‘আমরার ঈদর আনন্দ বন্যার পানি ভাসাইয়া নিছেগি, ‘ইরকম দিন যেন জীবনে আর কোনো দিন না আয়’- বলছিলেন কোম্পানীগঞ্জে হাইটেক পার্কের আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থানকারী ফরিদা বেগম। গত প্রায় ২৫ দিন ধরে শিশু সন্তানদের নিয়ে আশ্রয়কেন্দ্রে বাস করছেন তিনি।
কেবল ফরিদাই নন, এমন অসংখ্য বানভাসির অবস্থান সিলেটের বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্রে। যাদের নিদারুণ কষ্টে ঈদ কাটছে আশ্রয়কেন্দ্র কিংবা আত্মীয় স্বজনের বাড়িতে।
সরকারি হিসেবে গতকাল শনিবার পর্যন্ত সিলেটে মোট ২৬৯টি আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান করছিলেন ২০ হাজার ১২৫ জন। কয়েক দফা বন্যায় এ বছর ৪ লাখ ৮৪ হাজার ৩৮৩টি পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মোট ক্ষতিগ্রস্ত লোকসংখ্যা ২৯ লাখ ৯৯ হাজার ৪৩৩ জন। মোট ক্ষতিগ্রস্ত ঘরবাড়ি ৪০ হাজার ৯১টি। সরকারি হিসেবে এই পরিসংখ্যান হলেও বাস্তবে এই চিত্র আরো করুণ। আশ্রয়কেন্দ্র ছাড়াও আত্মীয় স্বজনের বাড়িতে অবস্থান করছেন আরো কয়েক হাজার মানুষ।
সিলেটের দক্ষিণ সুরমা, ফেঞ্চুগঞ্জ ও জকিগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় এখনো বন্যার পানি নেমে যায়নি। ডুবে আছে রাস্তাঘাট। চরম দুর্ভোগে রয়েছেন লক্ষাধিক মানুষ। বানের পানি ভেঙে উঁচু স্থানে অবস্থিত মসজিদে গিয়ে ঈদের জামাত পড়তে দেখা যায় অনেককেই।
কোম্পানীগঞ্জের চাতালপাড় গ্রামের বাসিন্দা মঈন উদ্দিন। পাকাঘর ঘর ছিল তাঁর। বানের স্রোতে পাকা দেয়াল ভেঙে পুরো ঘরটি যেন লণ্ডভণ্ড হয়ে গিয়েছে। আশ্রয়কেন্দ্রে ছিলেন, বাড়ি ফিরে উঠেছেন চাচাতো ভাইয়ের ঘরে।
মঈন উদ্দিন বলেন, যাদের ঘরে আছি তারাও ছিলেন আশ্রয়কেন্দ্রে। একসঙ্গে ফিরেছি। গোলাভরা ধান সব নষ্ট হয়ে গেছে। ঘর বানানো দূরের কথা তিনবেলা খেয়ে বেঁচে থাকাই কঠিন হয়ে পড়েছে।
তিনি জানান, সন্তানদের নতুন জামা কাপড় কিনে দিতে পারেননি। খাবার পেলেও রান্না করার ব্যবস্থা নেই। যেখানে নিজের ঘরই নেই, সেখানে আনন্দ কিসের, প্রশ্ন রাখেন তিনি।
দীর্ঘ ২৫ দিন পর ঘর থেকে বন্যার পানি নেমেছে দক্ষিণ সুরমার বোয়াল গাঁওয়ের বিভিন্ন ঘর বাড়ি থেকে। সানজিদা নামের এক বাসিন্দা জানান, সিলেট নগরীতে বাবার বাসায় অবস্থান নিয়েছিলেন। ইচ্ছে ছিলো নিজ বাড়িতে ঈদ করার। কিন্তু বন্যার পানি নামলেও এখনো ঘরে বসবাসের উপযোগী হয়নি। এখনো ঘর গোছানো হয়নি।
গোয়াইনঘাটের দরাকুল গ্রামের বাসিন্দা বশির উদ্দিন জানালেন, বাড়ি ফিরলেও বাড়ি আর আগের মতো নেই। পরিবারের সদস্যদের নিয়ে কোনরকমে প্রাণে বেঁচেছিলেন। আশ্রয় নিয়েছিলেন একটি স্কুলে। এক কাপড়ে বেরিয়ে এসেছিলেন। টিনের ঘরের আসবাবপত্র আর আগের জায়গায় পাননি।
অন্যদিকে ঈদুল আজহা হওয়ায় গরু কোরবানি দিতে ব্যস্ত সিলেটের একাংশের মানুষ। স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের কর্ণধার আবুল হোসেন জানান, রান্না করা খাবার নিয়ে কিছুক্ষণের মধ্যে তারা বানভাসিদের কাছে যাবেন। অনেকেই সকালে হালকা খাবার দিয়েছেন।
সিলেটের জেলা প্রশাসক মো. মজিবর রহমান জানান, আশ্রয়কেন্দ্রগুলোত উন্নত মানের খাবার পরিবেশন করার ব্যবস্থা করা হয়েছে। যাদের ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তাদের আর্থিক সহায়তা করা হচ্ছে ঘর মেরামতের জন্য। পুনর্বাসন প্রক্রিয়া চলছে বলেও জানান তিনি।
প্রসঙ্গত, গত ১৪ জুন থেকে সিলেটে বন্যা দেখা দেয়। ১৬ জুন থেকে সিলেট পয়েন্টে সুরমা নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করে। ফলে তলিয়ে যায় যায় সিলেট নগরীর অধিকাংশ এলাকা। এখনো বিভিন্ন এলাকায় বন্যার পানি পুরোপুরি নামেনি।










