আজকের সূর্যাস্তে হারিয়ে যাবে ২০২৩ সালের সূর্য। কাল ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টে আসবে ২০২৪। ২০২৩-এ মুক্তি পেয়েছে ৫৫টি সিনেমা। ঢাকাই সিনেমার দর্শক এ বছর ভিন্নধর্মী অনেক গল্পের সিনেমা দেখেছে। রহস্য, রোমান্স, অ্যাকশন ও হরর সব ধারার সিনেমাই মুক্তি পেয়েছে চলতি বছরে। বছরের প্রথম সিনেমা হিসেবে মুক্তি পেয়েছিল আরিফিন শুভ অভিনীত অ্যাকশন ধাঁচের সিনেমা ‘ব্ল্যাক ওয়ার’ এবং শেষ সিনেমা ছিল মুক্তিযুদ্ধনির্ভর সিনেমা ‘মৃত্যুঞ্জয়ী’। এ বছরের মুক্তিপ্রাপ্ত সিনেমাগুলোর মধ্যে ছিল মুজিব: একটি জাতির রূপকার, ব্ল্যাক ওয়ার, অ্যাডভেঞ্চার অব সুন্দরবন, সাঁতাও, ভাগ্য, বীরকন্যা প্রীতিলতা, কথা দিলাম, মন দিয়েছি তারে, বুবুজান, মায়ার জঞ্জাল, ওরা ৭ জন, জে কে ১৯৭১, একটি না-বলা গল্প, রেডিও, লিডার: আমিই বাংলাদেশ, লোকাল, জ্বীন, শত্রু, আদম, কিল হিম, পাপ, প্রেম প্রীতির বন্ধন, আদিম, মা, সুলতানপুর, প্রিয়তমা, সুড়ঙ্গ, প্রহেলিকা, লাল শাড়ি, ক্যাসিনো, মাইক, ১৯৭১ সেই সব দিন, আম কাঁঠালের ছুটি, এমআর-৯, সুজন মাঝি, অন্তর্জাল, দুঃসাহসী খোকা, ইতি চিত্রা, মেঘের কপাট, অসম্ভব, যন্ত্রণা, আজব ছেলে প্রভৃতি। এছাড়া এ বছর হলিউডের সিনেমার পাশাপাশি আমদানি করা বলিউডের সিনেমা ‘পাঠান’, ‘জওয়ান’, ‘টাইগার থ্রি’, ‘অ্যানিমেল’, ‘মানুষ’ ও সর্বশেষ ‘ডাঙ্কি’ মুক্তি পায়।
সিনেমাগুলোর মধ্যে কয়েকটি সিনেমা সিঙ্গেল স্ক্রিন থেকে মাল্টিপ্লেসে ঢাকাই সিনেমার বাজার চাঙ্গা করেছে। মুক্তিপ্রাপ্ত সিনেমাগুলোর বাজার নিয়ে কথা হয় সিনেমা হল ও মাল্টিপ্লেক্স কর্তৃপক্ষের সঙ্গে। বাংলা সিনেমার বর্তমান বাজারের অবস্থা নিয়ে স্টার সিনেপ্লেক্সের প্রধান বিপণন কর্মকর্তা মেজবাহ উদ্দিন বলেন, ‘বর্তমানে ভিন্নধর্মী গল্প নিয়ে সিনেমা নির্মাণ হচ্ছে। আর দর্শক ফিরে আসছেন প্রেক্ষাগৃহে। বছরজুড়েই বাংলা ছবি মুক্তি পেয়েছে। এর মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই ঈদের সময় দর্শক বেশি সিনেমা দেখতে এসেছে। সব মিলিয়ে বছরের হিসাবে বলতে হবে এ বছর একাধিক সিনেমা ব্যবসা করেছে। লিডার: আমিই বাংলাদেশ, প্রিয়তমা, সুড়ঙ্গ, জ্বীন ও কিল হিম এ সিনেমাগুলো নিয়ে দর্শকের আগ্রহ ছিল চোখে পড়ার মতো। আর মুজিব: একটি জাতির রূপকার সিনেমাটার কথা বলতেই হবে। সব মিলিয়ে বলা যায়, এ বছর দর্শক বাংলা সিনেমা দেখতে এসেছে। ভালো গল্প পেলে দর্শক আসবে। তাই ভালো গল্পের সিনেমা নির্মাণ চালিয়ে যেতে হবে। তাহলে দর্শকের এ আগ্রহ অব্যাহত থাকবে।’
ব্লকবাস্টার সিনেমাসের বিপণন বিভাগের সহকারী ব্যবস্থাপক মাহবুব রহমান বলেন, ‘বাংলা সিনেমার প্রতি দর্শকের আগ্রহ বাড়ছে। ভালো গল্পের ভালো সিনেমা দেখতে দর্শক আসেন। এ বছর ব্লকবাস্টারে দর্শকের আগ্রহের সিনেমা নিয়ে বলতে গেলে বলতে হবে মুজিব: একটি জাতির রূপকার, প্রিয়তমা, সুড়ঙ্গ, জ্বীন, লিডার: আমিই বাংলাদেশ, কিল হিম এ সিনেমাগুলোর কথা। প্রেক্ষাগৃহে দর্শকের আসা অব্যাহত রাখতে ভালো গল্পের সিনেমা নির্মাণ করতে হবে বলে আমি মনে করি।’
সিনেমা সংকটে ঢাকার অন্যতম প্রাচীন সিনেমা হল হলো মধুমিতা, যা কয়েক বার বন্ধ রাখা হয়েছিল। চলতি বছরের সিনেমা ও বলিউডের সিনেমায় এ হলের হালচাল নিয়ে কথা বলেন এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইফতেখার উদ্দিন নওশাদ। তিনি বলেন, ‘চলতি বছর হলের সার্বিক অবস্থা চাঙ্গা ছিল বলা যায়। শাকিব খানের দুটি সিনেমা মুক্তি পায় এ বছর। একটি লিডার: আমিই বাংলাদেশ অন্যটি প্রিয়তমা। এ দুই সিনেমা ব্যবসা ভালো করেছে। আফরান নিশোর সুড়ঙ্গ সিনেমাটিও খুব ভালো ব্যবসা করেছে। আরো কয়েকটি সিনেমা দেখতে দর্শক হলে এসেছে। বছরের শুরুতে ব্যবসা জমে না উঠলেও দুই ঈদের সিনেমা আশার আলো দেখিয়েছে। আর বলিউডের সিনেমার মধ্যে পাঠান দেখতে প্রচুর দর্শক এসেছে হলে। জওয়ান নিয়েও ভালো সাড়া পেয়েছি। তবে ডাঙ্কি সে অনুযায়ী ব্যবসা করছে না।’
চলতি বছর প্রিয়তমা ও সুড়ঙ্গ এ দুটি সিনেমা সবচেয়ে বেশি আলোচিত ছিল বলা যায়। শাকিব খান ও ইধিকা পাল অভিনীত সিনেমাটি প্রযোজনা করেছেন আরশাদ আদনান। নাটক প্রযোজনার সঙ্গে দীর্ঘ সময় ধরে যুক্ত থাকলেও এটি তার প্রথম সিনেমা। প্রথম প্রযোজিত সিনেমায় সাফল্য নিয়ে নিজের আবেগের কথা জানান আরশাদ আদনান। প্রিয়তমার সফলতা প্রসঙ্গে আরশাদ আদনান বলেন, ‘সব দর্শকের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি আমি। একটি সিনেমার গল্প, নির্মাণশৈলী, শিল্পীদের অভিনয়, গল্প অনুযায়ী গান—সর্বোপরি একটি পরিপূর্ণ সিনেমা নির্মাণ হলে তা যে দর্শক দেখতে আগ্রহ প্রকাশ করে প্রিয়তমাই তার প্রমাণ।’
চরকি ও আলফা আই স্টুডিওজ লিমিডেটের যৌথ প্রযোজনায় সুড়ঙ্গ মুক্তি পায় ঈদুল আজহায়। রায়হান রাফীর পরিচালনায় এ সিনেমা দিয়েই বড় পর্দায় আফরান নিশোর অভিষেক হয়। তার সঙ্গে ছিলেন তমা মির্জা। আলফা আই স্টুডিওজ লিমিডেটের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহরিয়ার শাকিল সুড়ঙ্গ সিনেমাটির মুক্তি নিয়ে বলেন, ‘১৫ বছর ধরে দর্শককে ভালো ও নতুন কিছু উপহার দেয়ার চেষ্টা করছে আলফা আই। চরকিও দর্শকের অন্য রকমের কনটেন্ট উপহার দিয়ে যাচ্ছে। সুড়ঙ্গর মধ্য দিয়ে সেটা হয়েছে এ বছর। প্রেক্ষাগৃহে দর্শক ফেরানো সহজ নয়, সেটা রাফী পেরেছেন বা পারেন। সব মিলিয়ে এ সিনেমার সঙ্গে অনেক ইমোশন জড়িয়েছে।’
এছাড়া এ বছর মুক্তিযুদ্ধনির্ভর সিনেমার সংখ্যা ছিল চোখে পড়ার মতো। ১২টি মুক্তিযুদ্ধের সিনেমা মুক্তি পেয়েছে এ বছর। শিশুতোষ সিনেমা মুক্তি পেয়েছে চারটি। ভিন্ন ধারার গল্পের সিনেমাও দর্শককে মুগ্ধ করেছে। আগামীকাল নতুন বছরের সূচনা হতে যাচ্ছে। এরই মধ্যে অনেক নির্মাতা তাদের সিনেমা নিয়ে কথা বলছেন। ২০২৪ বাংলা সিনেমার জন্য নতুন কিছু দিতে পারে কিনা, সেটাই এখন দেখার পালা।










