সাদি মহম্মদের সঙ্গে আমার দীর্ঘদিনের আলাপ। উনি আমার চেয়ে বয়সে বড় ছিলেন। আমরা যে পরস্পরকে শুধু পছন্দ করতাম তা নয়, সাদি ভাই আমাকে খুব ভালোবাসতেন। আর তার ভালোবাসাটা এত নির্ভেজাল যে উনি আমাকেও বাধ্য করেছিলেন তাকে ভালোবাসতে। সাদি ভাই খুব ভালো রান্না করতেন। সম্পর্কটা আমাদের এমন ছিল যে তিনি আমাকে তার রান্না খাইয়েছেন। নিজে রেঁধে নিয়ে এসেছেন আমার বাসায় বা দাওয়াত করেছেন। 

আমরা একসঙ্গে কয়েকটা জাজমেন্ট প্রোগ্রামে ছিলাম। সে সময় দেখেছি, আমাদের মনের মিলও অনেক। যেমন আমরা খুব সহমর্মিতার সঙ্গে একটা ছাত্রকে দেখি। একটা জাজমেন্টের মাধ্যমে শিশুটাকে একটা সুযোগ দেয়া, সে ভালো বা মন্দ যা-ই হোক, নিজেকে যেন প্রেজেন্ট করতে পারে। মনে কষ্ট না পায়। এটা আমার মতো সাদি ভাইও লক্ষ্য রাখতেন।

তিনি ডিপ্রেশনে ছিলেন। সত্যি বলতে আমি তার মধ্যে বিষয়টা টের পাইনি। উনি কখনো উচ্চকণ্ঠ ছিলেন না। কোনো জিনিস নিয়ে কখনো নিজের অপছন্দ সেভাবে প্রকাশ করতেন না। তবে হ্যাঁ, আমার সঙ্গে কথায় উনি বেশকিছু নিজের দুঃখ প্রকাশ করতেন। সংগীতশিল্পীদের প্রতি যে অবহেলা সেটা তাকে কষ্ট দিত।

তার এই যে আত্মহননের চেষ্টা, এটা উনি আগেও কয়েকবার করেছেন। তার ভাইয়ের কাছেই শুনেছি, শান্তিনিকেতনে অধ্যয়নকালেও তিনি একবার অ্যাটেম্পট নিয়েছিলেন। এর পেছনে অনেক সময় জেনেটিক কারণ থাকে। অনেক সময় সামাজিক নানা বিষয়ও থাকে। সাদি ভাইয়ের ক্ষেত্রে যেটা মনে হয়, শিল্প ও শিল্পীদের প্রতি যে অমনোযোগ তা-ই কষ্ট দিত। এখানে শিল্পীরা তাদের প্রাপ্য সম্মান পায় না। যে সম্মানী প্রাপ্য, তা-ও পায় না। সব সেক্টরে বাজেট বাড়ে, কিন্তু এখানে না। সাদি ভাই এটা হয়তো মুখে বলতেন না, কিন্তু কষ্টটা ছিল।

মায়ের মৃত্যুও তাকে দারুণ কষ্ট দিয়েছে। সাদি ভাই অকৃতদার ছিলেন। মা চলে যাওয়ায় তাই আরো একা হয়ে পড়েন। শিবলী মহম্মদের সঙ্গে তিনি অনেক কিছুই শেয়ার করতেন, কিন্তু তার পরও হয়তো কিছু থেকে যেত। সেজন্যই হয়তো উনি দুদিন আগেও একটা অ্যাটেম্পট নিয়েছিলেন। মগবাজারে রেললাইনের নিচে পড়তে গিয়েছিলেন। সেখান থেকে ওনাকে নিয়ে আসা হয়। পরিবারের একজন সাইকিয়াট্রিস্টের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়।

কিন্তু বিষয়টা সাদি ভাই পছন্দ করতেন না। কেননা সত্যি বলতে আমরা যারা গানবাজনা করি, ছাত্রছাত্রীদের শুধু গান শেখাই না। তাদের নানা প্রকার কাউন্সেলিং করি। তো সাদি ভাই নিজেই যেখানে অনেকের ভালো মন্দ দেখতেন, তিনি প্রতিবাদ করতেন সাইকিয়াট্রিস্টের কাছে যাওয়ার বিষয়ে।

সাদি ভাইয়ের মৃত্যুটা সংগীত অঙ্গন, তার বন্ধু ও সবার জন্যই একটা বড় ক্ষতি। কিন্তু এ ঘটনা থেকে শিক্ষাও নেয়া যায়। আমি আশা করব, সাদি ভাইয়ের মতো অন্য কাউকে যেন হারাতে না হয়, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সবাই মনোযোগী হবে।