কান চলচ্চিত্র উৎসবের ‘আঁ সার্তে রিগা’
ক্যাটাগরির প্রথম ছবি রেহানা মরিয়ম নূর সবার
বিশেষ নজরে শুরু থেকেই ছিল। বুধবার ওয়ার্ল্ড প্রিমিয়ারের পরে হলজুড়ে তুমুল অভিবাদনে বোঝা গেল বোদ্ধারা অভিভূত। সিনেমা শুরুর আগে থেকেই দীর্ঘ লাইনে অপেক্ষা করছিলেন বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আসা চলচ্চিত্র নির্মাতা, প্রযোজক, কলাকুশলী, সমালোচক ও সাংবাদিকরা। শুরুর আগে উপস্থাপক মঞ্চে আমন্ত্রণ জানালেন পরিচালক আবদুল্লাহ মোহাম্মদ সাদ এবং নাম ভূমিকায় অভিনয় করা আজমেরী হক বাঁধনকে। এমনিতেই সাদ খুব একটা বাকপটু নন, তার ওপর এখানে ভাষা বলতে শুধুই ফ্রেঞ্চ। কোনোমতে ইংরেজিতে বললেন শুধু, কানে এসেছেন সেটা এখনো তার বিশ্বাস হচ্ছে না। অবিশ্বাসীর মতোই অবশ্য তাকাচ্ছিলেন প্রায় পূর্ণ ডেবুসির দিকে। আর এর পরই শুরু হলো রেহানার সঙ্গে ১ ঘণ্টা ৪৭ মিনিটের রুদ্ধশ্বাস যাত্রা।
সিনেমার মূল ভূমিকায় কে আছেন, তা এটার নাম থেকেই বোঝা যায়। ড. রেহানা মরিয়ম নূর। তবে চরিত্রের এই সহজাত মর্যাদাটুকু সিনেমার শেষ দৃশ্যের আগ পর্যন্ত টের পাওয়া যায় না। তার আগ পর্যন্ত রেহানা শুধুই একজন মেডিসিনের সহকারী অধ্যাপক, ক্লাস ওয়ানে পড়ুয়া মেয়ে নিয়ে বেঁচে থাকা এক বিধবা, যে কিনা কঠিন স্বভাবের নিয়ম-শৃঙ্খলার প্রতি কঠোর এক শিক্ষক।
তার নৈতিকতা প্রীতির একটা উদাহরণ হিসেবে দেখানো হয়েছে, তিনি এক ডাক্তারিপড়ুয়া ছাত্রকে পরীক্ষার সময় স্কেলের পেছনে নোট লেখার জন্য বহিষ্কার করে দেন। এটা ছিল শুরু মাত্র!
যখন এক শিক্ষকের বিরুদ্ধে এক ছাত্রী হয়রানির অভিযোগ আনে, তখন ওই শিক্ষকের ওপর তিনি নাছোড়বান্দার মতো ঝাঁপিয়ে পড়েন।
লেখক ও পরিচালক আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ সাদের (লাইভ ফ্রম ঢাকা) দ্বিতীয় পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রে আমরা শুধু একজন অস্থির নারীর মনস্তত্ত্বের গা হিম করা প্রতিচ্ছবি দেখতে পাই তা নয়, যাতে অসাধারণ গভীরতার সঙ্গে অভিনয় করেছেন আজমেরী হক বাঁধন (হলিউড রিপোর্টারের ভাষায় নবাগত)। অন্য সবার মতো যৌন নিপীড়নের মতো ঘটনা থেকে মুখ ফিরিয়ে না নেয়া এবং নিজের জায়গায় অনড় ও অটল এক নারী চরিত্র দেখতে পাই।
রেহানার জীবনের একটা বড় অংশ জুড়ে আছে প্রায় প্রাধান্য না পাওয়া তার মেয়ে ইমু (চমত্কার অভিনয় করা আফিয়া জাহিন জাইমা), যাকে
সে ভালোবেসে ‘মাম্মি’
বলে ডাকে এবং এ ডাকে ছোট্ট মেয়েটি সাড়া দেয় ‘মাম্মা’
বলে। সিনেমাটির প্রতিনিয়ত বদলাতে থাকা মানসিক ও নৈতিক প্রেক্ষাপটকে একটা নির্দিষ্ট দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখার অবকাশ নেই। মনস্তত্ত্ব ও নৈতিকতা একে অন্যের জায়গায় চলে এসে দ্বন্দ্ব তৈরি করে, যা দর্শককে দুটি ভিন্ন ভিন্ন দিকে একই সঙ্গে খেলা করতে চ্যালেঞ্জ করে।
সাদ ও ডিরেক্টর অব ফটোগ্রাফি তুমিল তামিজুল মিলে জটিল কিছু টেকনিক্যাল সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, যার মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো সিনেমার প্রতিটা দৃশ্য জুড়ে থাকা নীল রঙের আভা, যা এতই শীতল ও নীরস, মনে হয় যেন প্রতিটা দৃশ্য থেকে জীবনরস ছেঁকে ফেলা হয়েছে। রেহানার একমুখী চিন্তা আর ঘোর প্রতিফলিত হয় যখন প্রতিটা দৃশ্যে শুধু ফোরগ্রাউন্ড ফোকাসে থাকে, ব্যাকগ্রাউন্ড থাকে অস্পষ্ট। পোশাক নির্বাচনের ক্ষেত্রেও যত্ন করে আলোর বিষয়টি মাথায় রাখা হয়েছে। কোনো চরিত্রই তেমন উজ্জ্বল কাপড় পরেনি। বরং সমাজে নারীদের ওপর যৌন নির্যাতন এবং এ নিয়ে যে লুকোচুরি এবং হুশ-হাশ চুপ-চুপের অবতারণা করা হয়, সিনেমার লাইটিং তাকে দারুণভাবে এগিয়ে নিয়ে গেছে।
ভালো একটি দৃশ্যের জন্য ক্যামেরার যে কয়টি নিয়ম মানার কথা বলা হয়ে থাকে, শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত তার কোনোটির ধার ধারেননি সাদ। রেহানা মরিয়ম নূরে ট্রাইপড বা অন্য কোনো ডিভাইস ব্যবহার করে দৃশ্যকে স্থিতিশীল করার কোনো চেষ্টাই করা হয়নি। ফলে শুরুর দৃশ্য থেকেই শুরু হয় ক্যামেরায় কখনো হালকা, কখনো বড় রকমের ঝাঁকুনি। অভ্যস্ততা না থাকায় শুরুতে বেশ অস্বস্তিই হচ্ছিল। কিন্তু মাত্র কয়েক মিনিটের মাথায় সে অস্বস্তি কেটে যায়। রেহানা চরিত্রে বাঁধনের এক্সপ্রেশন, তার চরিত্রের অস্থিরতা এবং সর্বোপরি গল্পের ধারায় যে অ্যাকশন ছিল, ক্যামেরার কাজ ঠিক তার সঙ্গে মানিয়ে যায়।
ঠিক একথা মাথায় রেখেই পরিচালক ক্যামেরা হাতে রেখে শুট করার চিন্তা করেছিলেন কিনা জানি না। তবে সিনেমা দেখার পর মনে হয়েছে রেহানাকে ফুটিয়ে তুলতে এ ঝাঁকুনিটা দরকার ছিল, বরং এ চরিত্রকে ধীরস্থির ফ্রেমে দেখলেই খানিকটা ক্ষতি হয়ে যেত।
সূত্র: হলিউড রিপোর্টার ও এনডিটিভি










