সিলেট নগরীসহ পুরো জেলায় বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতি হয়েছে। নগরীতে গতকাল সকাল থেকে পানি আরো বেড়েছে। ফলে বানভাসিরা বিশুদ্ধ পানি ও শুকনো খাবারের সংকটে ভুগছে। ব্যাহত হচ্ছে সড়ক যোগাযোগও। গতকাল বিকালে সিলেটে অনুষ্ঠিত দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির সভায় পানি আরো বাড়তে পারে মর্মে আভাস দেয়া হয়েছে।

সিলেট জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, জেলায় এ পর্যন্ত ২৭৫টি বন্যা আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। এর মধ্যে সিলেট নগরীতে খোলা হয়েছে ২২টি আশ্রয়কেন্দ্র। এ পর্যন্ত সিলেটে ৭৮টি আশ্রয়কেন্দ্রে লোকজন আশ্রয় নিয়েছে। আশ্রয়কেন্দ্রে মোট আশ্রিত লোকের সংখ্যা ৬ হাজার ৪৭৫।

সিলেট জেলার ১০৫টি ইউনিয়নের মধ্যে ৫৫টি ইউনিয়ন সম্পূর্ণভাবে এবং চারটি ইউনিয়ন আংশিক প্লাবিত হয়েছে। বন্যাকবলিত হয়েছে প্রায় ১২ লাখ মানুষ। বন্যায় আউশ ধানের বীজতলা ১ হাজার ৩০১ হেক্টর এবং বোরো ধানের ১ হাজার ৭০৪ হেক্টর জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। গ্রীষ্মকালীন সবজি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ১ হাজার ৪ হেক্টর। এছাড়া এলজিইডির ২০১.২২৩ কিলোমিটার রাস্তা এবং ২৮ মিটার কালভার্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সড়ক ও জনপথ বিভাগের ১০টি সড়কের ৫৫.৬০ কিলোমিটার পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে। বন্যার কারণে নৌকাডুবিতে সিলেট সদর ও জৈন্তাপুর উপজেলায় তিনজন এবং গোলাপগঞ্জ উপজেলায় পাহাড় ধসে একজনের মৃত্যু হয়েছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ড, সিলেটের তথ্য অনুযায়ী, সিলেটের কানাইঘাটে সুরমা বিপত্সীমার ১৪৩ সেন্টিমিটার, সিলেটে সুরমা বিপত্সীমার ১০ সেন্টিমিটার, আমলসীদে কুশিয়ারা বিপত্সীমার ১০৩ সেন্টিমিটার এবং শেওলায় কুশিয়ারা বিপত্সীমার ৩৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

এদিকে সিলেট নগরীর বন্যাকবলিত এলাকার বিদ্যুৎ সঞ্চালন কেন্দ্রে পানি প্রবেশ করায় বিদ্যুৎ ছিল না দক্ষিণ সুরমা এলাকায়। ওই সব এলাকার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও বাড়িঘরে পানি ঢুকেছে। কোথাও হাঁটুপানি আবার কোথাও কোমরপানি রয়েছে। পানির কারণে মানুষজন রাস্তায় চলাচল করতে পারছে না। বাড়ির রিজার্ভ ট্যাংকে নর্দমার পানি প্রবেশ করায় দেখা দিয়েছে বিশুদ্ধ পানির সংকট।

এছাড়া নিচু এলাকা হিসেবে পরিচিত শাহজালাল উপশহর, ঘাসিটুলা, মাছিমপুর, ছড়ারপার, তালতলা, কুয়ারপার, মেন্দিবাগ, কামালগড়, চালিবন্দর, যতরপুর, সোবহানিঘাট, কালীঘাট, শেখঘাট, তালতলা, জামতলা, মাছুদীঘিরপার, রামের দীঘিরপার, মোগলটুলা, খুলিয়াটুলা, পাঠানটুলা, সাগরদীঘিরপার, সুবিদবাজার, শিবগঞ্জ, মেজরটিলা, মদিনা মার্কেট, দক্ষিণ সুরমার বঙ্গবীর রোড, ভার্থখলা, মোমিনখলা, পিরোজপুর, আলমপুর ও ঝালোপাড়াসহ বিভিন্ন এলাকায় বাসাবাড়িতে পানি উঠেছে। এসব এলাকায় বাসাবাড়িতে কোমরপানি। বাসাবাড়িতে পানি ওঠায় মানুষ বড় কষ্টে আছে।

এদিকে সীমান্তবর্তী সিলেট সদর উপজেলা, কানাইঘাট, কোম্পানীগঞ্জ, গোয়াইনঘাট, জকিগঞ্জ ও জৈন্তাপুর উপজেলার বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তিত রয়েছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ড সিলেটের উপসহকারী প্রকৌশলী নিলয় পাশা জানান, উজানে এখনো প্রচুর বৃষ্টি হচ্ছে। ফলে নদীর পানি দ্রুত বাড়ছে। সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।

সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বিধায়ক রায় চৌধুরী জানান, সিলেট নগরীতে বন্যা আশ্রয়ণ কেন্দ্র খোলা হয়েছে। আশ্রিত পরিবারের মাঝে শুকনো খাবার বিতরণ করা হচ্ছে। প্রয়োজনীয় সেবা তারা পাবে। পুরো বিষয়টি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে।

সিলেটের জেলা প্রশাসক মো. মজিবর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, কিছু সরকারি স্থাপনায় পানি উঠলেও সেবা ব্যাহত হচ্ছে না। সব প্রতিষ্ঠানেরই স্বাভাবিক কার্যক্রম অব্যাহত আছে।

সিলেটের নদীগুলো ভরাট হয়ে গেছে—পররাষ্ট্রমন্ত্রী

পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন বলেছেন, সিলেটের প্রধান দুই নদী সুরমা, কুশিয়ারা খনন না করলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ হতে পারে। এসব নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে গেছে। সিলেটে বন্যা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে এসে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ মন্তব্য করেন। এ সময় তার সঙ্গে ছিলেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. এনামুর রহমান।

গতকাল বিকালে জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত সিলেট জেলায় সাম্প্রতিক বন্যা পরিস্থিতি পর্যালোচনা ও করণীয় বিষয়ক মতবিনিময় সভায় অংশ নেন তারা।

বন্যার্তদের প্রতি সহমর্মিতা জানিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বন্যার পানি বেশি দিন থাকবে না। দ্রুতই নেমে যাবে। ফলে কয়েকটা দিন কষ্ট করতে হবে। এই সময়ে সরকার আপনাদের পাশে আছে।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. এনামুর রহমান বলেন, সিলেটে বন্যাদুর্গত এলাকায় ২৫ লাখ টাকা ও ২০০ টন চাল বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। প্রয়োজনে আরো বরাদ্দ দেয়া হবে।

এ সময় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ সচিব মো. কামরুল হাসান, সিলেট মহানগর পুলিশ কমিশনার নিশারুল আরিফ, সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বিধায়ক রায় চৌধুরী, সিলেটের জেলা প্রশাসক মো. মজিবর রহমান, সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি শফিকুর রহমান চৌধুরী, মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক জাকির হোসেন উপস্থিত ছিলেন।