মিয়ানমারের অভ্যন্তরে বিদ্রোহীদের সামনে টিকতে না পেরে প্রাণভয়ে মিয়ানমার
থেকে পালিয়ে আসা মিয়ানমারের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সদস্যসহ (বিজিপি) ৩৩০ জন নাগরিককে
সে দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে। বৃহস্পতিবার (১৫ ফেব্রুয়ারি) উখিয়ার ইনানী উপকূলের নৌবাহিনীর
জেটি ঘাট এলাকা দিয়ে তাদের হস্তান্তর করা হয়।
সেন্টমার্টিন-টেকনাফ রুটের পর্যটকবাহী দুটি জাহাজে করে তাদের গভীর
সমুদ্রে অবস্থান করা মিয়ানমারের জাহাজে নিয়ে যাওয়া হবে। জাহাজটি বুধবার দিবাগত রাত
একটায় মিয়ানমার সিটু বন্দর থেকে বাংলাদেশের জলসীমায় এসে পৌঁছে।
এর আগে সকালে তাদের বান্দরবানের ঘুমধুম স্কুল ও টেকনাফের হ্নীলা উচ্চ
বিদ্যালয় থেকে বিজিবির বিশেষ ১১ টি বাসে কঠোর নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে ইনানীতে নৌ-বাহিনীর
জেটিঘাটে আনা হয়। সেখানে ইনানী ঘাটে স্থাপিত তাঁবুতে তাদের রেখে নাম ও ছবি সনাক্ত করে
জাহাজে তোলা হয়। নিরাপত্তার জন্য সকাল থেকে বন্ধ রাখা হয় কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ
সড়ক।
এর আগে সকাল ৯টা ৫০ মিনিটে স্পিডবোটযোগে মিয়ানমার সীমান্তরক্ষী বাহিনীর
পুলিশ কর্নেল মিউ থুরা নাঙয়ের নেতৃত্বে ৫ সদস্য বিশিষ্ট বিজিপি প্রতিনিধি দল ইনানীর
নৌ-বাহিনী জেটিঘাটে এসে পৌঁছে।
বিজিপি সদস্যদের হস্তান্তর অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বিজিবি মহাপরিচালক
মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকী ও মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূত অ কিউ মোয়ে।
এছাড়া মিয়ানমারের ৫ সদস্যের প্রতিনিধি দল ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়,
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, র্যাব, পুলিশ, কোস্টগার্ডসহ গোয়েন্দা বাহিনীর প্রতিনিধিরা উপস্থিত
ছিলেন।
হস্তান্তর শেষে বিজিবি মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান
সিদ্দিকী সাংবাদিকদের ব্রিফিং করেন। তিনি বলেন, সাম্প্রতিককালে মিয়ানমারের অভ্যন্তরে
চলমান সংঘর্ষের জেরে প্রাণভয়ে পালিয়ে আসা বাংলাদেশে আশ্রয় গ্রহণকারী বিজিপি সদস্যসহ
৩৩০ জন মিয়ানমারের নাগরিককে বর্ডার গার্ড পুলিশের (বিজিপি) কাছে হস্তান্তর করেছে বর্ডার
গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। এর মধ্যে ৩০২ জন বিজিপির সদস্য, ৪ জন বিজিপি পরিবারের সদস্য,
২ জন সেনাসদস্য, ১৮ জন ইমিগ্রেশন সদস্য এবং ৪ জন বেসামরিক নাগরিক।
মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান বলেন, দীর্ঘদিন ধরে মিয়ানমারের
অভ্যন্তরে জান্তা সরকারের বিভিন্ন বাহিনী ও সে দেশের সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠীর মধ্যে
সংঘর্ষ চলছে। অতিসম্প্রতি মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ এ সংঘর্ষের প্রভাব বাংলাদেশ-মিয়ানমার
সীমান্তেও এসে পড়ে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ধৈর্য ধারণ করে এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক
বজায় রেখে বিজিবিকে সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কাজ করার নির্দেশ দেন। প্রধানমন্ত্রীর
নির্দেশনা মেনে বিজিবির তত্ত্বাবধানে মিয়ানমার থেকে পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় গ্রহণকারী
সদস্যদের সম্পূর্ণভাবে নিরস্ত্রীকরণ করে এবং তাদের নিরাপদ আশ্রয় প্রদান করে। এদের মধ্যে
গুলিবিদ্ধ হয়ে গুরুতর আহত অবস্থায় আগত ৯ জন বিজিপি সদস্যকে বিজিবির তত্ত্বাবধানে চট্টগ্রাম
মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ও কক্সবাজার সদর হাসপাতালে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়।
তিনি বলেন, সীমান্তে বিজিবির টহল ও জনবল বৃদ্ধি করা হয়েছে। সর্বোচ্চ
সতর্ক অবস্থানে থেকে বিজিবি সীমান্তের পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করছে। বর্তমানে
সীমান্ত পরিস্থিতি বিজিবির নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। পরিস্থিতি যাই হোক, সীমান্ত দিয়ে আর একজন
মিয়ানমারের নাগরিককেও বাংলাদেশে প্রবেশ করতে দেয়া হবে না।
তিনি আরো বলেন, ১১ ফেব্রুয়ারি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত সভার
সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বিজিপিসহ ৩৩০ জন সদস্যকে মিয়ানমারে ফিরিয়ে দেয়ার জন্য বিজিবিকে নির্দেশনা
দেয়া হয়। বিজিবির রামু সেক্টরের কমান্ডার কর্নেল মেহেদী হোসাইন কবীরের নেতৃত্বে স্বরাষ্ট্র
মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি এবং কক্সবাজার জেলা প্রশাসন
ও পুলিশের প্রতিনিধির সমন্বয়ে সাত সদস্য বিশিষ্ট একটি প্রত্যাবাসন কমিটি গঠন করা হয়।
কমিটি মিয়ানমারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে দ্রুত যোগাযোগ ও সমন্বয় করে বাংলাদেশে
আশ্রয় গ্রহণকারী বিজিপিসহ অন্যান্য সদস্যদের মিয়ানমারে প্রত্যাবাসনের সকল প্রক্রিয়া
সম্পন্ন করে।
এরই ধারাবাহিকতায় বৃহস্পতিবার মিয়ানমার সীমান্তরক্ষী বাহিনীর পুলিশ
কর্নেল মোয়ে তোরা নাঙ এর নেতৃত্বে ৫ সদস্য বিশিষ্ট বিজিপি প্রতিনিধিদল কক্সবাজারের
ইনানীর নৌ-বাহিনীর জেটিঘাটে আসে এবং বিজিবির নিকট থেকে বাংলাদেশে আশ্রয় গ্রহণকারী মিয়ানমারের
৩৩০ জন নাগরিককে গ্রহণ করে মায়ানমারে নিয়ে যায়। অস্ত্র হস্তান্তর নিয়ে সাংবাদিকদের
প্রশ্নের জবাবে বিজিবি কমান্ডার বলেন, এটি আলাদা একটা প্রক্রিয়া, আগে ব্যক্তি হস্তান্তর
করার পর অস্ত্র নিয়ে দুই দেশের সফল আলোচনার পর এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।
ব্রিফিংয়ে মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূত অ কিউ মোয়ে বাংলাদেশ সরকার, পররাষ্ট্র
মন্ত্রণালয়, বিজিবি, কোস্টগার্ড, পুলিশ, র্যাব, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার মেডিকেল হাসপাতাল
কর্তৃপক্ষকে ধন্যবাদ জানান।
উল্লেখ্য, গত ৪ ফেব্রুয়ারি থেকে মিয়ানমারের সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠী
বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার তুমব্রু, ঘুমধুম ও বাইশফাঁড়ী সীমান্তের বিপরীতে মিয়ানমার
সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিপির তুমব্রু রাইট ও লেফট ক্যাম্পে আক্রমণ করে। একই সঙ্গে উখিয়ার
বালুখালী, পালংখালী এবং টেকনাফ উপজেলার হোয়াইক্যং সীমান্তের বিপরীতে কাইচিংরং, মইদু,
গুদুছড়া ও মংডু এলাকায়ও গোলাগুলি ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। ফলে মিয়ানমারের বিজিপি, সেনা,
পুলিশ, ইমিগ্রেশন ও বেসামরিক সদস্যরা প্রাণভয়ে পালিয়ে সীমান্ত অতিক্রম করে অস্ত্রসহ
বিজিবির কাছে আত্মসমর্পণ করে।
বিজিবিসহ একাধিক সূত্র জানিয়েছে, মিয়ানমারের অভ্যন্তরে যুদ্ধের প্রেক্ষিতে
গত ৪ ফেব্রুয়ারি থেকে কয়েক দিনে এ ৩৩০ সদস্য পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেন। যেখানে বিজিবির
অধীনে আহতদেরও চিকিৎসা দেয়া হয়।
এদিকে রাখাইনে সেনা ও বিদ্রোহীদের মধ্যে লড়াইয়ের প্রভাব পড়ছে সীমান্তের
এপারের জনগোষ্ঠীর মধ্যে। যুদ্ধের গুলি ও মর্টারশেল এসে পড়ছে বাংলাদেশ সীমান্তে। এরকম
ঘটনায় দুজনের মৃত্যু হয়েছে, আহত হয়েছেন ৯ জন।










