কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে বদলে গেল পাকিস্তানি সিনেমা জয়ল্যান্ডের ভাগ্য। ২০২৩ সালের অস্কারের জন্য পাকিস্তানের অফিশিয়াল এন্ট্রি ছিল জয়ল্যান্ড। কিন্তু সাইম সাদিকের এ সিনেমাকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ১৮ নভেম্বর পাকিস্তানে আনুষ্ঠানিকভাবে মুক্তি পাওয়ার কথা ছিল সিনেমাটির। মুক্তির ঠিক এক সপ্তাহ আগে দেশটির তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের আদেশে সিনেমাটি নিষিদ্ধ করা হলো। একাডেমি অব মোশন পিকচার্সের নিয়ম অনুযায়ী কোনো সিনেমা অস্কারে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার যোগ্য হতে নিজ দেশে অন্তত এক সপ্তাহ প্রদর্শনী চলা আবশ্যক। সে হিসেবে নিষিদ্ধ হয়েই থেকে গেলে অস্কারে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবে না জয়ল্যান্ড।

পাকিস্তানের পত্রিকা ডন এ সম্পর্কে জানিয়েছে, সেন্ট্রাল বোর্ড অব ফিল্ম সেন্সরস ইসলামাবাদ জয়ল্যান্ডের সেন্সর সার্টিফিকেট প্রত্যাহার করেছে। তাদের মতে, ‘‌সিনেমায় এমন কিছু বিষয় আছে, যা আমাদের সমাজের নীতিবোধের পক্ষে যায় না। ফলে তা ১৯৭৯ সালের মোশন পিকচার্স অর্ডিন্যান্সের নবম অনুচ্ছেদের শর্ত পালন করে না।’ যে কারণে সিনেমাটি পাকিস্তানে প্রদর্শনের ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়েছে। 

নিষিদ্ধ করার আগ পর্যন্ত এটি অস্কারের বিদেশী সিনেমার ক্ষেত্রে যোগ্যতম প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে বিবেচিত হচ্ছিল। এর মূল গল্প, নির্মাণ, চিত্রনাট্য, সিনেম্যাটোগ্রাফি থেকে শুরু করে বাস্তবতার সঙ্গে এর সংযুক্তি-সব মিলিয়ে বেশ প্রশংসিত হয়েছে। এ সিনেমা মূলত পিতৃতান্ত্রিকতাকে আঘাত করে। পাকিস্তানে (এমনকি দক্ষিণ এশিয়ায়) বহুকাল ধরে প্রচলিত সামাজিক নিয়ম ও তার অসারতার প্রতি কটাক্ষ করে বেশকিছু বক্তব্য রাখা হয়েছে এতে।

জয়ল্যান্ডের মূল দুই চরিত্রের একজন রূপান্তরকামী। তার সঙ্গে একজন বিবাহিত পুরুষের সম্পর্ক দেখানো হয়েছে। পাকিস্তানের সমাজব্যবস্থায় এ ধরনের গল্পকে স্বাগত জানানো হবে না, তা বোঝাই যায়। কিন্তু এটিই একমাত্র বক্তব্য নয়। গল্পের পটভূমি মূলত লাহোর এবং সিনেমায় লাহোরের সমাজ ও মানুষের চিত্র ফুটে উঠেছে। বহুদিন ধরে প্রচলিত পৌরুষের সত্যিকার অর্থ খোঁজার চেষ্টা করে জয়ল্যান্ড। সিনেমায় একটি পরিবারের মধ্যে থাকা সদস্যদের কী কী সমস্যা ও প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়, সে কথাও এসেছে।

পাশ্চাত্যের সিনেমায় একটা সময়ে অস্তিত্বের সংকট (এক্সিসটেনশিয়াল ক্রাইসিস) প্রসঙ্গটি থাকত। সাইম সাদিকের জয়ল্যান্ড সে জায়গাটিও স্পর্শ করেছে। সিনেমায় জীবন-মৃত্যুর বিষয়গুলো এসেছে। লিঙ্গ পরিচয়ের যে বিষয় জয়ল্যান্ড তোলে ধরে, সেখানেও প্রশ্নটি মূলত অস্তিত্বের। অন্যদিকে নির্মাণের ক্ষেত্রেও সিনেমাটি স্বতন্ত্র। লং টেক, ক্লোজ আপ শটের মুনশিয়ানার পাশাপাশি এর কালার প্যালেট প্রশংসিত। গত মে মাসে জয়ল্যান্ড প্রদর্শিত হয়েছিল কান চলচ্চিত্র উৎসবে এবং সেখানে আঁ সার্তে রিগা বিভাগে জুরি পুরস্কার ও কুইয়ার পাম পায়।

সাইম সাদিক বলেন, ‘‌সিনেমার মূল বিষয় ছিল একজন পুরুষ, নারী ও রূপান্তরকামীর মধ্যে ত্রিভুজ সম্পর্ক। এর সঙ্গে ছিল পিতৃতান্ত্রিক একটি প্রতিকূল পরিবার।’ নানা দেশে প্রশংসিত ও পুরস্কৃত সিনেমাটিকে নিষিদ্ধ করার প্রসঙ্গে ইনস্টাগ্রামে দীর্ঘ একটি পোস্ট করেছেন সাদিক। তিনি বলেন, ‘‌কয়েকজন ব্যক্তির ছড়ানো ভিত্তিহীন কিছু গুজব ও অভিযোগের কারণে হঠাৎ করেই আইন ও বিচার বদলে গেল।’ সেন্সরের সব শর্ত পূরণ করেই সার্টিফিকেট দেয়া হয়েছিল সিনেমাটিকে। এখন নিষিদ্ধ হওয়ার পর সাদিক অবশ্যই এর বিরুদ্ধে দাঁড়াবেন। পরিচালক সাইম, সিনেমার অভিনেত্রী সাওয়ান্ত গিরানী এরই মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এটি নিষিদ্ধ করার প্রসঙ্গে প্রতিবাদ শুরু করেছেন।


সূত্র: ডন ও স্ক্রল ডট ইন