ছেলেবেলা থেকেই প্রকৃতিপ্রেমী। ফুল, গাছ, লতায়-পাতায় আষ্টেপৃষ্ঠে কেটেছে তার শৈশব। ছোট থেকেই গাছপালা, পশুপাখি নাকি তার বন্ধু ছিল। প্রকৃতির সান্নিধ্য হাতছাড়া করতে চাননি বলেই হয়তো মেয়ের নামটিও রেখেছেন প্রকৃতি। সেই প্রকৃতিপ্রেমী মেয়েটিই কাজী নওশাবা আহমেদ। নওশাবার মুখ থেকেই শোনা যাক সে কথা—‘আমি প্রকৃতিতে বিশ্বাসী। তাই মেয়ের নামও প্রকৃতি। ছোটবেলা থেকে আমার বন্ধু বলতে গাছপালা, পশুপাখি। তাদের সঙ্গেই বেশি সময় কাটিয়েছি।’
বিশ্বপ্রকৃতির সঙ্গে সঙ্গে মেয়ে প্রকৃতিরও ভক্ত নওশাবা। এই করোনাকালে মেয়ের সঙ্গে বেশ ভালোই কাটছে তার। এছাড়া নওশাবা সম্প্রতি তার সংগঠন ‘টুগেদার উই ক্যান’-এর পক্ষ থেকে নানা কাজ করছেন। ‘আর্ট ফর টুগেদারনেস’
শীর্ষক একটি সৃজনশীল প্রতিযোগিতার কাজ নিয়েও বেশ ব্যস্ত সময় পার করছেন এ অভিনেত্রী। তার এ আয়োজন ঘরবন্দি থাকা শিল্পীদের জন্য যেন খানিকটা স্বস্তির আভা এনে দিয়েছে।
পাপেট থিয়েটার ‘টুগেদার উই ক্যান’ নিয়ে তার অপার স্বপ্ন। প্রতিদিন এ স্বপ্নটা বয়ে নিয়ে চলেছেন তিনি। তার ভাষ্যে, ‘আমি আমার মেয়ের চোখ দিয়ে পাপেট থিয়েটারটি দেখতে চাই। “টুগেদার উই ক্যান” নিয়ে জীবনের শেষ অবধি কাজ করতে চাই। এ কাজটা একান্তই আমার। অনেক দায়িত্ব নিয়ে করি।’ কী ধরনের বার্তা দিতে সংগঠনটি গড়ে তুলেছিলেন?
এ প্রশ্নের উত্তরে নওশাবা বলেন, ‘সবাই যেন সহজ-সরল প্রকৃতির মতো থাকে। প্লাটফর্মটির মাধ্যমে এ বার্তাই আমি সবসময় দিতে চাই।’
পাপেটের সঙ্গে নওশাবার পুরনো সম্পর্কের কথা কম-বেশি সবারই জানা। পাপেটকে তিনি তার সোল বলেই মনে করেন। তিনি বলেন, ‘পাপেট আমার একটা সোল। যা খুবই সেনসেটিভ। আমি নিজে যা বলতে পারি না, পাপেটের মধ্য দিয়ে তা অনায়াসে বলতে পারি।’
এই পাপেট নিয়েও তার রয়েছে নানান পরিকল্পনা। ঘরবন্দি এ সময়ে মেয়েকে সঙ্গী করে বানিয়েছেন বেশকিছু ভিডিও। তার ফেসবুক পেজে ঢুঁ মারলেই চোখে পড়বে সেসব ভিডিও। হোম কোয়ারেন্টিনের সময়গুলোতে সামনে পাপেট নিয়ে আরো কিছু করার ইচ্ছা তার। ‘আমি প্রযুক্তিগত দিক থেকে একটু দুর্বল। সেই জায়গাগুলো কাটিয়ে সামনে অনেক পরিকল্পনা আছে, যা নিয়ে কাজ করতে চাই’—তিনি বলেন।
নওশাবার না হয় পাপেটের সঙ্গে আত্মিক সম্পর্ক। কিন্তু তার মেয়ের? পাপেটের প্রতি মেয়ের আগ্রহের প্রসঙ্গ উঠতেই নওশাবা বলে উঠলেন, তার আগ্রহ আমার থেকেও বেশি। ‘আমি পাপেট করি এটা অনেকদিন পর্যন্ত তাকে বলিনি। কখনো সিসিমপুর দেখতেও বাধ্য করিনি। কিন্তু সে নিজে নিজেই পাপেটের সঙ্গে খেলে, কথা বলে। আমাকেই বলে মা তুমি পাপেট হাতে নাও, পাপেট কর।’—তিনি যোগ করেন। রবীন্দ্রজয়ন্তী উপলক্ষে শিল্পীদের ফেসবুক গ্রুপ ‘ক্ষ্যাপা’
অনলাইন প্লাটফর্মে মেয়ে প্রকৃতিকে নিয়ে পাপেটের বেশে কথা বলেন নওশাবা।
নওশাবা অভিনেত্রী হিসেবেই বেশি পরিচিত। আর অভিনয়ই তার ধ্যানজ্ঞান। চলচ্চিত্রে অভিনয়ের স্বপ্নের কারণে অন্য অনেক কিছু থেকেই নিজেকে বঞ্চিত করেছেন বলে জানালেন এ অভিনেত্রী। ‘ঢাকা অ্যাটাক’,
‘চন্দ্রাবতী কথা’,
‘আলগা নগর’,
‘৯৯ ম্যানশন’,
‘স্বপ্নের বাড়ি’সহ বেশকিছু ছবিতে অভিনয় করেছেন তিনি। এর মধ্যে ‘ঢাকা অ্যাটাক’
ও ‘স্বপ্নের বাড়ি’
ছবি দুটি মুক্তি পাওয়া। বাকিগুলো এখনো মুক্তি পায়নি। ঢাকা অ্যাটাকে তার চরিত্রটি ছোট হলেও ছবিটি তাকে বেশ পরিচিতি এনে দিয়েছিল। এ বিষয়ে নওশাবা বলেন, ‘ঢাকা অ্যাটাক ছাড়া আমার অন্য ছবিগুলো পরিচিতি লাভ করেনি। কিন্তু সেগুলো মানের দিক থেকে ভালো। প্রতিটি চরিত্র আলাদা। আমি ভাগ্যবান যে নির্মাতারা আমাকে এক্সপেরিমেন্টাল চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ দেন।’
ক্যারিয়ার নিয়ে সামনের পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে চাইলে, ভবিষ্যতে থিয়েটার আর চলচ্চিত্রে অভিনয় করার কথা জানান নওশাবা। তবে কী ধরনের চরিত্র বা গল্পে কাজ করতে পছন্দ করবেন—এর উত্তরে তিনি বলেন, ‘চলচ্চিত্র নিয়ে আমার ভালোবাসার কথা বোঝাতে পারব না। তবে আমি খুবই খুঁতখুঁতে। যে চরিত্রটি করতে গিয়ে চলচ্চিত্রের প্রতি আমার প্রেমের অপচয় হবে না, তেমন চরিত্রই করতে চাই।’
কেবল অর্থের জন্য ছবিতে অভিনয় করতে চান না নওশাবা। খুব স্পষ্ট স্বরেই বললেন সে কথা।
আলাপের একেবারে শেষে। এ সময় বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলতে একেবারেই ভুললেন না যেন। এ পরিস্থিতিতে অসচ্ছল শিল্পীদের নিয়ে খানিকটা চিন্তিত তিনি। তার মতে, ‘আমি হয়তো কাটিয়ে উঠতে পারব। কিন্তু আরো অনেক শিল্পী আছেন যারা মফস্বল, গ্রাম থেকে সবকিছু ছেড়ে ঢাকায় এসে কাজ করছেন। তারা বড় সংকটে পড়ে যাচ্ছেন।’
তবে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে শিল্পাঙ্গনের উন্নয়নে আবারো শিল্পীদের সবাইকে একসঙ্গে কাজ করার আশা প্রকাশ করেন তিনি। এই মেঘ একদিন কেটে যাবে। আবারো ফুটবে ভোরের আলো। দেখা মিলবে এক নতুন পৃথিবীর। এ প্রত্যাশা ব্যক্ত করে নওশাবা আহমেদ বলেন, ‘বর্তমান পরিস্থিতি থেকে আমাদের অনেক কিছু শেখার আছে। করোনা পরিস্থিতি কেটে গেলে আমরা একটা নতুন পৃথিবী পাব। যেখানে প্রকৃতিপ্রেমীরা অরণ্য, পশুপাখিদের সঙ্গে ভালোভাবে কাটাতে পারবে। নিরাপদে চলাচল করতে পারবে। ধর্ম-বর্ণ বৈষম্য থাকবে না। হয়তো তাত্ক্ষণিক এ রকম ঘটবে না। সময় লাগবে কিন্তু পরিবর্তন হবে বলে আমি আশাবাদী।’
নাটক, চলচ্চিত্র, মঞ্চের পাশাপাশি বিজ্ঞাপনেও অভিনয় করেন কাজী নওশাবা আহমেদ। ছোটদের জনপ্রিয় সিসিমপুরে ইকরি চরিত্রে প্রায় সাড়ে ছয় বছর অভিনয় করেছেন তিনি।










