গুলজার, নাম শুনলেই তার লেখা কবিতা কিংবা গান অথবা তার নির্মিত সিনেমা একটা মনে পড়বেই। তার কাজের খ্যাতি ছড়িয়েছে পৃথিবীব্যাপী। প্রখ্যাত ভারতীয় একজন উর্দু কবি, সুরকার ও চলচ্চিত্র পরিচালক তিনি। আসল নাম সম্পূরণ সিং কালরা। তিনি জন্মেছিলেন অবিভক্ত ভারতের পাঞ্জাবের ঝিলম জেলায়, ১৯৩৪ সালের ১৮ আগস্ট। ছেলেবেলা থেকেই ছিল লেখালেখির প্রতি ঝোঁক। তবে বাবা বলতেন, লেখক হতে গেলে আয় করা যাবে না। সারা জীবন ভাইয়ের ওপর নির্ভর হয়ে থাকতে হবে। এ সময় মুম্বাইয়ে করেছেন গাড়ি পরিষ্কারের কাজ। তবে লেখালেখি ছাড়েননি গুলজার।
গুলজারের গানের ভাষা, সুর সব মিলিয়ে মনে হবে কোনো প্রেমের চিঠির ভাষা। যেমন ‘মেরা কুচ সামান’ (ইজাজত), ‘দিল তো বাচ্চা হ্যায় জি’ (ইশকিয়া) গানগুলোই তার প্রমাণ। আবার কিছু গান আছে এমন, যেগুলো আমাদের বারবার অতীতের কথা মনে করাবে, ‘ও শাম কুছ আজিব থি’ (খামোশি)। গুলজারের গান মানেই ভিন্ন গল্প। তবে ‘হামনে দেখি থি উন আখোকি মেহেকতি খুশবু’র এমন কাবিক্য ভাষা যেন বিশেষত্ব গুলজারের।
জিতেছেন শ্রেষ্ঠ মৌলিক গানের গীতিকারের জন্য জাতীয় পুরস্কারও। তবে প্রতি শতকেই গানের ভাষার কিছু পরিবর্তন আসে, দর্শকের পছন্দের কথা মাথায় রেখে শিল্পীরাও নিজেকে ভিন্ন ধারায় গড়ে তোলার চেষ্টা করেন। কিন্তু এক্ষেত্রে কোনো পরিবর্তন ছাড়াই একই রকম ভালোবাসা পেয়েছেন গুলজার। অনেকেরই ধারণা, হয়তো নামটি গুলজার বলেই তা সম্ভব হয়েছে। আবার প্রয়োজনে সময়ের সঙ্গে আবার সিনেমার ধাঁচের সঙ্গে তাল মিলিয়েও গান লিখেছেন।
গুলজারের গান নিয়ে প্রায়ই বলা হয়, একটি গান গুলজার যে দৃষ্টিকোণ থেকে লিখেন তিনি শ্রোতাদের বাধ্য করেন সে ভাবনা অনুভব করতে। কারণ গুলজারের সে দক্ষতা রয়েছে। ‘জয় হো’র মতো আরো বেশকিছু গান তার আছে যেগুলো দর্শকশ্রোতাদের মাঝে অবিস্মরণীয় হয়ে রয়েছে। এক সাক্ষাৎকারে গুলজারের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল এর রহস্য কী। তিনি বলেন, ‘একটি গানকে সারা জীবন বাঁচিয়ে রাখার জন্য কোনো নির্দিষ্ট পথ নেই। গানের কণ্ঠ, সুর, ভাষা, পর্দার সামনে শিল্পীর উপস্থিতি, নির্মাতার সঠিক পরিচালনা এসব মিলিয়ে একটি গানের দর্শকপ্রিয়তা নির্ভর করে। একটি গানের সঙ্গে অনেকগুলো বিষয় থাকে। তাই আমি নির্দিষ্ট একটি বিষয়কে প্রাধান্য দেব না।’ একই কথা সিনেমার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য বলে মনে করেন গুলজার।
কেবল হিন্দি নয়, উর্দু কবিতা, গজল ও গানের জন্যও তিনি সুপরিচিত। ১৯৬২ সালে তার উর্দু কাজের শুরু। গুলজারের ঠিক কতগুলো উর্দু লেখা আছে তা গণনা করা একটু কঠিনই হবে। তিনি সিনেমা নির্মাণেও পেয়েছেন সফলতা। ১৯৭১ সালে ‘মেরে আপনে’ দিয়ে তার নির্মাণ শুরু। এছাড়া তার নির্মিত বেশকিছু চিত্রনাট্যও ক্ল্যাসিক হিসেবে পরিচিত। যেমন ‘মাসুম’, ‘আনন্দ’, ‘নামাক হারাম’, ‘চুপকে চুপকে’ ইত্যাদি।
শিল্প-সাহিত্যে অবদানের জন্য ২০০২ সালে পেয়েছেন সাহিত্য একাডেমি পুরস্কার আর ২০০৪ সালে পেয়েছেন পদ্মভূষণ। এছাড়া একাধিকবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছেন তিনি। এর বাইরে প্রায় ২৩ বার পেয়েছেন ফিল্মফেয়ার অ্যাওয়ার্ড। ‘স্লামডগ মিলিয়নেয়ার’ সিনেমার ‘জয় হো’ গানটির জন্য ভারতের আরেক কিংবদন্তি শিল্পী এ আর রাহমানের সঙ্গে যৌথভাবে পেয়েছেন অস্কার আর গ্র্যামি পুরস্কার। ২০১৪ সালের এপ্রিলে তিনি লাভ করেন ভারতের চলচ্চিত্র জগতের সর্বোচ্চ সম্মানজনক দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার। সর্বদা সাদা কুর্তা-পায়জামা পরা এ প্রবীণ লেখক ভারতীয় একজন কিংবদন্তি শিল্পী।
সূত্র: স্ক্রল ডটইন










