ইরফান খান অভিনীত ‘বিল্লু বারবার’
ছবিটি এখনো দর্শকের মনে নাড়া দেয়। দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করা নরসুন্দর বিল্লুর অসহায় মুখের প্রতিচ্ছবি যেন আজ বেশি নাড়া দিচ্ছে। ছবির শেষ দৃশ্যে দারিদ্র্যের কশাঘাত থেকে মুক্তির পথ খুঁজে পাওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া যায়। সেই ছবিতে শেষ পর্যন্ত বিল্লুর মুক্তি মিলেছিল কিনা জানা নেই। তবে জীবনযুদ্ধে হেরে যেতে হলো বিল্লুখ্যাত ইরফান খানকে।
শুধু বিল্লু বারবার নয় পিকু, দ্য লাঞ্চবক্স, হিন্দি মিডিয়াম ছবিগুলো হয়তো ইরফান খান ছাড়া পূর্ণতা পেত না। কাহিনীর মূল নির্যাস ও স্বাদ দর্শকরা হয়তো অনুভব করতে পারতেন না। বলিউডের শক্তিমান এ অভিনেতা তার ক্যারিয়ারে আরো অনেক ছবি উপহার দিয়েছেন দর্শকদের। সেসব ছবিতে তার অভিনয় দক্ষতার পরিচয় পাওয়া যায়।
দীর্ঘদিন ধরে ব্রেন টিউমারের সঙ্গে লড়াই করছিলেন ইরফান খান। তার পরও সহজে হার মানেননি। অভিনয় তার রন্ধ্রে রন্ধ্রে। ঠিকই আংরেজি মিডিয়ামের ছবিতে অভিনয়ের জন্য লাইট-ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়েছিলেন। স্বতঃস্ফূর্ত অভিনয়ে যেন কমতি ছিল না তার। অসুস্থতার ছাপ এতটুকুও পড়তে দেননি। এ ছবির মধ্য দিয়েই ক্যান্সারের চিকিৎসার পরে বড় পর্দায় হাজির হয়েছিলেন তিনি। কিন্তু এটাই যে হবে তার শেষ ছবি, সে কথা হয়তো কেউই ভাবতে পারেননি।
জীবনমঞ্চ ত্যাগ করলেন বলিউডের কিংবদন্তি অভিনয়শিল্পী ইরফান খান (৫৩)। গতকাল সকালে মুম্বাইয়ের কোকিলাবেন ধীরুভাই হাসপাতালে মারা যান। শারীরিক অসুস্থতার কারণে তাকে মঙ্গলবার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে তিনি নিবিড় পর্যবেক্ষণে ছিলেন। মাত্র চারদিন আগে ২৫ এপ্রিল ইরফানের মা জয়পুরে মারা যান। অসুস্থতা আর লকডাউনের কারণে সেখানে যেতে এবং শেষকৃত্যে অংশ নিতে পারেননি তিনি। ভিডিও কনফারেন্সিংয়ের মাধ্যমে মাকে শেষ বিদায় জানিয়েছিলেন তিনি। মায়ের পর নিজেও সেই পথেই পাড়ি জমালেন।
২০১৮ সালের মে মাসে নিওরোএন্ডোক্রাইন টিউমারে আক্রান্ত হন ইরফান। উন্নত চিকিৎসার জন্য অনেকটা সময় তিনি লন্ডনে ছিলেন। মাঝখানে অভিনয় থেকে দীর্ঘ বিরতি নিয়েছিলেন এ অভিনেতা। এ বছর ‘আংরেজি মিডিয়াম’ চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন। তবে এর প্রচারণা করতে পারেননি। ছবিটি তারই অভিনীত অভাবনীয় ব্যবসাসফল ‘হিন্দি মিডিয়াম’-এর সিক্যুয়েল।
স্লামডগ মিলিয়নেয়ার ও জুরাসিক ওয়ার্ল্ড ছবির জন্য আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি পান ইরফান খান। তার প্রয়াণে হলিউডের বিনোদন অঙ্গন, বলিউড এমনকি বাংলাদেশের দর্শকরাও গভীর শোকে নিমজ্জিত হয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজেদের অভিব্যক্তি প্রকাশ করছেন অভিনয়শিল্পী ছাড়াও তার ভক্তরা। ২০১৭ সালে মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর ‘ডুব’ ছবিতে অভিনয় করেছিলেন ইরফান খান। এ ছবি তাকে বাংলাদেশের মানুষের কাছে বিশেষ পরিচিতি এনে দেয়। এ অভিনেতার মৃত্যুতে নির্মাতা ফারুকীও বিমর্ষ হয়ে পড়েছেন। তার চলে যাওয়াটা যেন বিশ্বাসই করতে পারছেন না এ নির্মাতা। সামাজিক মাধ্যমে এমন অনুভূতিই প্রকাশ করেছেন তিনি।
১৯৬৭ সালে ভারতের জয়পুরের কাছাকাছি টঙ্ক নামের গ্রামে মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন ইরফান খান। তিন ভাই-বোনের মধ্যে ইরফান ছিলেন বড়। তার বাবার মৃত্যুর পর তিনি ন্যাশনাল স্কুল অব ড্রামায় ভর্তি হয়েছিলেন। অবশ্য ছোটবেলায় ক্রিকেট খেলার প্রতি বেশি আগ্রহী ছিলেন তিনি। নির্মাতা মীরা নায়ার প্রথম শক্তিমান এ অভিনেতার প্রতিভার সন্ধান পেয়েছিলেন। ১৯৮৮ সালে সালাম বোম্বে ছবিতে তাকে অভিনয়ের সুযোগ দেন। প্রথম ছবিতেই বাজিমাত করেন এ অভিনেতা। জীবনের মোড় ঘুরে যেতে থাকে তার। তিনি থিয়েটারের পাশাপাশি টেলিভিশনেও কাজ করতেন। আশির দশকে টেলিভিশনে কাজ করার পর তিনি একটি সময়ে আটকে যাচ্ছেন বলে মনে করছিলেন। এরপর অবশ্য তাকে পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। আসিফ কাপাডিয়ার দ্য ওয়ারিয়র-এ অভিনয় করেন। তারপর কোনো বিরতি ছাড়াই তার অভিনয় জীবন তরতর করে সামনের দিকে এগিয়ে চলতে শুরু করে।
২০০৩ সালে ‘মকবুল’ ছবিতে অভিনয় করে একেবারে শিরোনামে চলে আসেন এ অভিনেতা। একের পর এক দুর্দান্ত সব ছবিতে নাম ভূমিকায় অভিনয় করতে থাকেন। দেখতে দেখতে তিনি ভারতের নামকরা একজন অভিনয়শিল্পী হয়ে উঠলেন। জীবন্ত অভিনয়, নির্ভরযোগ্য ও ধৈর্যশীল হওয়ায় দেশে-বিদেশে পরিচিতি লাভ করেন ইরফান। স্লামডগ মিলিয়নেয়ার ছবিতে তার অভিনয়ের সুনিপুণতার কারণে বেশ প্রশংসিত হয়েছিলেন। ছবিতে পুলিশের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন তিনি। তার অভিনয় দেখে ডেনি বয়েল বলেছিলেন, ‘বিউটিফুল টু ওয়াচ’। লাইফ অব পাই, জুরাসিক ওয়ার্ল্ড, দ্য মাইট হার্ট ছবিগুলোতে স্মরণীয় পারফরম্যান্স ছিল তার। হলিউডেও বেশ ভালো একটা অবস্থান করে নিয়েছিলেন ইরফান। দি অ্যামেজিং স্পাইডারম্যান, ইনফারনোর মতো ছবিগুলোয় তার অভিনয় সে কথাই যেন অকপটে বলে যায়।
নভেল করোনাভাইরাসের কারণে ইরফান খানের আংরেজি মিডিয়াম বক্স অফিসে ভালো অবস্থান করে নিতে পারেনি। কিন্তু ছবিতে তার অভিনয় দর্শক ও ভক্তদের মনে থেকে যাবে। এ ছবিতে অভিনয় সম্পর্কে তিনি তার ভক্তদের জন্য একটি ভিডিও শেয়ার করেছিলেন। বলেছিলেন, ‘আমরা এক ধরনের ইতিবাচকতা নিয়ে ছবিটি করেছি। আমি আশা করি, ছবিটি আপনাদের একই সঙ্গে হাসতে ও কাঁদতে সাহায্য করবে।’
হয়তো তিনি ঠিকই বলেছেন। ইরফান খান আজ নেই। কিন্তু তার অনবদ্য অভিনয় ও ছবির মধ্য দিয়ে দর্শক হাসতে থাকবে, কাঁদতে থাকবে।
সাড়ে তিন দশকের অভিনয় জীবনে অনেক দর্শকপ্রিয় ছবিতে অভিনয় করেছেন তিনি। ২০১১ সালে ভারত সরকার তাকে পদ্মশ্রী সম্মাননা দেয়। হিন্দি চলচ্চিত্রে তার বিখ্যাত কিছু ছবি রয়েছে। যেমন একাডেমি পুরস্কার মনোনীত সালাম বোম্বে, মকবুল (২০০৪), পান
সিং তোমার (২০১১), দ্য
লাঞ্চবক্স (২০১৩), হায়দার
(২০১৪), গুন্ডে
(২০১৪), পিকু
(২০১৫), তলওয়ার
(২০১৫), হিন্দি
মিডিয়াম (২০১৭)।










