সম্প্রতি বলিউড সিনেমার বাজার স্থবির হয়ে আছে। কারণ হিসেবে নির্মাতা ও বিশেষজ্ঞরা কনটেন্টের অভাবকে দায়ী করছেন। এ শূন্যস্থানে নির্মাতারা ঝুঁকছেন সাহিত্যের দিকে। গুরুত্ব পেতে শুরু করেছেন লেখকরা। আর এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে চড়া দামে সিনেমা নির্মাতাদের কাছে নিজেদের বইয়ের স্বত্ব বিক্রি করছেন তারা।

সাহিত্যনির্ভর সিনেমা অনেক আগে থেকেই তৈরি হতো। তবে বাণিজ্যিক ধারায় বলিউডে এ প্রবণতা শুরু হয়েছিল আরো দুই দশক আগে। বেস্টসেলার ঔপন্যাসিক হুসেন জাইদির ‘ব্ল্যাক ফ্রাইডে: দ্য ট্রু স্টোরি অব বোম্বে বম্ব ব্লাস্ট’-এর কাহিনী অবলম্বনে একটি সিনেমা তৈরি হয়। এর থেকেই ব্যতিক্রমী গল্পের জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকে। ফলে কাহিনী হিসেবে ঔপন্যাসিকদের লেখা গল্পের কদর অনেক বেড়ে যায়। যার ধারাবাহিকতায় চেতন ভগত, হারিন্দর সিক্কা, শচীন কুণ্ডলকার, আনুজা চৌহান প্রভৃতি লেখকের লেখা উপন্যাস চলচ্চিত্রে রূপান্তর হয়।

সম্প্রতি উপন্যাসের গল্প অবলম্বন করে গাঙ্গুবাই কাঠিয়াওয়াড়ি, দি অ্যাকসিডেন্টাল প্রাইম মিনিস্টার, পোনিয়িন সেলভান, রাজি প্রভৃতি সিনেমা নির্মিত হয়েছে। এসব সিনেমার গল্পে দর্শকরাও বেশ আমোদিত হচ্ছে। টু স্টেটস: দ্য স্টোরি অব মাই ম্যারেজ, থ্রি মিসটেকস অব মাই লাইফ, ফাইভ পয়েন্ট সামওয়ান, হাফ গার্লফ্রেন্ড, মুম্বাই ফেবলস, দেবদাস, পরিণীতা এর উদাহরণ।

এদিকে বহু পুরস্কারে ভূষিত অমীশ ত্রিপাঠী আরো এক ধাপ এগিয়ে নিজের লেখা উপন্যাস থেকে তার প্রথম সিনেমা তৈরি করতে যাচ্ছেন। লিজেন্ড অব সুহেলদেব: দ্য কিং হু সেভড ইন্ডিয়া উপন্যাসটি থেকে এ সিনেমা তৈরি হবে। ইন্ডাস্ট্রির সূত্রে জানা গিয়েছে, একই ধরনের সিনেমা আরো কয়েকটি আসছে। এমন ঘটনায় অনুপ্রাণিত হয়ে লেখকরা তার লেখা গল্পটি সিনেমায় রূপান্তর হতে পারে—এ ভাবনা থেকে নিজের উপন্যাসটি লিখছেন। এতে অর্থের সমাগম যেমন হচ্ছে তেমনি আধুনিক সময়ে ভিজুয়াল স্টোরিটেলিং আরো জনপ্রিয় হচ্ছে।

সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন আসছে, লেখক কি তাহলে সিনেমার জন্য তার লেখাটি লিখছেন। এর উত্তরে লেখকরা নতুন এ ঘটনাকে তাদের জন্য সম্ভাবনা হিসেবে মনে করছেন। এর মাধ্যমে তারা কোটি জনতার মাঝে জনপ্রিয় হচ্ছেন এবং তাদের লিখিত বই আরো বেশি পাঠককে আকর্ষণ করছে। এ প্রসঙ্গে গোয়েন্দা ও অনুসন্ধানমূলক উপন্যাসের জনপ্রিয় লেখক হুসেন জাইদির বক্তব্য উল্লেখ করতেই হয়। তিনি বলেন, ‘এ সময়ের যুবসমাজ অনেক বেশি আশাবাদী। তারা হিসাব করে পা ফেলে। তারা তো বলেই বসে, যদি হুসেনের লেখা থেকে ছবি হতে পারে তবে আমাদের লেখা থেকে কেন নয়? এমন চিন্তার জন্য তাদের আমি দোষ দিতে পারি না।’ অবশ্য ঔপন্যাসিক অমীশ ত্রিপাঠী নিজের লেখার বিষয়ে ভিন্ন কথা বলেন। তার মতে, লেখার সময়ে তা দিয়ে সিনেমা বানাবেন এমনটা ভাবেন না তিনি। বরং তিনি বইয়ে শব্দ কীভাবে ফুটিয়ে তুলবেন তা নিয়ে বেশি ভাবেন। বইকেই তিনি বেশি জীবন্ত করে উপস্থাপন করতে চান। তার ভক্তদেরও মন্তব্য, তার লেখা অধিক জীবন্ত।

সঞ্জয় গুপ্ত বেশ কয়েকটি বইয়ের কাহিনীকে সিনেমায় রূপ দিয়েছেন। তিনি সাহিত্যের উত্সুক পাঠক। বিনীত বাজপাই রচিত হরপ্পা ট্রিলজি নিয়ে আলাপ করতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘আমার তো মনে হয়েছে লেখক নিজেই বিস্তারিতভাবে এটি লিখেছেন। এত সুন্দর করে এটি লেখা হয়েছে, যখন পড়েছি তখন মনে হয়েছে আমি সিনেমার স্ক্রিপ্ট পড়ছি। ইংরেজি থেকে হিন্দি অনুবাদ করা ছাড়া এখানে আর তেমন কোনো কাজ করার নেই।’

এ প্রসঙ্গে অপর একজন চিত্রনাট্যকার আনন্দ নীলকণ্ঠনের কথা উল্লেখ করা যায়। অসুর: টেইল অব দ্য ভ্যানকুইশড, দ্য রাইজ অব শিবগামী, চতুরঙ্গ, কুইন অব মহিষ্মতী প্রভৃতি পুরাণনির্ভর উপন্যাসের রচয়িতা তিনি। তার মতে, ‘বই লিখে তো আর তেমন উপার্জন হয় না। তাই লেখকদের জন্য অধিক অর্থ উপার্জনের উপায় হলো চিত্রনাট্য রচনা।’

হুসেন জাইদি অবশ্য ভিন্ন প্রসঙ্গ নিয়ে কথা বলেন। তার মতে, ‘বলিউডে আকর্ষণীয় গল্পের অভাব চলছে। আর তাই বইয়ের গল্প সিনেমার জন্য উপযুক্ত বলে অনুভূত হচ্ছে। মূলত সে কারণে এসব বই থেকে সিনেমা নির্মাণের হিড়িক পড়ে গেছে। আর এজন্য নির্মাতারা বইয়ের স্বত্ব কিনতে শুরু করেছেন। আর সেখানে মুম্বাই অ্যাভেঞ্জার, ডোংগ্রি টু দুবাই, মাফিয়া কুইনস অব মুম্বাই প্রভৃতি বইয়ের মতো গল্প হলে তো কথাই নেই। এসব বই সিনেমার জন্য তৈরি হয়নি। কিন্তু এখানে যে গল্প বলা হয়েছে তার মোহ থেকে নির্মাতারা বের হতে পারেন না।’

বই প্রকাশের জন্য লেখা আর সিনেমার জন্য লেখা—দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন মাধ্যম। বই পড়ে একজন পাঠক তার কল্পনার রাজ্যে বিচরণ করেন। অন্যদিকে সিনেমার নির্মাতা তার ওপর ভিত্তি করে দর্শকদের জন্য সিনেমা নির্মাণ করেন। কিন্তু মূল যে বিষয় তা হলো গল্প। সবাই গল্প চায়। আর তাই বলিউডে বেড়ে চলছে সাহিত্যনির্ভর সিনেমার গুরুত্ব।