বিচারকের রায় নিয়ে কোনো প্রশ্ন করা যাবে না। করলে বিপদ। কাঠগড়ায়। বিচারকরা প্যানেল করবেন কার কী ভাগ্য। প্রধান বিচারপতির সিদ্ধান্তে ক্যাঁ কুঁ করা যাবে না। করলে ক্যাঁচাল। না করে মেনে নিই। যেমন নিয়েছে অনেকে। বার্লিন আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের পোশাকি নাম ‘বার্লিনালে’। প্রতিবারই সাতজন বিচারক। অর্থাৎ জুরি। সাতজনের মধ্যে একজন প্রধান। তারই আজ্ঞাবহ বাকি ছয়জন। হ্যাঁ, তাদেরও মতামত তথা রায় বিবেচ্য। তবে প্রধানই সর্বেসর্বা। তিনি যা বলবেন মানতে বাধ্য। দর্শক, সমালোচক নিমিত্ত। প্রশ্ন উঠছে ইদানীং নানা দেশের নামি চলচ্চিত্র উৎসবে যেসব ছবি পুরস্কার পায়, সবই কি যোগ্য? পক্ষপাতিত্ব কতটা?
পক্ষ বিপক্ষ এখন খুব জরুরি নয়। মূলে রাজনীতি। রাজনৈতিক বিবেচনাই মুখ্য। এ রাজনীতি ইউরোপ ও আমেরিকায়। বলা ভালো, ধনতান্ত্রিক দেশগুলোর সঙ্গে খাপ খায়। নীতির দিক থেকে যেন হেরফের না হয়। হলে যত ভালো ছবিই হোক, কাহিনী, পরিচালনা ইত্যাদি সব মিলিয়ে পুরস্কার প্রদানে দোনামোনা। চুপ।
বার্লিনালেতে শ্রেষ্ঠ ছবি। শ্রেষ্ঠ পরিচালনায় যে ছবিগুলো পুরস্কৃত, বিচারকদের রায় নিয়ে তাতে বিস্তর গুঞ্জরন। কথা উঠেছে দর্শক, সমালোচক, বোদ্ধামহলে, মিডিয়ায়। বিচারকদের দায় নেই জবাবদিহির।
‘ডাহোমে’ ৬৭ মিনিটের তথ্যচিত্র। স্বর্ণভল্লুক পদকে পুরস্কৃত। শ্রেষ্ঠ ছবি। পরিচালক মাতি ডিওপ। তিনি এখন ফরাসি নাগরিক। বাস প্যারিসে। জন্ম সেনেগাল। আহামরি তথ্যচিত্র নয়। পশ্চিম আফ্রিকার রেনিনের ডাহোমে রাজ্য থেকে ফরাসি শাসকরা ডাহোমের প্রাচীন ও বহু মূল্যবান শিল্পকর্ম লুট করে। নিয়ে আসে নিজ দেশে। বহু বছর পরে বিবেকে দংশিত। তাই ফেরত দেয়। যেন ফেরত নয়, দান। দানের মধ্যেও অহংকার, রাজকীয় বদান্যতা।
এ রকম কাহিনী আলজেরিয়া থেকে লুট করা বহু দামি শিল্পকর্ম ফরাসি সরকার ফেরত দিয়েছে। জাপানও দিয়েছে চীনকে। এ নিয়েও ছবি হয়েছে। ভারত থেকে ব্রিটিশ রাজও কোহিনূর নিয়ে গেছে। ফেরতের নামগন্ধ নেই এখনো। ডাহোমের তথ্যচিত্রে নাটকীয়তাও যথেষ্ঠ।
পুরস্কার পেয়ে মাতি ডিওপ আপ্লুত। বয়স ৪০-এর নিচে। আবেগঘন কণ্ঠে সুন্দরী বললেন, ‘যেসব সাম্রাজ্যবাদী দেশ অন্যদেশ থেকে শিল্পসামগ্রী হস্তগত করেছে সসম্মানে ফিরিয়ে দিক।’"
দক্ষিণ কোরিয়ার ছবি ‘আ ট্রাভেলার্স নিডস’। পরিচালক হং সাং সু। কোন বিচারে (গ্রান্ড জুরিদের বিচার) রৌপ্য ভল্লুক পুরস্কার পেল, কারোর মগজে ঢুকছে না। বিখ্যাত ফরাসি অভিনেত্রী ইসাবেলা হুপার্ট অভিনয় করেছেন বলে? অতীব ফালতু প্রেমকাহিনী।
পুরস্কার পেয়ে পরিচালকের চমৎকার রসিকতা—‘ভুল হয়েছে নিশ্চয়’। আমেরিকার কোনো ছবিকে পুরস্কার দিতেই হয়, না দিলে মান থাকে না বার্লিনালের। হোক তা অনুল্লেখ্য।
‘আ ডিফারেন্ট ম্যান’-এ অভিনয়ের জন্য সেরা পুরস্কার (রৌপ্য ভল্লুক) দেয়া হলো সেবাস্টিয়ান স্টানকে। পুরস্কার ঘোষণার পরই প্রেক্ষাগৃহে ধিক্কার ধ্বনি।
চলচ্চিত্র উৎসব বার্লিনে তথা জার্মানিতে। প্রায় প্রতি বছরই কোনো না কোনো বিভাগে (অভিনয়েও) কোনো চলচ্চিত্র বা অভিনেতা-অভিনেত্রীকে পুরস্কারে সম্মানিত করা হয়। এবারই ব্যতিক্রম। তার মানে জার্মানিতে এখন ভালো ছবি হচ্ছে না। অভিনয়ের শিল্পীরাও কোনো অর্থেই গুণী নয় আর।
১০ দিনের উৎসব (১৫-২৪ ফেব্রুয়ারি) শেষে রাত ৮টায় মহা জৌলুসে, জাঁকজমকে পুরস্কার ঘোষিত ও বিতরিত। দেড় ঘণ্টাব্যাপী। কান্নাহাসির দোল দোলানি অনুষ্ঠান।
লেখক: কবি, লেখক ও সমালোচক










