(গতকালের পর)
দ্বিতীয় গানটি যে চলচ্চিত্রে ব্যবহৃত হয়েছে, সে চলচ্চিত্রের নাম ‘আবার তোরা মানুষ হ’। মুক্তি পেয়েছিল ১৯৭৩ সালে। খান আতাউর রহমানকে বিতর্কিত করে তুলতে এ ছবির বিশেষ ভূমিকা রয়েছে বলেই প্রতীয়মান হয়। কিন্তু আমাদের উদ্দেশ্য সে বিতর্ককে উসকে দেয়া নয়, বরং সে ছবিতে ব্যবহার হওয়া তখন থেকে বর্তমান পর্যন্ত এবং ধারণা করি যত দিন বাংলা ও বাংলাদেশ জারি থাকবে তত দিন পর্যন্তই অত্যন্ত জনপ্রিয় সে অমর সংগীতের দিকে মনোযোগ দেয়া। এ গানে কণ্ঠ দিয়েছিলেন শাহনাজ রহমতুল্লাহ্ এবং গীতিকার, সুরকার ও সংগীত পরিচালক হিসেবে ছিলেন খান আতাউর রহমান। গানটির শুরুতেই যেন বিবৃতির মতো ঘোষিত হয়-
এক নদী রক্ত পেরিয়ে/ বাংলার আকাশে রক্তিম সূর্য আনলে যারা তোমাদের এই ঋণ কোনো দিন শোধ হবে না। না না না শোধ হবে না।
মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে সাত কোটি মানুষের
জীবনের সন্ধান আনলে যারা সে দানের মহিমা কোনো দিন ম্লান হবে না না না না ম্লান হবে না।
গানটি যদি শুধু এসব শ্রদ্ধাঞ্জলি মিশ্রিত শব্দ-বাক্য দিয়েই পুরোটা রচিত হতো তাহলে হয়তো আজকের আলাপের প্রয়োজনীয়তা বা সুযোগই থাকত না। কিন্তু সে সরলীকরণের পথে না গিয়ে গানটি দৃষ্টি ফেলতে চাইছে ইতিহাসের সেই অনুল্লেখ্য অধ্যায়ের দিকে, যে দিকে মনোযোগী হলে আপনাকে ভাবিত করবে নিশ্চিতভাবেই। আর এজন্যই আর দশটি সাধারণ দেশপ্রেমের গান থেকে এ গানকে একেবারে ভিন্নতর হিসেবেই আমি দাবি করতে চাই।
কী এমন কথা বলা আছে এ গানে, যা সচরাচর দেখা যায় না? সে আলাপটিই বিস্তারিতভাবে করতে চাই। আমরা জানি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে অনেকেই জনযুদ্ধ হিসেবে দেখতে ভালোবাসেন। যুদ্ধে কী কী উপাদান থাকলে তাকে জনযুদ্ধ বলা যাবে, সে বিতর্কে না গিয়ে এটুকু অন্তত স্বীকার করে নেয়া যেতেই পারে যে বাংলার মুক্তিযুদ্ধে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত ছাড়াও আপামর সাধারণ মানুষ ব্যাপকভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন। যারা ছিলেন বাংলার কৃষক, জেলে, তাঁতি, কামার, কুমারসহ সর্বস্তরের সাধারণ জনগণ। দুর্ভাগ্যের ব্যাপার হলো, আমাদের সাধারণ ইতিহাসচর্চায় তাদের অবদান অনালোচিতই থাকে। এ ব্যাপারে ইতিহাসবিদ আফসান চৌধুরীর বয়ান অনেকটা এ রকম-
‘বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধে মূল শক্তি ছিল এ সাধারণ মানুষ। কিন্তু আমাদের ইতিহাসচর্চা বা বয়ানে সাধারণ মানুষের এ অভিজ্ঞতাটা আসে না। এটা কেন আসে না তার নিশ্চয় তাত্ত্বিক অনেক কারণ আছে। তবে আমার মনে হয়, প্রাতিষ্ঠানিকতা বা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে আমরা রাষ্ট্র বলতে যেটা বোঝাই, অর্থাৎ সরকারি রাষ্ট্র, উপরতলার রাষ্ট্র, ক্ষমতাবানদের রাষ্ট্র বা লিখতে-পড়তে পারে এমন মানুষের রাষ্ট্রের বয়ানই আমরা জানতে পারি। তাদের ভাবনায় আমাদের যে ইতিহাস নির্মিত হয়েছে, সেখানে সাধারণ মানুষের ভূমিকা নেই। এর একটা তাত্ত্বিক কারণ হচ্ছে- আমাদের সমাজ হলো অপ্রাতিষ্ঠানিক, আর রাষ্ট্র হচ্ছে প্রাতিষ্ঠানিক। এ প্রাতিষ্ঠানিক রাষ্ট্রের সঙ্গে সব সময় সমাজের একটা দ্বন্দ্ব থাকে। সে কারণে কোনো বিষয়ের বয়ানের পরিসর এলে সেখানে উপরতলার কথাই বারবার আসে। উপরতলা বলতে ধনীরাই শুধু নয়; সে সঙ্গে রাষ্ট্র যাদের নিজের অংশ হিসেবে স্বীকার করে নেয়, সেসব মানুষ।’ -দৈনিক সমকাল - ২৬ অক্টোবর ২০২১।
এবার আমাদের আলোচিত গানটির অন্তরার দিকে মনোযোগ দেয়ার সময় হয়েছে এবং আমি নিশ্চিত, যারা এ গান এত দিন ধরে শুনে এসেছেন, সেসব সংগীত শ্রোতার কাছেই এ গান এবার ভিন্ন মাত্রা নিয়ে হাজির হবে। গানটির প্রথম অন্তরা-
হয়তোবা ইতিহাসে তোমাদের নাম লেখা রবে না
বড় বড় লোকেদের ভিড়ে
জ্ঞানী আর গুণীদের আসরে
তোমাদের কথা কেউ কবে না।
তবু হে বিজয়ী বীর মুক্তিসেনা
তোমাদের এই ঋণ কোনো দিন শোধ হবে না।
না না না শোধ হবে না।
অর্থাৎ সাধারণ ইতিহাসচর্চার বাইরে থাকা একটি প্রসঙ্গকে কোনো প্রবন্ধ বা ইতিহাসমূলক গ্রন্থে নয়, ছোট্ট একটা গানের মধ্য দিয়ে অসাধারণ দক্ষতায় হাজির করেছেন খান আতাউর রহমান। শুধু এখানেই শেষ নয়, গানের সঞ্চারীতে এসে অনেকটা যেন বেদনা প্রকাশের মতো করেই এক ধরনের শ্লেষও প্রকাশ করেছেন তিনি, বলেছেন- –
থাক ওরা পড়ে থাক ইতিহাস নিয়ে
জীবনের দীনতা হীনতা নিয়ে।
এই যে না-বলা সামাজিক মানুষের চরিত্রকে, অনুল্লেখ্য ইতিহাসকে দুটি ভিন্ন ভিন্ন গানের মধ্য দিয়ে কুশলী শিল্পীর মতো হাজির করতে পারা, তা এক কথায় বাংলাদেশের এ ধারার সংগীতে বিরল আর এখানেই প্রকৃত শিল্পীর দায়বদ্ধতা প্রকাশ হতে দেখি এবং এসব অনন্য সৃষ্টির কারণেই একজন খান আতাউর রহমান আরো অনেক অনেক দিন বেঁচে থাকবেন আমাদের চলচ্চিত্র ও সংগীত শিল্পের ইতিহাসে।
আহমেদ বাবলু: কবি ও সংস্কৃতিকর্মী









