বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা। গতকাল গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে পৃথকভাবে এ সাক্ষাৎকালে নেতারা সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে শোক জানান। একই সঙ্গে এ সময় দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি, জাতীয় নির্বাচন নিয়ে আলোচনা হয় বলে জানান বৈঠকে অংশগ্রহণকারীরা।
গতকাল বেলা ১১টায় গুলশান কার্যালয়ে গিয়ে শোকবইয়ে স্বাক্ষর করেন গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্টের শীর্ষ নেতারা। এরপর তারা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এ সময় উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাবেক সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, বাংলাদেশ জাসদের সভাপতি শরীফ নূরুল আম্বিয়া, সাধারণ সম্পাদক নাজমুল হক প্রধান ও স্থায়ী কমিটির সদস্য মুশতাক হোসেন, সিপিবির সভাপতি কাজী সাজ্জাদ জহির চন্দন ও সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ ক্বাফী রতন, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশিদ ও সহকারী সাধারণ সম্পাদক রাজেকুজ্জামান রতন, বিপ্লবী কমিউনিস্ট লীগের সাধারণ সম্পাদক ইকবাল কবীর ও সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য অধ্যাপক আবদুস সাত্তার, বাসদের (মার্ক্সবাদী) প্রধান সমন্বয়ক মাসুদ রানা, গণতান্ত্রিক বিপ্লবী পার্টির সাধারণ সম্পাদক মোশরেফা মিশু এবং বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক পার্টির নির্বাহী সভাপতি আবদুল আলী। বিএনপির পক্ষে উপস্থিত ছিলেন দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
পরে সন্ধ্যায় এ বৈঠকের আলোচনার বিষয়বস্তু তুলে ধরে বিবৃতি দেয় গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্ট। ওই বিবৃতিতে বলা হয়েছে, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠকে নেতারা সমসাময়িক রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে এবং আসন্ন নির্বাচন যাতে সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য হয় সে বিষয়ে আলোচনা করেন। যুক্তফ্রন্টের নেতারা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, ’২৪-এর গণ-অভ্যুত্থানের পর একটি সুযোগ তৈরি হয়েছে দেশকে মুক্তিযুদ্ধের ধারায় ফিরিয়ে আনার। কিন্তু স্বাধীনতাবিরোধী চক্র দেশে এক উগ্র সাম্প্রদায়িকতার আস্ফালন চালিয়ে আসছে। মুক্তিযুদ্ধকে মুছে ফেলে দেশকে ’৪৭-এ নিয়ে যেতে চায়। বিগত সরকার মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সাইনবোর্ড টাঙিয়ে স্বৈরশাসন কায়েম করেছিল। মুক্তির জনযুদ্ধকে আওয়ামী লীগের দলীয় এবং শেখ হাসিনার পারিবারিক সম্পত্তিতে পরিণত করেছিল। এখন সময় এসেছে মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত চেতনা তথা সমতার বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার।
তারেক রহমানকে উদ্ধৃত করে বিবৃতিতে বলা হয়, ‘মুক্তিযুদ্ধ আমাদের বাংলাদেশের ভিত্তি। ’৭১ বাদ দিলে বাংলাদেশের অস্তিত্বই তো থাকে না। ফলে আমি এবং আমার দল বিএনপি মনে করে, ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ, ’৯০ ও ’২৪-এর গণ-অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করেই আমাদের এগোতে হবে। আমি ২৫ ডিসেম্বর দেশে ফিরেই আমার বক্তব্যে এটা বলেছি। আমি বলেছি, আমার একটা প্ল্যান আছে।’ তিনি তার পরিকল্পনায় কয়েকটি বিষয় তুলে ধরেন এবং যদি জনগণের ম্যান্ডেট পান তাহলে বাংলাদেশকে একটি উদার গণতান্ত্রিক ও কল্যাণ রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করেন।
বিবৃতিতে আরো বলা হয়, সাক্ষাৎ নিয়ে বিএনপি ও যুক্তফ্রন্ট মনে করে, মতাদর্শিক পার্থক্য ও ভিন্নমত রাজনীতিতে থাকবে, তার পরও গঠনমূলক সমালোচনা, মত ও দ্বিমত প্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার বিষয়ে নেতারা একমত পোষণ করেন। সমালোচনাকারীদের বিগত সরকার যেভাবে ট্যাগিং দিয়ে দেশদ্রোহী ও উন্নয়নবিরোধী বলে নির্যাতন করত, ভবিষ্যতে যাতে কেউ সেটা না করতে পারে, সে বিষয়েও উভয় পক্ষের নেতারা একমত পোষণ করেন। মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারীদের ঐক্যবদ্ধভাবে মোকাবেলা এবং ’৭১, ’৯০ ও ’২৪-এর আকাঙ্ক্ষায় বাংলাদেশকে অগ্রসর করে নেয়া এবং দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষায় যার যার অবস্থান থেকে কাজ করার বিষয়ে একমত পোষণ করেন।
উভয় পক্ষের নেতারা আগামী নির্বাচনে যাতে সবার সমান সুযোগ তৈরি হয় এবং সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হয়, তার জন্য পরিবেশ তৈরি করতে সরকার, নির্বাচন কমিশন ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি আহ্বান জানান।
বামপন্থীদের বৃহত্তর ঐক্য প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্টের ঘোষণা দেয়া হয়, যেখানে বাম গণতান্ত্রিক জোটভুক্ত দলের সঙ্গে বাংলাদেশ জাসদ ও কয়েকটি পেশাজীবী সংগঠন রয়েছে।
এছাড়া আওয়ামী লীগ সরকারবিরোধী যুগপৎ আন্দোলনের সঙ্গী পাঁচটি রাজনৈতিক দলের নেতারা তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। দলগুলো হলো নাগরিক ঐক্য, গণসংহতি আন্দোলন, লেবার পার্টি, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম ও এবি পার্টি। দলগুলোর নেতারা গতকাল গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে আলাদাভাবে তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।
নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না, গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি, এবি পার্টির সভাপতি মজিবুর রহমান মনজু, লেবার পার্টির চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান ইরান, জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের সহসভাপতি মাওলানা জুনায়েদ আল হাবীব নিজ নিজ দলের নেতত্ব দেন। বৈঠকের আগে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার স্মরণে শোকবইতেও তারা স্বাক্ষর করেন।
সন্ধ্যায় নাগরিক ঐক্য সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্নাসহ দলটির সিনিয়র নেতারা তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। সাক্ষাৎ শেষে কার্যালয়ের বাইরে এসে মাহমুদুর রহমান মান্না সাংবাদিকদের বলেন, ‘বিএনপির সদ্যপ্রয়াত চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে শুধু শোক জানাতে এসেছিলাম। রাজনৈতিক, নির্বাচন বা অন্য কোনো ইস্যুতে আলোচনা হয়নি। তারেক রহমান বলেছেন, সবাই দেখা করতে আসায় তিনি নিজেকে একা মনে করছেন না। সবার সঙ্গে আছেন বলেই ভাবছেন, দেশ গড়ার কাজে তিনি সবাইকে সঙ্গে চান।’
তিনি বলেন, ‘বাসযোগ্য রাজধানী, চিকিৎসা ব্যবস্থা, কৃষিসহ নানা খাত নিয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তার মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে সবার সহযোগিতা চেয়েছেন।’
দুপুরে তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠক করে গণসংহতি আন্দোলনের নেতারা। দলের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকির নেতৃত্বে বৈঠক আরো উপস্থিত ছিলেন দলটির নির্বাহী সমন্বয়কারী আবুল হাসান রুবেল ও রাজনৈতিক পর্ষদের সদস্য তাসলিমা আখতারসহ কেন্দ্রীয় নেতারা।
বৈঠকে বিএনপির সদ্যপ্রয়াত চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে তারেক রহমানকে সান্ত্বনা দেন দলটির নেতারা। এ সময় দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং আগামী জাতীয় নির্বাচনসহ বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে আলোচনা করা হয়।
বৈঠক শেষে জোনায়েদ সাকি বলেন, ‘শোক জানাতে এসেছিলাম। তারেক রহমানের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা শুনেছি। চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী যেন রাষ্ট্র ব্যবস্থা তৈরি হয়, সে বিষয়ে কথা বলেছি।’
তিনি বলেন, ‘নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার দায়িত্ব সরকারের। এতে রাজনৈতিক দলগুলো সহযোগিতা করবে।’ দেশ পুনর্গঠনের জন্য জাতীয় ঐক্য দরকার বলেও উল্লেখ করেন তিনি।










