়েছেন—বিষয়টা সে রকম কিছু নয়। বরং তিনি ক্ষমতার অনৈতিক চর্চাকে উন্মোচন করতে চেয়েছেন। তার কথায়, ক্ষমতার অপব্যবহারের সুযোগ থাকলে তা সমাজের প্রান্তিক মানুষের ওপরই বেশি হয়। ‘বিশ্ববাসীকে আমি এটাই দেখাতে চেয়েছি।’

সাংবাদিক গনানভেল চিত্রনাট্যকার হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন ২০১১ সালে থ্রিলার পায়ানামের মাধ্যমে। এতদিন তিনি ছয়টি ছবির চিত্রনাট্য লিখেছেন। পরিচালনায় তার হাতেখড়ি হয় চার বছর আগে কুটাথিল ওরুথান ছবির মাধ্যমে। এ ছবির গল্পও তার লেখা। গনানভেলের পড়াশোনা তামিল সাহিত্য নিয়ে। চেন্নাইয়ের প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে তামিল সাহিত্য নিয়ে পিএইচডি করেছেন। দক্ষিণী সিনেমাবিশিষ্ট অভিনেতা প্রকাশ রাজের সঙ্গেও কাজ করেছেন তিনি।

ছবিতে যে সম্প্রদায়কে ঘিরে গল্প তারা ইরুলা গোষ্ঠীর। জয় ভীম নির্মাণের সময় এ গোষ্ঠীর সদস্যদের চরিত্রগুলোর জন্য শিল্পী বাছাই করতে বেশ সতর্ক ছিলেন পরিচালক। তাদের মধ্যে অনেকে সত্যিই ইরুলা গোষ্ঠীর। অন্যরা নতুন অভিনয়শিল্পী। তারা দুই মাস ইরুলাদের একটি গ্রামে ছিলেন তাদের জীবনধারার সঙ্গে পরিচিত হতে, মানিয়ে নিতে।

সুরিয়া তামিল ইন্ডাস্ট্রির বড় তারকা। গনানভেল তার বন্ধু। গনানভেল সুরিয়ার কাছে গিয়েছিলেন ছবিটি প্রযোজনার দায়িত্ব নিতে অনুরোধ করতে। সব কথা পাকা হওয়ার পর সুরিয়া হঠাৎই জিজ্ঞেস করেন চান্দ্রুর চরিত্রের জন্য গনানভেল কাউকে ঠিক করেছেন কিনা। গনানভেল ‘না’ সূচক জবাব দিলে সুরিয়া বলেন, তিনি চরিত্রটি করতে চান। ছবির অনেক দৃশ্য ইরুলাদের গ্রামেই ধারণ করা হয়েছে।

গনানভেলের প্রিয় ছবির তালিকায় আছেন ইরানি পরিচালক মাজিদ মাজিদির চিলড্রেন অব হেভেন, দক্ষিণ কোরিয়ার কোয়াক জে-ইয়ংয়ের মাই স্যাসি গার্ল, মালয়ালম পরিচালক সিবি মালায়ালির কিরিদাম। গনানভেল তামিল সাহিত্যের নিমগ্ন পাঠক, সমালোচক।

 

সূত্র: ওপেন ম্যাগাজিন