৩৫ বছর পর অনুষ্ঠিত হয়েছে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ (চাকসু), হল ও হোস্টেল সংসদ নির্বাচন। গতকাল এ নির্বাচনে ২৭ হাজার ৫১৬ ভোটারের মধ্যে ৭০ শতাংশ ভোট দিয়েছেন বলে জানিয়েছে নির্বাচন কমিশন। দু-একটি কেন্দ্রে মৃদু উত্তেজনা ছাড়া মোটামুটি শান্তিপূর্ণভাবে ভোটগ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে। রাত ১টা পর্যন্ত মাস্টারদা সূর্যসেন হল, অতীশ দীপঙ্কর হল ও চারুকলার শিল্পী রশিদ চৌধুরী হোস্টেলের ঘোষিত ফলাফলে ভিপি পদে ছাত্রদলের প্রার্থীরা এগিয়ে ছিলেন।
সকাল থেকে ভোটার, প্রার্থী, প্রার্থীদের পোলিং এজেন্টরা ভোট প্রদানের সময় অমোচনীয় কালি ব্যবহার না করা, ভোটারের স্বাক্ষর না নেয়াসহ বেশ কয়েকটি অভিযোগ করেন। তবে নির্বাচন কমিশন ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বলেছে, ছবিযুক্ত ভোটার তালিকা রাখার কারণে আঙুলে ভোট প্রদানের প্রমাণক চিহ্ন গুরুত্বপূর্ণ নয়। এমনকি ভোট দেয়ার সময় স্বাক্ষরও গুরুত্বপূর্ণ নয়। মিডিয়াকে তথ্য সংগ্রহের সর্বোচ্চ প্রবেশাধিকার দেয়ার কারণে আনন্দ-উচ্ছ্বাসের মধ্য দিয়ে শিক্ষার্থীরা ভোট দিয়েছেন।
ভোটগ্রহণ শুরুর দেড় ঘণ্টার মাথায় ক্যাম্পাসে বহিরাগত প্রবেশ নিয়ে অভিযোগ করেছে ইসলামী ছাত্রশিবির এবং জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল। তবে দুই ছাত্রসংগঠনের পক্ষে প্রার্থীরা অভিযোগ করলেও তারা এ বিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট ছাত্রসংগঠন বা প্যানেলকে অভিযুক্ত করেননি।
চাকসু নির্বাচনের প্রধান নির্বাচন কমিশনার অধ্যাপক ড. মনির উদ্দিন বলেন, ‘আনন্দ-উচ্ছ্বাসের মধ্য দিয়ে চাকসু নির্বাচন হয়েছে। নির্বাচনে ৭০ শতাংশের মতো শিক্ষার্থী ভোট প্রদান করেছে। ওএমআর পদ্ধতির ভোট গণনা ছাড়াও ছবিযুক্ত ভোটার তালিকার মাধ্যমে আমরা একটি স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ ভোট আয়োজন করতে পেরেছি।’
এর আগে অমোচনীয় কালি নিয়ে ওঠা অভিযোগ প্রসঙ্গে অধ্যাপক মনির উদ্দিন জানান, অনেক খুঁজেও অমোচনীয় কালি না মেলায় যে কালি পাওয়া গেছে তা-ই নির্বাচনে ব্যবহার করা হয়েছে।
এদিকে ভোট গ্রহণ শেষে কলা অনুষদে দুই সংগঠনের প্রার্থী ও সমর্থকদের মধ্যে উত্তেজনা দেখা গেছে। ভোট গণনাকালে কেন্দ্রের বাইরে এলইডি প্রজেক্টরের সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে মনিটর বন্ধ হয়ে যাওয়াকে কেন্দ্র করে নতুন কলা ভবনের সামনে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের সমর্থকদের মধ্যে বাগ্বিতণ্ডা শুরু হয়।
ঘটনাস্থলে উপস্থিত বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক সাইফুদ্দিন সালাম মিঠু বলেন, ‘নতুন কলা ভবনের এলইডি প্রজেক্টরটি প্রায় ১ ঘণ্টা ধরে বন্ধ ছিল। সাধারণ শিক্ষার্থীরা বিষয়টি নিয়ে প্রতিবাদ করলে বহিরাগত ও অন্য একটি সংগঠনের সমর্থক ও নেতাকর্মীরা আমাদের দিকে তেড়ে আসে। প্রজেক্টর দীর্ঘ সময় কেন বন্ধ ছিল এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় ও নির্বাচনসংশ্লিষ্টদের কাছে জানতে চাইলেও কোনো সদুত্তর পাওয়া যায়নি। এজন্য সাধারণ শিক্ষার্থীরা নতুন কলা ভবনের গেটে এসে বিক্ষোভ করেন।’
অন্যদিকে চবি ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক সভাপতি রাজিবুল হাসান বাপ্পি উপস্থিত সাংবাদিকদের বলেন, ‘ছাত্রদলের কিছু নেতাকর্মী নিয়ম লঙ্ঘন করে ফ্যাকাল্টির তালা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করার চেষ্টা করছে। খবর পেয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীরা অন্যায় এ প্রচেষ্টাকে রুখে দেয়। তখন সাধারণ শিক্ষার্থীরা তাদের প্রতিরোধ করে।’
‘বিনির্মাণ শিক্ষার্থী ঐক্য’ প্যানেলের পক্ষে ভিপি প্রার্থী আবির বিন জাবেদ অভিযোগ করেন, ‘আমাদের পোলিং এজেন্ট ও পর্যবেক্ষক মারফত জানতে পেরেছি শহীদ হৃদয় চন্দ্র তরুয়া ভবন কেন্দ্রে অমোচনীয় কালি ব্যবহার করা হয়নি। এছাড়া ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদ ভোট কেন্দ্রের ২২৩ নং রুমে আনুমানিক ৮০ জন, বিজ্ঞান অনুষদ ভোট কেন্দ্রে ১২২ নং রুমে ১৭ জন এবং আইটি অনুষদের ২১৪ নং রুমে আনুমানিক ২০ জন ভোটারকে দায়িত্বরত কর্মকর্তার স্বাক্ষর ছাড়াই ব্যালট প্রদান করা হয়েছে বলে খরব পেয়েছি। আমরা প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে এ বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে লিখিত অভিযোগ দিয়েছি।’
এদিকে ছাত্রদল ও ইসলামী ছাত্রশিবির সন্ধ্যায় চাকসু নির্বাচন নিয়ে সংবাদ সম্মেলন করেছে। নির্বাচন নিয়ে অনিয়ম, অব্যবস্থাপনার বিষয়ে উভয় দলই সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ করেন। বিশেষ করে নির্বাচনকে প্রভাবিত করা, অমোচনীয় কালি ব্যবহার না করা, স্বাক্ষরবিহীনভাবে ব্যালট প্রদানসহ নির্বাচন কমিশন ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের বিরুদ্ধে সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনে ব্যর্থতার অভিযোগ তোলেন তারা।
গতকাল বিকালে অনিয়মের অভিযোগ তুলে বিশ্ব ইনসানিয়াত বিপ্লব স্টুডেন্ট ফ্রন্ট সমর্থিত ‘রেভল্যুশন ফর স্টেট অব হিউম্যানিটি’ প্যানেলের প্রার্থীরা চাকসু নির্বাচন বর্জন করেছে। বিকাল ৪টা ৩৫ মিনিটের দিকে এ ঘোষণা দেয়া হয়।
এদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের অক্সিজেন-হাটহাজারী সড়কের এক নম্বর গেট এলাকায় রাতে মুখোমুখি অবস্থান নেয় বিএনপি-ছাত্রদল ও জামায়াত-ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মী ও সমর্থকরা। নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণাকে কেন্দ্র করে এ পরিস্থিতি তৈরি হয়। রাত সাড়ে ১১টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের এক নম্বর গেট এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা সেখানে স্লোগান দিচ্ছেন। কিছুটা দূরে অবস্থান করছেন শিবিরের সমর্থকরা। ঘটনাস্থলে বিপুলসংখ্যক পুলিশ, বিজিবি ও অন্যান্য আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য মোতায়েন ছিলেন।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) উপাচার্য ড. ইয়াহ্ইয়া আখতার বণিক বার্তাকে বলেন, ‘চাকসু নির্বাচনে ইতিহাস গড়েছে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। ডাকসু, জাকসু নির্বাচনে ছবিযুক্ত ভোটার তালিকা ব্যবহার করা হয়নি। আমরা করেছি। এতে চাকসু নির্বাচনে অধিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করেছে নির্বাচন কমিশন।’ গতকাল বিকালে কলা অনুষদের বিভিন্ন ভোট কেন্দ্র পরিদর্শনকালে তিনি এসব কথা বলেন।
তিনি বলেন, ‘বুধবার রাতের মধ্যে ফলাফল দেয়ার চেষ্টা চলছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার ফলাফল ওএমআর মেশিনে গণনার অভিজ্ঞতা থাকলেও ভোট গণনার অভিজ্ঞতা নেই। এর পরও আমরা চেষ্টা করছি দ্রুত সময়ের মধ্যে ফলাফল ঘোষণা করতে।’
এদিকে রাত পৌনে ৯টার দিকে চাকসু নির্বাচনে চারুকলার ‘শিল্পী রশিদ চৌধুরী হোস্টেল’-এর ভোটের ফলাফল ঘোষণা করা হয়। ফলাফলে ভিপি ও এজিএস পদে ছাত্রদল সমর্থিত প্যানেলের প্রার্থী এগিয়ে ছিলেন। জিএস পদে এগিয়ে ছিলেন বামধারার ‘বৈচিত্র্যের ঐক্য’ প্যানেলের প্রার্থী। ১৫৪ শিক্ষার্থীর এ হোস্টেলে ১২৪ জন ভোট দিয়েছেন। নির্বাচন কমিশনের সদস্য সচিব একেএম আরিফুল হক সিদ্দিকী এ তথ্য নিশ্চিত করেন।
ফলাফলে দেখা যায়, হোস্টেলটিতে ছাত্রদল সমর্থিত প্যানেলের ভিপি প্রার্থী সাজ্জাদ হোসেন পেয়েছেন ৩৪ ভোট।
জিএস পদে ‘বৈচিত্র্যের ঐক্য’ প্যানেলের প্রার্থী সুদর্শন চাকমা ২৯ ভোট ও এজিএস পদে ছাত্রদল সমর্থিত আয়ুবুর রহমান ৩৮ ভোট পেয়ে এগিয়ে রয়েছেন।
মাস্টারদা সূর্যসেন হলেও ভিপি পদে এগিয়ে ছিল ছাত্রদল। এ হলে ভিপি পদে ছাত্রদল সমর্থিত সাজ্জাদ হোসেন পেয়েছেন ১৪১ ভোট। তবে ছাত্রশিবিরের জিএস প্রার্থী সাঈদ বিন হাবিব ১৭৫ ভোট পেয়ে এগিয়ে ছিলেন। রাত ১১টা ৭ মিনিটে এ তথ্য নিশ্চিত করে নির্বাচন কমিশন।
এছাড়া অতীশ দীপঙ্কর হলে ভিপি পদে এগিয়ে ছিলেন ছাত্রদল সমর্থিত প্যানেলের প্রার্থী সাজ্জাদ হোসেন। এ পদে তিনি পেয়েছেন ২২৩ ভোট। অন্যদিকে জিএস পদে ছাত্রদল সমর্থিত প্রার্থী শাফায়াত হোসেন পেয়েছেন ১৬৪ ভোট। রাত সোয়া ১২টার দিকে এ ফল ঘোষণা করেন রিটার্নিং কর্মকর্তা মো. এনায়েত উল্যা পাটওয়ারী।










