খান আতাউর রহমান ছিলেন বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী। গায়ক, নায়ক, চরিত্রাভিনেতা, চলচ্চিত্র পরিচালক, সংগীত পরিচালক, গীতিকার, সুরকার, কাহিনীকার, চিত্রনাট্যকার ইত্যাদি। এমন গুণী প্রতিভা বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্পে আর আসেনি বোধ হয় (পর পরই আমজাদ হোসেনের নাম স্মরণ করে নিলাম)। 

অনেক দিনের ইচ্ছা সংগীত পরিচালক খান আতাকে নিয়ে কিছু লেখার। কিন্তু এত বড় মানুষকে নিয়ে চাইলেই হুট করে লেখা দাঁড় করিয়ে ফেলা যায় না। তার জন্য প্রস্তুতি প্রয়োজন, প্রয়োজন গবেষণা। ১৯৯৭ সালের ১ ডিসেম্বর খান আতাউর রহমান চলে যান এবং জন্মেছিলেন এ ডিসেম্বরেই-১৯২৮ সালের ১১ তারিখ। তাই তাকে শ্রদ্ধা জানাতেই তার রচিত ও সুরারোপিত অন্যতম জনপ্রিয় দুটি গান নিয়ে অল্পবিস্তর আলাপ করতেই এ লেখা।

ডিসেম্বর এলেই এক ধরনের দেশপ্রেমের চর্চা শুরু হয় আমাদের মধ্যে। এটাই স্বাভাবিক। এ মাস বিজয়ের মাস। নয় মাস মুক্তির যুদ্ধ শেষে এ ডিসেম্বরেই আমরা বিজয় অর্জন করেছি। দেশ স্বাধীন হয়েছে। যুদ্ধের আগে ও পরে এ নিয়ে অজস্র গান লেখা হয়েছে, গাওয়া হয়েছে। এখনো হয়, হবেও। আমিও খান আতার যে দুটি গান নিয়ে কিছু বলতে চাই, সে দুটি গানের একটি মুক্তিযুদ্ধের আগে ১৯৭০ সালে মুক্তি পাওয়া ‘‌জীবন থেকে নেয়া’ চলচ্চিত্রের গান ‘‌এ খাঁচা ভাঙব আমি কেমন করে’। আরেকটি ‘‌আবার তোরা মানুষ হ’ সিনেমার গান ‘‌এক নদী রক্ত পেরিয়ে’। গানটি মুক্তি পেয়েছিল স্বাধীনতার দুই বছর পর, ১৯৭৩ সালে।

প্রশ্ন আসা স্বাভাবিক যে খান আতাউর রহমানের এত শ্রোতাপ্রিয় গানের মধ্যে এ গান দুটিকে আমি কেন বেছে নিলাম? ছোট করে এর জবাব দিতে চাইলে দুটি যুক্তির কথা বলতে পারি- 

প্রথমত, এটি ডিসেম্বর মাস। যে মাস মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় আলোড়িত হয়ে থাকে, আর এ গান দুটিও সে চেতনাকেই ধারণ করা সময়কে নিয়ে। 

দ্বিতীয়ত, এ গান দুটির লিরিক আমার কাছে ভীষণ অর্থবহ বলে মনে হয় এবং আদতে সে বিষয় নিয়েই বিস্তারিতভাবে বলতে চাই।

২.

জীবন থেকে নেয়া ছবিটির পোস্টারে একটি স্লোগান লেখা ছিল- ‘একটি দেশ। একটি সংসার। একটি চাবির গোছা। একটি আন্দোলন’। 

ছবিটি ছিল পুরোপুরি রাজনৈতিক। একটি সংসারের গল্প বলার ছুতোয় পূর্ব পাকিস্তানের রাজনীতি, স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা ও সংগ্রাম সুনিপুণভাবে তুলে এনেছিলেন ছবিটির পরিচালক জহির রায়হান, যা বুঝতে তৎকালীন প্রশাসনের খুব একটা অসুবিধা হওয়ার কথা নয়, হয়ওনি। মুক্তির শুরুতেই এ সিনেমা নিয়ে হইচই পড়ে গেলে প্রথম দিনই সিনেমা হল থেকে ছবির প্রিন্ট জব্দ করা হয়। যদিও শেষ পর্যন্ত দর্শকের বিক্ষোভের কারণে ছেড়ে দিতেও বাধ্য হয়। 

ছবিতে সমান্তরালভাবে ঘরে ও বাইরে বিরাজমান রাজনীতিকে দেখানো হয়। উত্তাল দেশ, উত্তাল সংসার আর এ উত্তাল সময়ের ধাক্কায় মানুষ যেন হঠাৎ করেই বদলে যেতে থাকে, যার প্রতীকী চরিত্রে আমজাদ হোসেনকে আমরা অভিনয় করতে দেখি। কিন্তু সমাজে কিছু কিছু ছা-পোষা মানুষ থাকে যারা এসব উত্তাপ থেকে সব সময় নিজেকে বাঁচিয়ে চলার চেষ্টা করে। অনেকটা ‘সমাজ-রাষ্ট্র গোল্লায় যাক, চাচা আপনা প্রাণ বাঁচা’ টাইপের। এদের ভেতর শুভবোধ বা বুদ্ধি যতই থাকুক না কেন অনেকটা সাহসের অভাবেই এরা হয় ভীতু কিংবা সুবিধাবাদী। আমাদের সমাজে, রাষ্ট্রে এমন মানুষ অহরহ দেখতে পাই। ‘জীবন থেকে নেয়া’ চলচ্চিত্রের শেষ দিকে এসে সিনেম্যাটিক বদলটুকু বাদ দিলে খান আতাউর রহমানের অভিনীত চরিত্রটি বলা যায় এমনই কাছাকাছি ধরনের। কিন্তু এই যে চেনাজানা শুভবোধ থাকা অথচ সাহসের অভাবে ভোগা ভীতু সুবিধাবাদী যে চরিত্র তাদের উপস্থিতি কিন্তু বাংলা সংগীতে প্রায় বিরল। আর এখানেই এ ছবির উল্লেখিত গানটি আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ। গানটির গীতিকার, সুরকার, কণ্ঠশিল্পী, অভিনেতা সবকিছুতেই জড়িয়ে আছে খান আতাউর রহমানের নাম। 

ছবিতে আমরা দেখতে পাই, ঘরে-বাইরে চারদিকে যখন অস্থির সময় বিরাজমান তখন নিজেরই বাড়ির ছাদের এককোণে বসে খান আতা এ গান গাইতে থাকেন- 

এ খাঁচা ভাঙব আমি কেমন করে...

দিকে দিকে উঠল যখন শেকল ভাঙার গান

আমি তখন চোরের মতো হুজুর হুজুর করায় রত

চাচা পরান বাঁচা বলে বাঁচিয়েছি প্রাণ

আসলে ভাই একা একা বাঁচার নামে আছি মরে 

এ খাঁচা ভাঙব আমি কেমন করে...

গানটি নেপথ্য থেকে ভেসে আসা কোনো গান নয়, বিবেকের চরিত্রের মতো মধ্যমপুরুষের মহৎ বাণী নিয়ে হাজির হয়ে চিৎকার করে গাইতে থাকা কোনো উপদেশমূলক গানও নয়, গানটি উত্তমপুরুষে লেখা আত্মসমালোচনামূলক একটি গান। ঘুরে-ফিরে ছয়টি শব্দের একটা লাইনই বারবার উচ্চারণের মধ্য দিয়ে চরিত্রটি তার অবস্থান স্পষ্ট করে দেয় যে সে একজন পরাধীন মানুষ। একটি খাঁচার ভেতরে যে বন্দি হয়ে আছে। নিজের পরাধীনতা নিয়ে এ চরিত্র যেমন সচেতন, ঠিক তেমনি এ খাঁচা ভেঙে ফেলার ইচ্ছা এবং অপারগতার বয়ানটিও স্পষ্ট। মনোযোগী শ্রোতার এটাও বুঝতে সমস্যা হওয়ার কথা নয় যে সমাজের চারদিকে যখন শেকল ভাঙার গান বেজে ওঠে, ঠিক সে সময় নিজের এ অবস্থান নিয়ে উল্লেখিত চরিত্রটি কিন্তু ভীষণভাবে লজ্জিত, বিব্রত। নিজের প্রতি এক ধরনের বিদ্রূপ যেন প্রকাশ হয় গানটির সুর ও গায়কীতে। চোরের মতোই অপরাধী হিসেবে নিজেকে হাজির করে সে এ গানে- 

চাচা পরান বাঁচা বলে বাঁচিয়েছি প্রাণ

কিন্তু এ বেঁচে থাকা যে প্রকৃত প্রস্তাবে বেঁচে থাকা বলে না, একা একা বাঁচার মধ্যে যে সুখ ও সম্মানের চেয়ে গ্লানির পাল্লাটাই ভারী, সে সম্পর্কেও কিন্তু চরিত্রটি সজাগ। আর সে বোধ যখন কথায়-সুরে প্রকাশ হতে থাকে, তা হয়ে ওঠে দারুণ অর্থবহ তাৎপর্যময় ও ইঙ্গিতপূর্ণ-–

আসলে ভাই একা একা বাঁচার নামে আছি মরে 

এ খাঁচা ভাঙব আমি কেমন করে...

বাংলা চলচ্চিত্র বা আধুনিক গানের ইতিহাসে নিজেকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে এমন আত্মসমালোচনামূলক গানের দৃষ্টান্ত খুব বেশি আছে বলে মনে হয় না, পর্যবেক্ষণটি মাথায় রাখলে এই একটি গানের জন্যই গীতিকার, সুরকার, শিল্পী ও অভিনেতা খান আতাউর রহমান স্যালুট প্রাপ্য। (বাকি অংশ আগামীকাল)


আহমেদ বাবলু: কবি ও সংস্কৃতিকর্মী