কলকাতার জনপ্রিয় অভিনেতা জিতু কমল। টেলিভিশন ও সিনেমা দুই ধারায়ই তিনি দর্শকের ভালোবাসা পাচ্ছেন। সম্প্রতি মুক্তি পাওয়া সিনেমা ‘মানুষ’ নিয়ে আলোচনায় আছেন এ অভিনেতা। সিনেমা ও ব্যক্তি জীবনের নানা বিষয় নিয়ে বণিক বার্তার সঙ্গে কথা বলেছেন জিতু কমল। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সাবিহা জামান শশী

বাংলাদেশের নির্মাতা সঞ্জয় সমাদ্দারের সঙ্গে কাজ করে নতুন কোনো বিষয় নজরে এল?

সঞ্জয়দার যে বিষয় আমার নজর কাড়ে সেটা হলো তিনি নিজেও একজন ভালো অভিনেতা। আমার মনে হয়েছে, সঞ্জয়দা একজন অভিনেতাকে নিজের মতো করে চরিত্রটা বোঝাতে পারেন। তিনি এ সিনেমা নির্মাণের যে সময়ে কলকাতায় ছিলেন, সারা দিন ফিল্মের মধ্যে ডুবে থাকতেন। সঞ্জয়দা সবসময় ফিল্মের পুরো বিষয় নিয়ে তৎপর থাকতেন। সিনেমার প্রতিটি বিষয় তার ধ্যানধারণাপ্রসূত এবং তিনি কী বলতে যাচ্ছেন, সেটা নিয়ে পরিষ্কার ধারণা নিয়েই আমাদের সঙ্গে বসতেন। এটা আমার খুব ভালো লাগত।

‌মানুষ সিনেমার মান্নান হয়ে ওঠার চ্যালেঞ্জ কী ছিল?

একেকটা সিনেমায় একেকটা চরিত্র করাই আমার কাজ। আমার গুরু গৌতম মুখোপাধ্যায় বলেছিলেন, ‘‌তোমার যেন প্রত্যেকটা কাজ আলাদা আলাদা হয়।’ আমি কাবুলিওয়ালা নাটকে কাজ করেছিলাম। এরপর আমি কমার্শিয়াল নাটকে কাজ করলাম। যখন আমি কমার্শিয়াল নাটক করলাম থিয়েটার দলের লোকেরাই বলেছিল, ‘‌এটা কি ওর দ্বারা হবে?’ এটাই গৌতমদা বলতেন, চ্যালেঞ্জ নিতে। এই যে নতুন চরিত্রের চ্যালেঞ্জ দর্শক যখন দেয় তখন খুব ভালো লাগে। আর কাজটা করার পর যখন আমি দর্শকের কাছ থেকে প্রশংসা পাই, তখন সেটা অনুপ্রেরণা দেয়। আমি ‘‌অপরাজিত’ করার পর প্রায় দেড় বছর কোনো কাজ করিনি। কারণ আমি এমন একটা কাজ করতে চাচ্ছিলাম, যেটা একদম অপরাজিত থেকে আলাদা হবে। কোথায় সত্যজিৎ রায়ের চরিত্র আর কোথায় মানুষ সিনেমার মান্নান। দুটো সম্পূর্ণ আকাশ আর পাতাল ফারাকের চরিত্র নিয়েছি। এটা আমার জন্য সত্যি চ্যালেঞ্জ ছিল। একজন অভিনেতা সব পারে। সে এক জীবনে অনেকগুলো চরিত্র যাপন করতে পারে। মোশাররফ করিম স্যারের কথা বলব, উৎপল দত্তের কথা বলব, তাদের কাজ দেখতে আমরা অপেক্ষা করি।

এবারে ‘‌অপরাজিত’ প্রসঙ্গে আসা যাক...

আমি প্রত্যেক সিনেমার ক্ষেত্রেই নানা এক্সপেরিমেন্ট করি। সত্যজিৎ রায়ের চরিত্র করা আমার জন্য প্রচণ্ড চ্যালেঞ্জিং ছিল। কারণ ভারত, বাংলাদেশ, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য প্রত্যেকটা জায়গায় কিন্তু মানুষটা পরিচিত। এমন একটা মানুষের চরিত্র অভিনয় করতে গিয়ে আমিও চাপে পড়েছিলাম। পরে সব চিন্তা বাদ দিয়ে ভাবলাম, অভিনেতা হিসেবে আমি কাজটা করে যাই। আমার পরিচালকের ওপর আমি খুব বিশ্বাস করেছিলাম। সত্যজিৎ রায়ের সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন এমন একজনের সান্নিধ্য আমি পেয়েছি। সত্যজিৎ রায়কে নিয়ে স্টাডি করেছিলাম। সব মিলেই চরিত্রটা ফুটে উঠেছিল। ফিল্ম হচ্ছে মিউচুয়াল আর্ট। অপরাজিত সিনেমাটাও সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় সিনেমা হয়ে উঠেছিল।

বাংলাদেশের সিনেমায় অভিনয় করার ইচ্ছা আছে?

হ্যাঁ, অবশ্যই। সব দেশেই অভিনয় করার ইচ্ছা আছে, কিন্তু চিত্রনাট্য যেন আমাকে উদ্দীপনা দেয়। আমার যদি মনে হয় আমি নির্মাতার ওপর আমার ভর দিতে পারব, তাহলে কোনো কথাই নেই। আমি একজন ডিরেক্টর আর্টিস্ট। আমি পরিচালকের প্রতি প্রচণ্ড বিশ্বাস রেখে কাজ করি। ওই রকমের যদি কোনো কাজ আসে, আমি অবশ্যই করব।

বাংলাদেশ থেকে অনেক সাংবাদিক আপনাকে ফোন দিচ্ছে। আমাদের দেশে আপনার অনেক ভক্ত আছে। এটা কেমন লাগছে?

এটা নিয়ে আমি বলতে চাই, যখন সিনেমাটা বাংলাদেশে মুক্তির কথা হলো, আমি দেখলাম পোস্টারে আমি নেই। তখন ভাবলাম, ঠিক আছে আমার কাজ যদি আমাকে প্রমাণ দেয়, তাহলে সাংবাদিকরা আমাকে অবশ্যই ফোন করবেন। আপনারা তখনই ফোন করবেন, যখন দর্শকের কাছে আমার গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হবে। এটাই স্বাভাবিক। আমি বিশ্বাস করি, আমার কাজ নিশ্চয়ই আমাকে খুঁজে দেবে।

আর্ট ফিল্ম ও বাণিজ্যিক ফিল্ম দুই ধারায়ই আপনি কাজ করছেন। অ্যাসিস্ট্যান্ট ডিরেক্টর হিসেবেও কাজ করেছেন। সিনেমা নির্মাণ করার পরিকল্পনা আছে?

ভবিষ্যতের ওপর আমি নজর দিই না। আমি বর্তমানে বিশ্বাসী। আমি আর্ট ফিল্ম সেভাবে না বলে বলব প্যারালাল ফিল্ম ও মেইন স্ট্রিম কমার্শিয়াল দুই ধরনের সিনেমায়ই আমি দুভাবে করার চেষ্টা করছি। যদি ভবিষ্যতে কখনো সুযোগ হয়, ইচ্ছা করে ও আমার যোগ্যতা হয় তাহলে করব। আর যদি সে যোগ্যতা না থাকে, তাহলে আমি জোর করে পরিচালনায় যাব না। এমনকি আমি জোর করে অভিনয় করব না। আমার যদি ভালো লাগে তাহলেই সেটা করি।

বড় পর্দায় আপনার নতুন কাজ নিয়ে বলা যাবে?

আমি ‘‌অরণ্যের প্রাচীন প্রবাদ’ নামের একটা সিনেমার শুটিং করছি এখন। এটা একটা ডিটেকটিভ ফিল্ম। এ সিনেমায় মিথিলা আছেন, শিলাজিৎদা আছেন। অনেক ভালো অভিনেতা-অভিনেত্রী আছেন এ সিনেমায়। ‘‌অরণ্যের দিনরাত্রি’ নামে একটা সিনেমা সত্যজিৎ বাবু করেছিলেন। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের স্ক্রিপ্ট অনুসরণ করে এ সিনেমা আমরা করেছি, যেটা অরুণ রায় পরিচালনা করেছেন। আর দুটো মেইন স্ট্রিম কমার্শিয়াল ফিল্ম আসবে।