১৩ বছর পর কবীর সুমন আবার বাংলাদেশে এলেন। শেষবার এসেছিলেন ২০০৯ সালে। এবারের আয়োজক পিপহোল নামক এক সংস্থা। সুমন প্রথম এসেছিলেন ১৯৯৬ সালে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের আমন্ত্রণে। আমরা তখন বাংলাদেশের বিশাল এক শ্রোতাগোষ্ঠী সুমনের গানে মাতাল হয়ে আছি। আমাদের মুখে মুখে ‘‌হাল ছেড়ো না বন্ধু’, ‘‌চেনা দুঃখ চেনা সুখ’, ‘‌হঠাৎ রাস্তায়’, ‘‌দশ ফুট বাই দশ ফুট’ আর অবশ্য অবশ্যই ‘‌তোমাকে চাই’ গান। সেবারও ঢাকার ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে একটি অনুষ্ঠান করেছিলেন সুমন আর আমার সৌভাগ্য হয়েছিল তার সেই কনসার্ট শোনার এবং প্রথমবারের মতো সরাসরি তাকে দেখার। আমরা সেই সময়ের শ্রোতারা তখন ভেসে গিয়েছিলাম আবেগ ও তুমুল উচ্ছ্বাসে। বুঝেছিলাম মানুষটির গান একা একা ঘরের ভেতরে ক্যাসেট বাজিয়ে (তখন ক্যাসেটেরই যুগ) শুধু শোনার নয়, তার পরিবেশন স্বচক্ষে দেখাটাও অনন্য এক অভিজ্ঞতা! একটা মানুষ, যিনি রবীন্দ্র যুগের পর নিজেই লিখছেন, সুর করছেন আবার গাইছেন। শুধু তাই নয়, এককভাবে মঞ্চটাকে জমিয়ে তুলতে কখনো গিটার বাজিয়ে গান গাইছেন, বাজাতে বাজাতে গাইতে গাইতে গলায় ঝুলিয়ে রাখা হারমোনিকাটা মুখে তুলে নিয়ে সুর তুলছেন এবং একটি গান শেষ করে নতুন গানে যাওয়ার পর হয়তো ঝড় তুলছেন কী বোর্ডে। এমনকি সেবার শহীদ কাদরীর কবিতা ‘‌রাষ্ট্র মানে লেফট রাইট’ গাইতে গিয়ে বুটের আঘাতে যেভাবে লেফট রাইট লেফট রাইট আওয়াজ তুলছিলেন, এখনো তা মনে হলে শরীরের সব লোমকূপ যেন শিউরে ওঠে। সেই শিহরণে মানুষটাকে একবার ছুঁয়ে দেব বলে স্বপ্ন দেখেছি তখন। তারপর দুই যুগ পেরিয়ে এসে গত ৪ মে কলকাতায় তার বাড়িতে গিয়ে জড়িয়ে ধরার সুযোগ হয় আমার, তবে সে গল্প এখানে না হয় থাক।

সুমনকে প্রথম দর্শনের অভিজ্ঞতার ২৬ বছর পর এবার যখন তার অনুষ্ঠান আয়োজনের দিনক্ষণ চূড়ান্ত হয়, টিকিটও বিক্রি হয়ে গেল। টিকিট নিয়ে হাহাকার পড়ে গেল। কেউ পেলেন এবং অনেকেই পেলেন না বলে নিউজে সয়লাব হয়ে গেল মিডিয়া ও ফেসবুকের ব্যক্তিগত দেয়াল। কবীর সুমন তার সহশিল্পীদের নিয়ে বাংলাদেশের ভূমিও স্পর্শ করে ফেললেন। এমন চূড়ান্ত একটি অবস্থায় এসে ডিএমপির মনে পড়ে গেল ভেনু হিসেবে বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর সুমন জ্বরে অনিরাপদ হয়ে উঠতে পারে! সুতরাং নির্ধারিত ভেনু ক্যানসেল! আয়োজকরা পড়ে গেলেন মহাফাঁপরে! শেষ পর্যন্ত অনুমতি মিলল সেই ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মঞ্চেই, যে মঞ্চে আমার প্রথম সুমন দর্শন হয়েছিল। দুই যুগ পেরিয়ে আবারো ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে প্রবেশ করলাম (১৫ অক্টোবর) আরেকটি অবর্ণনীয় অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে। কী কাকতালীয় ব্যাপার!

যদিও বাস্তবতা মাথায় রেখে প্রস্তুত ছিলাম যে ২৬ বছর পর হয়তো সেই পুরনো রূপে সুমনকে আর পাব না। বয়স হয়েছে তার। দাঁড়াতে বসতে সাহায্যের প্রয়োজন হয়। অথচ মঞ্চে এসে যখন প্রথম গান ধরলেন,

এক একেকটা দিন রঙ বেরং ফেরারি
ঝড়ের আঘাতে সব ভাঙে চুরমার
বন্দি পাখিটা তার সাহসী ডানার
ঝাপটায় বলে-এই ঝড় দরকারি

তখন মনে হলো এ বুড়ো পাখিটাও দরকারি ঝড় তোলার জন্য প্রস্তুত। যখন গাইলেন, –

‘‌হাল ছেড়ো না বন্ধু বরং কণ্ঠ ছাড়ো জোরে’ মনে হলো বাংলাদেশের দর্শককেও আশ্বস্ত করতে চাইছেন তিনি। পুরো হল জেগে উঠল। সবাই চিৎকার করে তার সঙ্গে গাইতে শুরু করল প্রায় প্রতিটি গান। ‘‌ও গানওয়ালা আরেকটি গান গাও’ বলে যেই টান দিলেন অমনি বাংলাদেশের দর্শক যেন বলতে চাইল এটা সুমনের গান নয়, এ গান সুমনকে বলতে চাওয়া সব শ্রোতার গান। বলা যায় দর্শকই পুরোটা সময় এ গান গাইল। মাঝখানে সিনেমার মতো ঘটে গেল এক দৃশ্য, পুরনো বন্ধু শাজাহান ফারুকের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে যখন শুনলেন তিনি এ হলরুমেই উপস্থিত, তখন এমনভাবে চিৎকার করে চলৎশক্তিহীন মানুষটা আচমকা দাঁড়িয়ে গেলেন যে আমার সঙ্গে সঙ্গে মনে পড়ল কবি অরুণ মিত্রকে নিয়ে তিনি নিজেই একটা গান গেয়েছিলেন-

উঠে দাঁড়ালেন যেমন দাঁড়ায়
পুরানো মাটিতে গাছের চারা
সে উত্থান দেখে নেয় শুধু
মহাজীবনের সঙ্গী যারা।

মনে হলো উপস্থিত দর্শকই উত্থান দেখা সেই মহাজীবনের সঙ্গী। মঞ্চে বয়েসী দুই বন্ধুর মিলন দৃশ্য দর্শককে বাড়তি আনন্দই দিল। পর পরই গান ধরলেন,

‘‌হাত পেতে নিয়ে চেটেপুটে খাই

বিসমিল্লার পাগলা সানাই’

আমরাও তখন চেটেপুটে খাচ্ছিলাম সুমনের প্রতিটি গান আর গানের ফাঁকে ফাঁকে তার নানা বয়ানকে। এ আয়োজন ‘‌তোমাকে চাই’ প্রকাশের ৩০ বছর উদযাপন উপলক্ষেই করা। সুতরাং শেষ করলেন তোমাকে চাই গেয়েই। বুড়ো বয়েসেও কণ্ঠের তারুণ্য দিয়েই সব শ্রোতাকে ডুবিয়ে দিলেন তিনি আবার ভাসিয়েও তুললেন।

শেষ করি বাংলা সংগীতের কিংবদন্তিতুল্য সংগীত মানুষ প্রিয় কবীর সুমনকে প্রেমিকা মেনে তার গান দিয়েই

‘‌ তোমাকে অভিবাদন প্রিয়তমা’ জয় হোক বাংলা গানের।

 

আহমেদ বাবলু: কবি ও সংস্কৃতিকর্মী