১৯৭১ সালে সাদি মহম্মদ তরুণ। ২৫ মার্চের কালরাত্রির পরদিন, অর্থাৎ যে দিনটিকে এ দেশের মানুষ স্বাধীনতা দিবস হিসেবে পালন করে, সে দিনটিতেই চোখের সামনে দেখেছেন বাবার কাঁধে ছুরি বসিয়ে দিচ্ছে স্বাধীনতাবিরোধী তাদেরই প্রতিবেশী। সে ছুরি এতই গভীরে প্রথিত হলো যে শত্রু নিজেও সহজে টেনে বের করে আনতে পারছিল না! সাদি মহম্মদ সামনেই দাঁড়ানো। তিনি বাবার কাঁধ থেকে সে ছুরি টেনে বের করতে এগিয়ে গেলেন। রক্তের বন্যা বয়ে যাচ্ছে। ভিজে যাচ্ছেন সাদি মহম্মদ। বাবা বললেন, তুই পালা... তুই বাঁচ... তিনি সন্তানের হাতটিকে নিজের ক্ষত থেকে সরিয়ে দিয়ে ধাক্কা দিলেন। বাঁচার জন্য উদভ্রান্তের মতো যখন দৌড়াচ্ছেন সাদি, দেখলেন কাকা তার দুই জমজ বোনকে সঙ্গে নিয়ে পালাচ্ছেন। আচমকা বোনদের দুদিকে ছুড়ে ফেলে দিয়ে কাকার বুকে বল্লম ছুড়ে মারল কেউ, আশ্রয় খুঁজলেন পাশের কোনো বাড়িতে, লাশের পর লাশ ডিঙিয়ে যাচ্ছেন তিনি। হঠাৎ দেখতে পেলেন তারই এক খালাত ভাইকে জবাই করা হচ্ছে... সাদি মহম্মদকে এসবও তাকিয়ে দেখতে হলো!
এমনতর বিভীষিকাময় অভিজ্ঞতা সঙ্গে নিয়েই সাদি মহম্মদ বেঁচে ছিলেন। দুঃস্বপ্ন অহরহ তাড়া করে বেড়াত তাকে। অনেকেই অবাক হতো। আপনার তো পাগলাগারদে থাকার কথা! বলত কেউ কেউ। তবু এসব দুঃসহ যন্ত্রণাকে বুকে ধারণ করেই তিনি রবীন্দ্রনাথের গানে আশ্রয় খুঁজে গেছেন। হয়ে উঠেছেন দিকপাল শিল্পী। সাদি মহম্মদকে ছাড়া বাংলাদেশের রবীন্দ্রসংগীতের ইতিহাস রচনা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। সে তিনি কোনো জাতীয় পদক পেলেন কি পেলেন না কিচ্ছু যায় আসে না। ইতিহাস পদক চেনে না। কত পদকধারী ইতিহাস থেকে মুছে গেছে। ম্লান হয়ে গেছে। ঠাঁই হয়েছে আঁস্তাকুড়ে। ইতিহাসই তার করুণ সাক্ষী।
সাদি মহম্মদ আর রবীন্দ্রসংগীত যেন একাকার হয়ে উঠেছিল। কিন্তু তিনি শুধু সেখানেই তার স্বাক্ষর রেখে যাননি, কাজ করেছেন আরো নানা ধারায়। বাংলাদেশ টেলিভিশনে তার প্রথম পরিবেশনা শুরু হয়েছিল নিধুবাবুর টপ্পা গেয়ে। পুরনো দিনের বাংলা গানের শিল্পী হিসেবে তিনি ছিলেন দারুণ মায়াবী। গান বাছাইয়ে কখনই চটকদারি বা বাজারি ছিলেন না বরং অপ্রচলিত অথচ ভালো গানকে কণ্ঠে তুলে শ্রোতাকে শোনানোর কান ও প্রাণ তৈরিতে সচেষ্ট ছিলেন। যেসব সংগীত কারখানা বাজারি গানের ব্যবসা করত তারা চাইত সাদি মহম্মদকে দিয়ে জনপ্রিয় গানের রেকর্ড বের করতে আর সাদি মহম্মদ চাইতেন অপ্রচলিত ভালো গানগুলোকে শ্রোতার কাছে জনপ্রিয় করে তুলতে। সাদি মহম্মদ বিভিন্ন সময় প্রকাশ করছেন সেসব কথা। বলতেন এ ব্যাপারে ওদের সঙ্গে আমি জোট বাঁধিনি। ওদের মতের সঙ্গে আমার মিল হয়নি।
কণ্ঠশিল্পী পরিচয়ের মোড়কে ঢাকা পড়ে গেছে তার সুরকার পরিচয়টিও। নিজের সুরে ও সংগীত পরিচালনায় অ্যালবাম প্রকাশ করেছেন। গাইয়েছেন অন্যান্য প্রতিষ্ঠিত শিল্পীকে দিয়েও। সুরকার সাদি মহম্মদের কথা বলতে গেলে একটি গানের কথা না বললেই নয়। গানটি বঙ্গবন্ধুর নির্মম হত্যাকাণ্ড নিয়ে রচিত-
সেদিন আকাশে শ্রাবণের মেঘ ছিলো, ছিলো না চাঁদ
ভোরের আকাশে সূর্যের আলো থেকে তোমার রক্ত
মিশে গেল সমুদ্র সমতল।
প্রথাগত অন্ত্যমিল সর্বস্ব গান নয় এটা। অনেকটা আধুনিক কবিতার মতোই। সাদি মহম্মদ সুর করলেন দক্ষতার সঙ্গে। আজও অনেক মানুষের প্রিয় এ গান।
একাত্তরের বিভীষিকাময় অনুভূতি করোটিতে ধারণ করে মা জেবুন্নেছা সলিমউল্লাহকে আগলে ধরেই মূলত সচল ছিল সাদি মহম্মদের জীবন। গত বছর মায়ের মৃত্যুর পর তিনি আর স্বাভাবিক ছিলেন না বলেই জানা যায়। কিন্তু তারও আগে ৭১ টিভি চ্যানেলের একটি সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, আমি চিরদিনই খুব একলা, আমি আজও অনেক নীরব একেবারেই নীরব হয়ে থাকি...
শেষ পর্যন্ত পুরোপুরিভাবেই নীরব হয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। বেছে নেন আত্মহত্যার পথ। মনে পড়ে জীবনানন্দ দাশের কবিতার সে লাইন—
‘কোনোদিন জাগিবে না আর
জানিবার গাঢ় বেদনার
অবিরাম—অবিরাম ভার
সহিবে না আর—’
নিকটজন বা দূরের অনেকেই বলছেন প্রাপ্য সম্মান না পাওয়ার অভিমান থেকেই হয়তো তিনি নীরবতাকে আলিঙ্গন করেছেন, অভিমান হতেই পারে, সবারই হয়, কিন্তু আমার বারবার মনে পড়ে উপরোক্ত কবিতাটিই
অর্থ নয়, কীর্তি নয়, সচ্ছলতা নয়—
আরো-এক বিপন্ন বিস্ময়
আমাদের অন্তর্গত রক্তের ভিতরে
খেলা করে;
আমাদের ক্লান্ত করে
ক্লান্ত—ক্লান্ত করে;
সাদি মহম্মদের সে বিপন্ন বিস্ময়ের ক্লান্তি তার জীবনের ভেতর দিয়ে না গেলে কাছের বা দূরের যে-ই হোক না কেন, তা ধরতে পারার কথা নয় বলেই প্রতীতি হয়।
মৃত্যু নিয়ে রবীন্দ্রনাথের একটি বিশেষ গান আছে। রবীন্দ্রসংগীতের স্বরলিপিকার শৈলজারঞ্জন তার যাত্রাপথের আনন্দগান গ্রন্থে উল্লেখ করেন যে যথারীতি তিনি তাকে ‘সমুখে শান্তিপারাবার’ গানটি শেখালেন এবং তিনি যথাযথ গানটি তুলে, স্বরলিপি করে বেরিয়ে আসছেন, তখন কবি পেছন থেকে ডেকে ধ্যানগম্ভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন—
আজ আমি যা প্রত্যক্ষ করলাম, তা-ই এখানে লিখে রেখে গেলাম, কিন্তু এ গান আমার অন্যান্য গানের মতো তুমি আগে কাউকে শিখিও না। আমার যখন হয়ে-বয়ে যাবে, তখন গানটি করে দিও। কিন্তু তখন তুমি আমাকে কাছে পাবে না।
রবি ঠাকুরের মতো সাদি মহম্মদকেও আর কাছে পাব না! জানা হবে না তাদের প্রকৃত অনুভব। আমরা শুধু আন্দাজ করে পড়ে নিতে পারি তার অভিমান, না পাওয়া, একাত্তর, বিভীষিকা, বাবা, মা, একলা জীবন আর তার নীরবতার পাণ্ডুলিপি। জানব না জীবনের শেষ সময়টুকুতেও তানপুরায় সংগীত সাধনারত সাদি মহম্মদকে মৃত্যু এসে বলেছিল কিনা।
‘সমুখে শান্তিপারাবার
ভাসাও তরণী হে কর্ণধার।’
লেখক: কবি ও সংস্কৃতিকর্মী










