গিয়েরমো দেল তোরো পরিচালিত সিনেমা ‘ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন’। মেরি শেলির উপন্যাস থেকে সিনেমাটি নির্মাণ করেন তিনি। আর এ কাজ ছিল রীতিমতো এক দক্ষযজ্ঞ। সেট নির্মাণ, চরিত্র তৈরি, পোশাক ও মেকআপ মিলিয়ে এক সিনেমার জন্য বহু কিছু করেছেন দেল তোরো। এবার সিনেমার প্রপসসহ আরো কিছু উপকরণ নিয়ে লন্ডনে একটি প্রদর্শনীও হয়েছে।

মেরি শেলির ক্ল্যাসিকটি নিয়ে দেল তোরোর আগ্রহ ছিল অনেক দিনের। শেষ পর্যন্ত এটি তিনি পর্দায় রূপ দিয়েছেন। এ সিনেমার জন্য পোশাকের নকশা করেন কেট হাওলি। প্রডাকশন ডিজাইন করেছিলেন তামারা ডেভেরেল এবং প্রোস্থেটিক শিল্পী মাইক হিল ছিলেন এর কারুকর্মে। এ সিনেমায় প্রচুর বিরল বই প্রদর্শিত হয়েছে। বইগুলোর মধ্যে ছিল শেলির উপন্যাসের দুটি সংস্করণ। এর একটি ১৮১৮ সালের, অন্যটি ১৮৫৩ সালের চিত্রিত সংস্করণ। শেলির বই পড়ার অভিজ্ঞতা স্মরণ করে দেল তোরো ভ্যারাইটিকে বলেন, ‘তিনি যেসব দার্শনিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রশ্নে উদ্বিগ্ন ছিলেন, সেগুলোকেই সামনে এনেছেন।’

41

দেল তোরো তার গল্পকে ক্রিমিয়ান যুদ্ধের পটভূমিতে স্থাপন করেছেন। তবে আধুনিক সংবেদনশীলতাও রেখেছেন। এর মধ্যে তিনি চেয়েছিলেন, চলচ্চিত্রটি যেন অপেরার মতো মহাকাব্যিক অনুভূতি সৃষ্টি করে। তাই তিনি তার সবচেয়ে বিশ্বস্ত সহযোগী হাওলি, ডেভেরেল ও সুরকার আলেকসঁদ্র দেসপ্লাকে সঙ্গে নিয়েছেন।

পোশাক নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে দেল তোরো বলেন, ‘এলিজাবেথের (মিয়া গথ) পোশাক প্রকৃতির প্রতিনিধিত্ব করে। তিনি দ্য ক্রিয়েচারের (জ্যাকব এলোরদি) সঙ্গে সংযুক্ত। তিনি পবিত্রতা ও প্রকৃত জগতের প্রতীক। তাই তিনি সাদা রঙের পোশাক পরেন, যা বিশুদ্ধতা নির্দেশ করে।’

হাওলি জানান, গিয়েরমো ও ডেভেরেল খুব ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেছেন। সিনেমায় ব্যবহৃত পোশাকে স্থাপত্য ও পরিবেশের উপাদান প্রতিফলিত হয়েছে। লাল, নীল ও সবুজ ছিল প্রধান রঙের প্যালেট। নীল পোশাকটি এক্স-রে থেকে অনুপ্রাণিত এবং পোশাকটি সন্ধ্যার মোমবাতির আলোয় ধারণ করা একটি দৃশ্যে ব্যবহার হয়। এর জন্য তিনি চিত্রগ্রাহক ড্যান লাউস্টসেনের সঙ্গে আলাদাভাবে পরিকল্পনা করেছেন। তিনি বলেন, ‘মোমবাতির আলো প্রায়ই রঙকে টেনে বের করে নেয়। তাই কোন প্রিন্ট ও উপাদান কোন ফ্যাব্রিকে ঠিকভাবে কাজ করবে, তা দেখে অনেক কাজ করতে হয়েছে।’

হাওলি জানান, শুধু স্কার্টেই কমপক্ষে ৬০ মিটার কাপড় ব্যবহার হয়েছে। এতে এলিজাবেথের অতিলৌকিক রূপ ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। প্রথমবার যখন তাকে দেখেন, তিনি যেন এক দেবদূতের প্রতিধ্বনি। তিনি সবকিছু, এমনকি মৃত্যুরও দেবদূত।

42

সিনেমায় অস্কার আইজ্যাক অভিনয় করেছেন ভিক্টর ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন চরিত্রে। তিনি ভেলভেটের পোশাক পরেছেন, যা হাওলির ভাষায় ‘পুরনো ও ক্ষয়ে যাওয়া’। ভিক্টরের পোশাক তার সময়ের সঙ্গে পুরনো হয়ে ক্ষয়ে যায়, যাতে বোঝা যায় সে বহুদিন ধরে ক্রিয়েচার তৈরি করার কাজ করে যাচ্ছে।

সিনেমায় একটি জাহাজও ব্যবহার করা হয়েছে। ডেভেরেল মডেল শিপ নির্মাতা ম্যাথিউ বেটসের সঙ্গে কাজ করেছেন, যাতে নির্মাণটি ঐতিহাসিকভাবে সঠিক হয়। পুরো জাহাজ বানাতে ছয় মাস লেগেছে। স্কাইলাইট, ওয়াকওয়ে, স্টিয়ারিং হুইল, ঘণ্টা আর ১৩০ ফুট লম্বা ধনুক, সবই তৈরি করা হয়েছে সিনেমার জন্য।

ডেভেরেল বলেন, ‘আমরা এটিকে একটি বিশাল গিম্বলে তৈরি করেছি, যাতে ক্রিয়েচার ধাক্কা দিলে এটি বাস্তবে নড়ে।’

দেল তোরোর মূল আকর্ষণ ছিল ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইনের ল্যাব, যেখানে ক্রিয়েচারের চূড়ান্ত রূপ গঠিত হয়। বিশেষভাবে সংগৃহীত কাঠ ঘষামাজা করে বিজ্ঞান ল্যাবের টেবিল বানানো হয়েছে। স্থাপত্যে বৃত্তের মোটিফ নিয়ে ডেভেরেল বলেন. ‘গিয়েরমো প্রথম যেটা উপস্থাপন করেছিলেন, তা হলো বৃত্তের মধ্যে মেডুসা। এ বৃত্তের মোটিফই ছবিজুড়ে আছে।’

দেল তোরো যোগ করেন, ‘চলচ্চিত্রটি একটি বৃত্ত। আমরা বহু বৃত্তাকার দর্পণ ব্যবহার করেছি। এ বৃত্ত ভিক্টরের জন্য এক ধরনের প্রতিধ্বনি, শুরুতে সে একজন সন্তের মতো কথা বলে। মনে হয়, আপনি যেন যিশুকে শুনছেন। কিন্তু পরে বুঝবেন আপনি চার্লস ম্যানসনকে শুনছিলেন।’

43

সুরকার দেসপ্লা জানতেন দেল তোরো চান ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন ও তার ক্রিয়েচারের গল্প বলতে। ‘দ্য শেপ অব ওয়াটার’ ও ‘পিনোকিও’র পর এ জুটির কাজের সম্পর্ক আরো গভীর হয়। প্রদর্শনীতে দর্শক দেসপ্লা ও দেল তোরোর স্কোরিং প্রক্রিয়া দেখতে পারেন। দেসপ্লার সুরের কেন্দ্রবিন্দু হলো ক্রিয়েচারের শব্দ। তিনি বলেন, ‘আমরা চেয়েছিলাম ক্রিয়েচারের আত্মাটা খুব সূক্ষ্ম ও ভঙ্গুর হোক, যা দর্শককে নাড়া দেবে। তাই আমরা বেছে নিয়েছি সবচেয়ে ছোট ও নাজুক এবং সুন্দর যন্ত্র—বেহালা। এ বিশালদেহী প্রাণীর সাউন্ড তাই শাস্ত্রীয় সংগীতের মতো শুদ্ধ ও সুন্দর সুর।’

ক্রিয়েচার ডিজাইন ছিল জটিল। মূল লক্ষ্য ছিল, এটিকে ১৮০০ দশকের বাস্তব মানুষের মতো করে উপস্থাপন করা। এলোরদিকে তৈরি হতে ১০ ঘণ্টার মেকআপ নিতে হয়েছে। উল্লেখযোগ্যভাবে, ক্রিয়েচারের ত্বক সাধারণ মৃতদেহের রঙ নয়। মাইক হিল বলেন, ‘আমরা যেন মানুষের শরীরের ভেতরের অংশ বাইরে তুলে এনেছি। তাই শিরাগুলো এত স্পষ্ট।’

ক্রিয়েচারের চূড়ান্ত পর্যায়ের রূপে দেখা যায় ভিক্টর কীভাবে শরীরটিকে জোড়া লাগিয়েছে। হিল বলেন, ‘আপনি দেখতে পাবেন কোথায় ভুল হয়েছে, কোথায় আবার খুলে লাগানো হয়েছে। সে প্রথমবার মানুষ সৃষ্টি করছে—প্রথম চেষ্টায় নিখুঁত হয়নি অবশ্যই। কয়েকটি প্যাচওয়ার্ক, কিছু ভুল—সবই শরীরে ফুটে উঠেছে। যেমন পা বোল্ট দিয়ে জোড়া লাগানো, উচ্চতা বাড়াতে অঙ্গ বাড়ানো—সব দৃশ্যমান। আমরা ভাবলাম, যদি কেউ মানুষ তৈরি করতে চায়, সে ১০টা মৃতদেহ লাগাবে না। সেরা দেহটাই নেবে। তারপর হাত যদি যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, সেটি বদলাবে, পা বদলাবে।’

মোট ৪২টি প্রোস্থেটিক টুকরা লাগানো হয়েছে এলোরদির শরীরে। এর মধ্যে ১৪টি মাথা ও গলায়। মেরি শেলির বইয়ের ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইনের দানবকে এভাবেই বাস্তব করে তুলেছেন গিয়েরমো।

সিনেমাটি যে রীতিমতো একটা যজ্ঞ ছিল, তা কিছু তথ্য থেকেই পাঠক বুঝতে পারবেন। সিনেমাটির শুটিং তিনদিন হয়েছে নর্দার্ন অন্টারিওর বরফময় মাঠে ২৩টি কানাডীয় লোকেশন, ৩২টি যুক্তরাজ্যের সেট লোকেশন ও ২৩টি অন্টারিও সেট লোকেশনে। দেল তোরোর সঙ্গে ছিলেন দীর্ঘদিনের নয়জন সহযোগী। সিনেমার জন্য মোট ১১৯টি সেট বানানো হয়েছিল। স্টুডিও সেট ছিল ২৪টি। জাহাজ তৈরিতে ৩ হাজার ১৭৮ শ্রম দিবস, ল্যাব তৈরিতে ২ হাজার ৮৩০ শ্রমদিবস, টাওয়ার এক্সটেরিয়র নির্মাণে ১ হাজার ২০০ শ্রম দিবস ব্যয় হয়েছে। জাহাজ নির্মাণে সময় লেগেছে ছয় মাস। এছাড়া ছিল ১৫টি মডেল সেট। কানাডায় ১২০ জন নির্মাণ কর্মী কাজ করেছেন সেট নির্মাণে। সেট সাজিয়েছেন ২৪ জন। ১ হাজার ২৫২টি ব্যাকগ্রাউন্ড পোশাকের সঙ্গে ব্যবহার হয়েছে ৫৩টি স্টান্ট পোশাক। মূল কাস্টের জন্য ছিল ৬৮টি স্বতন্ত্র পোশাক। ক্রিয়েচার তৈরিতে ৫৪টি সিলিকন প্রোস্থেটিক ব্যবহার হয়েছে, যা লাগাতে কাজ করেছেন আটজন। প্রোস্থেটিক প্রয়োগ করা হয়েছে ৫০ বার। একবারের জন্য পুরো শরীরের প্রোস্থেটিক লাগাতে ব্যয় হয়েছে ১০ ঘণ্টা।

সূত্র: ভ্যারাইটি