ব্যক্তিগত একটি অভিজ্ঞতা দিয়ে শুরু করি। তখন করোনা মহামারী চলছে পৃথিবীজুড়ে। চারদিকে আতঙ্ক। এর মধ্যেই আমি গেছি স্থানীয় শ্মশানে। বন্ধুর ভাই দেহত্যাগ করেছেন সে সূত্রে। তো একদিকে শেষকৃত্যের কাজ চলছে আর অন্যদিকে শ্মশানেরই ধর্ম সংগীত গাওয়া এক শিল্পী দল দরদ দিয়ে গান ধরেছেন—

 

ডাক দিয়াছেন দয়াল আমারে

রইবো না আর বেশি দিন তোদের মাঝারে।।

...

ও আমি কতজনে কত কি দিলাম

যাইবার কালে একজনারও দেখা না পাইলাম

আমার সঙ্গের সাথী কেউ হইলো না রে

রইবো না আর বেশি দিন তোদের মাঝারে।।

 

দেখলাম উপস্থিত সবাই মন দিয়ে সে গান শুনছেন। আবেগে ভাসছেন। আর আমি মনে মনে একটি কথাই ভাবছিলাম, বাংলা চলচ্চিত্রে ব্যবহূত একটি গানের কতটা ক্ষমতা থাকলে সাধারণ মানুষের বিশ্বাসেও সে গান প্রভাব বিস্তার করতে পারে। এ গান ১৯৭৯ সালে মুক্তি পাওয়া ‘প্রাণ সজনী’ চলচ্চিত্রের। এন্ড্রু কিশোরের গাওয়া গানটির গীতিকার হিসেবে দীর্ঘদিন মনিরুজ্জামান মনিরের নাম থাকলেও সম্প্রতি কপিরাইট অফিস রায় দিয়েছে গানটির আসল গীতিকার সৈয়দ আসাদউদ্দৌলা শিরাজী। তবে সুরকার নিয়ে কোনো বিতর্ক তৈরি হয়নি। সুরকার আলম খান।

বাংলা চলচ্চিত্রের গান আমাদের সংগীতের ইতিহাসে যেমন অনেক ধারার জন্ম দিয়েছে, তেমনি সমৃদ্ধ ও পরিপুষ্ট করেছে প্রতিষ্ঠিত অনেক ধারাকেও। এসবের মধ্যে গুরত্বপূর্ণ ধারাটির নাম বাংলা লোকগানের ধারা। এ ধারায় চলচ্চিত্রসংগীতের ভূমিকা ও তার প্রভাব এতই বিস্তৃত যে সিনেমা ইন্ডাস্ট্রিতে নির্মিত অনেক গানকেই মানুষ লোকগান হিসেবে জানছে, মানছে, গ্রহণ করছে।

এ আলোচনার বিস্তারে যাওয়ার আগে আরেকটি কথা বলে নিই, সেটি হলো লোকজ ধারা বা লোকগানের ধারা কিংবা পল্লীগানের ধারা যা-ই বলি না কেন, এ ধারায় বিষয় বৈচিত্র্যের কিন্তু সীমা-পরিসীমা নেই। তবে আমার আলোচনা নির্দিষ্ট রাখতে চাইছি সে ঘরানাটিকে ঘিরে, যেখানে ভাববাদের চাষাবাদ হয়েছে। যেখানে ইহকাল-পরকাল, ঈশ্বর চিন্তা, দেহতত্ত্ব, পরম তত্ত্বের মতো নানা ভাব এসে মিশেছে আমাদের গানে। ভবিষ্যতে সময় পেলে এ ধারার অন্যান্য বিষয় বৈচিত্র্যকে নিয়েও আলাপ করা যাবে।

প্রাণ সজনী ছবির আরেকটি গানও এ ধারায় অনন্য সংযোজন। সে গানের শিল্পী সৈয়দ আব্দুল হাদী। গীতিকার মনিরুজ্জামান মনির।

 

চোখ বুজিলেই দুনিয়া আন্ধার

কীসের বাড়ি, কীসের ঘর, কীসের সংসার।।

ছয়টি রিপুর কুমন্ত্রণায় মত্ত রইলাম ভবের মায়ায়

করলাম শুধু লাভেরই কারবার

আইলে ভবে যাইতে হবে, ভাবলাম না একবার

চোখ বুজিলেই দুনিয়া আন্ধার।।

 

প্রথম গানটির মতো এ গানের সুরকারও আলম খান। এখানে আলম খানের কথা বিশেষভাবে বলাটা সংগত বলে মনে করছি। তিনি সান্নিধ্য পেয়েছিলেন লোকগানের কিংবদন্তি মানুষ পল্লী কবি জসীমউদ্দীনের। জসীমউদ্দীনই তাকে এ ধারার গানের কাজ করতে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন। অসাধারণ ব্যাপার হলো আলম খান লোকআঙ্গিকের গানে সুর করতে গিয়ে সবসময় সচেতন ছিলেন, সে সুর যেন মৌলিক হয়। সাধারণত লোকসুরের গান মানেই প্রচলিত সুরকে ভেঙে ভেঙে নতুন গান সৃষ্টির প্রবণতা থাকা। আলম খান তা চাননি। তিনি মনে করতেন, তাতে নতুন একটি গান হয়তো সৃষ্টি হলো, কিন্তু নতুন একটি সুর তো এখানে যুক্ত হলো না। এখন এ কথা নিশ্চিত করে বলাই যায়, তিনি তা সফলতার সঙ্গে করতে পেরেছেন।

তিনি যে পেরেছেন, সেই উদাহরণ দিতে গিয়ে ১৯৮২ সালের ‘বড় ভালো লোক ছিল’ সিনেমার গানগুলোর কথা উল্লেখ করতে পারি।

 

হায়রে মানুষ, রঙ্গীন ফানুস দম ফুরাইলেই ঠুস!

তবু তো ভাই কারোরই নাই একটুখানি হুঁশ।

পূর্ণিমাতে ভাইসা গেছে নীল দরিয়া

সোনার পিনিশ বানাইছিলা যতন করিয়া

চেলচেলাইয়া চলে পিনিশ, ডুইবা গেলেই ভুস!

হায়রে মানুষ, রঙ্গীন ফানুস দম ফুরাইলেই ঠুস!

 

এ গানের শ্রোতাপ্রিয়তা নিয়ে নতুন করে বলার কিছু নেই। গানটির গীতিকার সৈয়দ শামসুল হক। তিনি আলম খানকে বলেছিলেন, ‘আপনি “পূর্ণিমাতে ভাইসা গেছে” বলে যে টান দিয়েছেন, তাতেই মন ভরে গেছে।’ উল্লেখিত চলচ্চিত্রে আলম খান ও সৈয়দ হক জুটির আরো দুটি অসাধারণ গান আছে, একটি এন্ড্রু কিশোর ও সৈয়দ আব্দুল হাদীর গাওয়া ও পরেরটি এন্ড্রু কিশোরের একক।

০১.

আমি চক্ষু দিয়া দ্যাখতেছিলাম জগৎ রঙ্গিলা

মাওলা তোমার নূরানী তীর হঠাৎ মারিলা মাওলা আন্ধা করিলা।।

 

জমিদারের মতো আমি মজায় আছিলাম

তুমি আমার জমিদারি করিলা নিলাম

ও মাওলা নিলাম করিলা

মাওলা আন্ধা করিলা।।

০২.

তোরা দেখ তোরা দেখ তোরা দেখরে চাহিয়া

চোখ থাকিতে এমন কানা কেমন করিয়া

তোরা দেখ দেখ দেখরে চাহিয়া

রাস্তা দিয়াই হাইটা চলে রাস্তা হারাইয়া।।

হাতের কাছে এইতো মানিক সামনে এসে দাঁড়ায় খানিক

আবার অন্য দিকে যায় চলে সে মুখটি ফিরাইয়া।।

 

সুর, সংগীত আয়োজন ও গায়কীর পাশাপাশি সৈয়দ শামসুল হকের লেখা এ তিন গানের লিরিকের দিকে চোখ ফেরালে ধরা পড়বে লোক সংস্কৃতিকে জানতে বুঝতে চলচ্চিত্রের এসব মানুষেরা কী গভীরভাবে সচেষ্ট ও সফল ছিলেন।

এ পর্যায়ে সৈয়দ হকের কথা আরো কিছুটা বলতে চাই। চলচ্চিত্রে তিনি গান লেখা শুরু করেন ১৯৬৪ সাল থেকে সুভাষ দত্ত পরিচালিত ‘সুতরাং’ ছবি দিয়ে। সেই প্রথম থেকেই যে তিনি আধ্যাত্ববাদী গানে সিদ্ধহস্ত ছিলেন, তার প্রমাণ পাওয়া যায় সে বছরই মুক্তি পাওয়া ‘শীত বিকেল’ সিনেমায় পল্লীগানের প্রবাদপ্রতিম শিল্পী আব্দুল আলীমের কণ্ঠে—

 

তোমার সবই ছিল জানা ...

তবু আমায় দিয়ে ভুল ঠিকানা

রাখলে করে কানা।

 

আমি জগৎ ঘুরে এলাম

কোথাও তারে নাহি পেলাম

খুঁজতে গেলাম যারে

সে জন-ছিল আমার ঘরে ...

 

গানটিতে এর সুরকার ছিলেন শেখ মোহিতুল হক।

আব্দুল আলীমের কণ্ঠে গীত সৈয়দ শামসুল হকের লেখা আরো দুটি গানের কথা উল্লেখ না করলেই নয়, এর একটি সত্য সাহার সুরে ১৯৬৬ সালে ‘কাগজের নৌকা’ ছায়াছবির—

 

মন পাখি তুই আর কতকাল থাকবি খাঁচাতে

ও তুই উড়াল দিয়ে যারে পাখি বেলা থাকিতে।।

 

ও আরেকটি ১৯৬৯ সালে মুক্তি পাওয়া ‘অবাঞ্ছিত’ চলচ্চিত্রের বিখ্যাত গান—

 

কেহই করে বেচাকেনা কেহই কান্দে

রাস্তায় পড়ে ধরবি যদি তারে চল মুর্শিদের বাজারে।।

ফুলের বনে আছে কাঁটা মনের ঘরে চাবি আঁটা

ভাঙতে হবে ঘরের চাবি খুঁজবি যদি তারে

কাঁটার ঘায়ে অঙ্গরে তোর হয় যদি জরজর

কাঁদিস না আর বসে বসে পথেরই ধারে রাস্তায় পড়ে।।

 

তবে শেষোক্ত গানটির ব্যাপারে একটি তথ্য না বললেই নয়, গীতিকার সৈয়দ হকের সঙ্গে সুরকার হিসেবে আলী হোসেনের নাম থাকলেও প্রকৃত অর্থে এটি জালাল উদ্দীন খাঁ-এর গান, সৈয়দ শামসুল হক মূলত গানটি সম্পাদনা করার কৃতিত্ব পেতে পারেন। যদিও এমন মহাজনের গান সম্পাদনেও বিতর্কের অবকাশ থেকেই যায়। এ বিতর্ককে পাশ কাটিয়ে আমরা বরং আমাদের মূল আলোচনায় ফিরে যাই।

লোক আঙ্গিকের গানের ধারায় গীতিকার হিসেবে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ নাম গাজী মাজহারুল আনোয়ার। এ ধারায় তার উল্লেখযোগ্য গান অসংখ্য। মনে করিয়ে দিই সৈয়দ আব্দুল হাদীর কণ্ঠে আলাউদ্দিন আলীর সুরে ‘গোলাপী এখন ট্রেনে’র সে বিখ্যাত গান-

আছেন আমার মুক্তার আছেন আমার ব্যারিস্টার

শেষ বিচারের আদালতে তিনিই আমায় করবেন পার।

কিংবা একই সুরকারের সুরে ও রথীন্দ্রনাথ রায়ের গাওয়া ‘নাগর দোলা’ চলচ্চিত্রের—

 

তুমি আরেকবার আসিয়া যাও মোরে কান্দাইয়া

আমি মনের সুখে একবার কানতে চাই

পোড়া বুকে দারুণ খরা চোখের পানি চোখে নাই।।

 

আবার একই শিল্পী গাওয়া ও একই সুরকারের সুরে ‘ফকির মজনু শাহ’ ছবির এ গানেও অমূল্য এক সংযোজন—

 

সবাই বলে বয়স বাড়ে, আমি বলি কমে রে

এই মাটির ঘরটা খাইলো ঘুনেপ্রতি দমে দমে রে।।

 

চাইলে এমন অসংখ্য গানের উদাহরণ দেয়া যাবে। সময় সুযোগ পেলে আরো বড় পরিসরে এ নিয়ে ভবিষ্যতে হয়তো কথা বলাও যাবে। তবে আপাতত শেষ করি এ কথাটুকু বলে, বাংলা লোকজ গানের ধারায় আমাদের চলচ্চিত্র সংগীত কারখানার যে ভূমিকা ও অবদান তা অনুল্লেখ্যই থেকে গেছে। আশা করি ভবিষ্যতের সংগীত গবেষকেরা এ আলোকিত জায়গাটিতে চোখ রাখবেন।