তাকে বলা হয় আফগানিস্তানের বিয়ন্সে। যুক্তরাষ্ট্রের জন্য যা বিয়ন্সে, আফগানিস্তানের জন্য তা আরিয়ানা সায়িদ। তার জন্ম কাবুলে, বেড়ে ওঠা সুইজারল্যান্ডে। বছর দশেক আগে আফগানিস্তানে ফেরেন পশতু আর ফারসি ভাষার গান নিয়ে। দেশটিতে বিভিন্ন সামাজিক ইস্যু ও নারী অধিকারের বিষয়ে তিনি সোচ্চার সবসময়। আফগানিস্তানের রক্ষণশীল অংশ থেকে সমালোচনা-হুমকি সত্ত্বেও তিনি এখন দেশটির আলোচিত পপ স্টার এবং সোস্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সার। বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে থাকা আফগান ডায়াস্পোরায়ও তিনি জনপ্রিয়। ২০১৮ সালে নারী অধিকার নিয়ে কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ পেয়েছেন আটলান্টিক কাউন্সিল’স ফ্রিডম অ্যাওয়ার্ড।

আরিয়ানার জন্ম ১৯৮৫ সালে, কাবুল শহরে। তার বয়স যখন আট তখন পরিবার পাড়ি জমায় সুইজারল্যান্ডে। সেখানেই ১২ বছর বয়সে ভর্তি হন মিউজিক স্কুলে। ২০০৮ সালে প্রকাশিত হয় তার প্রথম একক গান। তবে ক্যারিয়ারে বড় মোড় পরিবর্তন হয় ২০১১ সালে আফগান পেশারক গানটি প্রকাশের মধ্য দিয়ে। আফগানিস্তানের ঘরে ঘরে তিনি পরিচিত নাম হয়ে ওঠেন। এ সাফল্যের পর আরিয়ানা সিদ্ধান্ত নেন নিজের দেশে ফিরে কনসার্ট করবেন। সত্যিই তিনি আফগানিস্তানে ফেরেন এবং দিলাম তাঙ্গ অস্ত নামে নিজের একটি গানের ভিডিও তৈরি করেন। এ গানের জন্য তিনি আফগানিস্তানে পুরস্কৃত হন।

২০১৭ সালে জেতেন আফগান আইকন অ্যাওয়ার্ড এবং একই বছর সেরা নারী আফগান শিল্পীর মর্যাদাও পান। আফগানিস্তানের জাতীয় টেলিভিশন ও রেডিও নেটওয়ার্ক তাকে ‘ভয়েস অব আফগানিস্তান’ বা ‘আফগানিস্তানের কণ্ঠ’ হিসেবে ঘোষণা করে।

আরিয়ানা সাধারণত বছরে আট মাস থাকেন কাবুলে আর বাকি সময়টা লন্ডন ও ইস্তাম্বুলের মধ্যে ভাগাভাগি করেন। এ নিয়ে আফগানিস্তানে অনেকে তার সমালোচনা করেন। এ প্রসঙ্গে আরিয়ানার জবাব এ রকম—‘ইউরোপে বড় হয়েছি বলে অনেকে বলেন আমার আফগান পরিচয় হারিয়ে গেছে, আমি ইউরোপীয় হয়ে গেছি। এটা মোটেই সত্য নয়। আমি যখন প্রথমবার আফগানিস্তানে ফিরলাম তখন দেখি অনেকে আফগান পোশাকই পরে না। আমি কনসার্ট ও শোগুলোতে ঐতিহ্যবাহী আফগান পোশাক পরা শুরু করলাম। এগুলোর বেশির ভাগের ডিজাইন আমারই করা। এরপর কাবুলের দর্জিরা সেগুলো অনুকরণে পোশাক বানাতে শুরু করে। আমি এসব পোশাকের চল আফগানিস্তানে ফিরিয়ে এনেছি। এখন আফগানিস্তানের যেকোনো দোকানে এসব পোশাক পাওয়া যায়।’

২০১৭ সালে প্যারিসের এক কনসার্টে তার পোশাক নিয়ে আফগানিস্তানের রক্ষণশীলরা ব্যাপক সমালোচনা শুরু করেছিল। তাদের কথা ছিল আরিয়ানার এ পোশাক অনেক বেশি খোলামেলা। এ ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে তিনি সোস্যাল মিডিয়ায় এসে তার সেই পোশাকটি পুড়িয়ে দেন। এমনটা কেন করেছিলেন আরিয়ানা—এক সাক্ষাত্কারে তাকে এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হয়েছিল। জবাবে তিনি বলেছিলেন, ‘আমার পোশাকের সমালোচকদের একটা প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছিলাম, কিন্তু তারা কোনো জবাব দিতে পারেননি। তারা এমনভাবে কথা বলছিলেন যেন আমি এবং আমার সেই পোশাকটিই আফগানিস্তানের একমাত্র সমস্যা। তখন আমি পোশাকটি পুড়িয়ে দিয়ে তাদের উদ্দেশে প্রশ্ন রেখেছিলাম, পোশাকটা পুড়িয়ে দিয়েছি। এতে কি দেশের কোনো সমস্যা সমাধান হলো? অবশ্যই হয়নি। দিন শেষে আমিই জিতেছি। তারা কেউই আমাকে আমার কাজ থেকে বিরত রাখতে পারবে না।’

আরিয়ানা সায়িদ সোস্যাল মিডিয়ায় বেশ অ্যাকটিভ। তার ফেসবুক অ্যাকাউন্টের ফলোয়ার সংখ্যা ২১ লাখ। ইনস্টাগ্রামেও তিনি জনপ্রিয়। প্রতিদিনই নিজের নতুন পোশাক, স্টাইলের ছবি পোস্ট করেন। এ নিয়ে তার কথা, ‘আমি মেকআপ খুব পছন্দ করি না। কিন্তু যেহেতু আমি শিল্পী, আমাকে সবসময় হাজারো মানুষের সামনে উপস্থিত হওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকতে হয়। আমার মনে হয় সোস্যাল মিডিয়ায় আমার ছবি, আমার স্টাইল, বিউটি স্ট্যান্ডার্ড তরুণ-তরুণীদের ওপর অনেক প্রভাব রাখে। আমি তাদের এটাই বলতে চাই, তারা যেন নিজেদের নিয়ে নিজেরা খুশি থাকে।’

 

সূত্র: জেনিথ ও বিবিসি