মিয়ানমারে সংঘাতের কারণে টেকনাফ থেকে সেন্ট মার্টিন যাওয়ার নৌরুট অনেকটা অনিরাপদ হয়ে পড়েছে। এ রুটে চলাচলকারী নৌযানকে লক্ষ্য করে বেশ কয়েকবার মিয়ানমার থেকে গুলি বর্ষণের ঘটনাও ঘটেছে। নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনা করে বিকল্প নৌপথ হিসেবে টেকনাফের সাবরাং মুন্ডার ডেইল উপকূল ব্যবহার করছিল নৌযানগুলো। তবে সে নৌপথেও গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। গত বুধবার বেলা ২টার দিকে টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপ বদরমোকাম এলাকা অতিক্রমের সময় দুটি ট্রলার লক্ষ্য করে গুলি ছোড়া হয়েছে।

সেন্ট মার্টিন সার্ভিস ট্রলার মালিক সমিতির সভাপতি আবদুর রশিদ এ তথ্য নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, দুপুর ১২টার দিকে সেন্টমার্টিন ঘাট থেকে ৭৫ জন যাত্রী নিয়ে টেকনাফের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করে এফবি নাইম ও এফবি রাশেদ নামে দুটি ট্রলার। একসঙ্গে যাত্রা করা ট্রলার দুটি বিকল্প নৌপথ ব্যবহার করে বঙ্গোপসাগর অতিক্রম করছিল। বেলা ২টার দিকে নাফ নদীর মোহনায় প্রবেশ করলে মিয়ানমার থেকে একের পর এক গুলি বর্ষণ শুরু হয়। চালকরা কৌশলে ট্রলার চালিয়ে গেলেও টানা আধা ঘণ্টা ধরে ট্রলার দুটিকে লক্ষ্য করে গুলি বর্ষণ করে। তবে কোনো যাত্রী হতাহত না হলেও ট্রলারে গুলি লেগেছে। বেলা আড়াইটার দিকে ট্রলার দুটি শাহপরীর দ্বীপের জেটিতে অবতরণ করে। ট্রলার দুটি ঘাটে পৌঁছানো পর্যন্ত ওপার থেকে টানা গুলি বর্ষণ করা হয়েছে।

আবদুর রশিদ বলেন, ‘মিয়ানমার থেকে দূরে বাংলাদেশের অভ্যন্তরের ট্রলার দুটি চলাচল করছিল। এর পরও গুলি বর্ষণ করায় চালকসহ দ্বীপবাসীর মনে নতুন করে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে।’

কারা গুলি করেছে এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘যতটুকু জানা গেছে মিয়ানমারের ওপারের অংশ নাইক্ষ্যংদিয়া আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে। তারাই গুলি করতে পারে।’

এ ব্যাপারে টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আদনান চৌধুরী বলেন, ‘মিয়ানমার থেকে সেন্টমার্টিনের দুটি ট্রলারে আবারো গুলি বর্ষণের বিষয়টি জেনেছি। এ ব্যাপারে ঊধ্বর্তন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। তাদের সিদ্ধান্তের পর পরবর্তী ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

এর আগে ১ জুন বিকালে টেকনাফ থেকে সেন্টমার্টিনের উদ্দেশে রওনা হওয়া পণ্যসহ ১০ যাত্রীর একটি ট্রলার লক্ষ্য করে নাইক্ষ্যংদিয়া থেকে গুলি বর্ষণ করা হয়। এছাড়া ৫ জুন সেন্টমার্টিনের স্থগিত হওয়া একটি কেন্দ্রে টেকনাফ উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান পদের ফলাফল নির্ধারণের জন্য ভোট গ্রহণ হয়। আনুষ্ঠানিকতা শেষে ফেরার পথে দায়িত্বরত ম্যাজিস্ট্রেটসহ নির্বাচনসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ট্রলারকে লক্ষ্য করে একই পয়েন্টে ফের গুলি করা হয়। ৮ জুন আরো একটি ট্রলারকে লক্ষ্য করে গুলি করা হয় একই পয়েন্টে। 

সর্বশেষ ১১ জুন একটি স্পিড বোটকে লক্ষ্য করে গুলি বর্ষণ করা হয়। প্রতিটি গুলি বর্ষণের ঘটনাই বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ জলসীমায় ঘটেছে। গুলি বর্ষণের এসব ঘটনায় হতাহত না হলেও নিরাপত্তা বিবেচনা করে টেকনাফ-সেন্টমার্টিন রুটে নৌযান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এতে দ্বীপে খাদ্য সংকট ও জরুরি আসা-যাওয়ার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়।

গত ১২ জুন কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের জরুরি সভায় বঙ্গোপসাগরকে ব্যবহার করে যাত্রীদের আসা-যাওয়া ও পণ্য নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। ১৩ জুন থেকে টেকনাফের সাবরাং মুন্ডার ডেইল উপকূল ব্যবহার করে শুরু হয় যাত্রীদের আসা-যাওয়া। ১৪ জুন কক্সবাজার শহর থেকে দ্বীপে পণ্য নিয়ে যায় জাহাজ। আর বিকল্প পথ হিসেবে শাহপরীরদ্বীপ ও সেন্টমার্টিনে সীমিত পরিসরে কিছু নৌযান চালানোর সিদ্ধান্ত হয়। এর পর থেকে কিছুদিন পরপর বিকল্প নৌ পথটি ব্যবহার করে সেন্টমার্টিনের আসা যাওয়া চলে আসছিল।

এদিকে টেকনাফের বাহারছড়া ইউনিয়নের নোয়াখালীপাড়া সমুদ্র উপকূলীয় এলাকায় মিয়ানমার থেকে পাঁচ রোহিঙ্গা পালিয়ে এসেছে। বুধবার বিকালে ট্রলার নিয়ে বঙ্গোপসাগর অতিক্রম করে দুই নারীসহ তারা অনুপ্রবেশ করে। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন টেকনাফের বাহারছড়া পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের পরিদর্শক মো. ছমি উদ্দিন।

তিনি বলেন, ‘বিকালে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এসব রোহিঙ্গাকে আটক করেন। নোয়াখালীপাড়ার ঘাট থেকে তাদের আটক করা হয়। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।’