মেঘনা নদীর ভাঙনে ভিটামাটি হারা চার সন্তানের জননী সালেহা বেগম (৪৫)। আট বছর আগে অসুস্থ স্বামী আমির হোসেন (৫৫) ও সন্তানদের নিয়ে সরকারি  আশ্রয়ন কেন্দ্রে আসনে। স্বামীর চিকিৎসা আবার সংসারের খরচ সব একহাতে সামলান তিনি। কিন্তু করোনার কারণে লক্ষ্মীপুর জেলা লকডাউন হওয়ায় চোখে অন্ধকার দেখছেন। এক বেলা খেয়ে দিন পার করতে হচ্ছে তার।

সালেহা বলেন, গেরামে গেরাম খুঁজি মাইয়া দুগারে খাবাইছি, আঙ্গ হেতেনের ওষুধহত্র কিনছি, অন গেরামের মাইনছে দেয় না, কয়, সরকারই তোগরে দে। কিন্তু আঙ্গরে তো কেউ কিচ্ছু দেয়‘ন, অন আমরা খাইতামই হারি না, করোনাতে আত-বইদ (হাত-মুখ) ধুই কি অইবো? করোনা না মারলেও অভাবে মারি হালাইবো।

শুধু সালেহা বেগমই নন, লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার টুমচর ইউনিয়নের কালিরচর গ্রামের রহমতখালী খালের ওপাড়ে আশ্রয়কেন্দ্রের ৯০টি অসহায় পরিবারের এখন মরণদশা! চার শতাধিক মানুষের বাস এখানে। তাদের কেউ দিনমজুর আবার কেউ ভিক্ষাবৃত্তি করে সংসার চালায়। সেই ২৬ মার্চ সাধারণ ছুটি ঘোষণার পর থেকেই সারা দেশের লক্ষ্মীপুরের ব্যবাস বাণিজ্য ও যানচলাচল। কিন্তু সরকারি বা বেসরকারী কোনো সহায়তাই এখনো এ অবধি এসে পৌঁছায়নি। কেউ আসেনি তাদের মারাত্মক ছোঁয়াচে রোগ কভিট-১৯ সম্পর্কে সচেতন করতে। ফলে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঝুঁকির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ক্ষুধার জ্বালা। 

আজ বুধবার আশ্রয়ন কেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায়, গ্রামের মুখে দোকানপাটে মানুষের সমাগম। গাদাগাদি করে অলস বসে আছে মানুষ। ভেতরে গিয়ে দেখা যায়, স্বাভাবিক কর্মতৎপরতা নেই। সামাজিক দূরত্বেরও বালাই নেই। 

গ্রামের বাসিন্দারা জানান, করোনাভাইরাস সম্পর্কে তাদের কোনো ধারণা নেই। হ্যান্ড স্যানিটাইজার, সাবান, মাস্ক এসব কেন দরকার তারা জানেন না। গ্রামের প্রায় ২০ জন নারী ভিক্ষাবৃত্তি করে পেট চালান। কেউ আর বাড়ির কাছে ভিড়তেই দেয় না। তার ওপর লক্ষ্মীপুর এখন লকডাউন। বাইরে বেরোনোই নিষেধ। ইউনিয়ন পরিষদ থেকে ১২ দিন আগে নামধাম লিখে নিয়ে গেছে। কিন্তু ত্রাণ দেয়ার নাম নেই!

আশ্রয়ন প্রকল্পের বাসিন্দা প্রতিবন্ধী কহিনুর জানান, তার স্বামীও প্রতিবন্ধী ছিলেন। এক বছর আগে বিনাচিকিৎসায় মারা গেছেন। তার সংসার চলে ভিক্ষা করে। করোনাভাইরাসের কারণে বাইরে বের হওয়া বন্ধ। মানবেতর জীবনযাপন করছেন তিনি।

একই অবস্থা রিকশাচালক, দিনমজুরসহ অন্যান্য পেশার মানুষের। বেলাল, আবু তাহের, রাশেদ, সেলিনা আক্তার, বিলকিস ও রূপবানুসহ আরো অনেকে বলেন,  চারদিকে শুনি ত্রাণ দিচ্ছে। এ গ্রামের দিকে কারো চোখ পড়ে না। অথচ এ গ্রামের মানুষেরাই সবচেয়ে অসহায়। তাদের তো না খেয়ে দিন কাটছে। ত্রাণ চাইতে ইউনিয়ন পরিষদে গিয়ে মেম্বর ও চৌকিদারের তাড়া খেতে হয়েছে বলে অভিযোগ করেন এক নারী। 

এতোদিন পরও কেন আশ্রয়ন প্রকল্পের বাসিন্দাদের কাছে ত্রাণ পৌঁছাল না, এ প্রশ্নের জবাবে টুমচর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান সৈয়দ নরুল আমিন লোলা বলেন, এরই মধ্যে ৮০টি পরিবারের মাঝে ত্রাণ বিতরণ করা হয়েছে। বরাদ্দ সীমিত, তাই বিতরণ করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। আশা করি এবার গুচ্ছগ্রামবাসীর মাঝে ত্রাণ পৌঁছানো হবে।

এ ব্যাপারে লক্ষ্মীপুর জেলা প্রশাসক অঞ্জন চন্দ্রপাল বলেন, জেলায় পর্যাপ্ত সরকারি ত্রাণসামগ্রী রয়েছে। ইউনিয়ন পরিষদের জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে অসহায়দের ত্রাণ সহায়তার আওতায় আনা হচ্ছে। খোঁজ খবর নেয়া হচ্ছে। খুব শিগগিরই গুচ্ছগ্রামে ত্রাণ পৌঁছে যাবে বলে আশ্বাস দেন তিনি।