জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্য থেকে বেরিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে বাংলাদেশ ইসলামী আন্দোলন। নির্বাচনী সমঝোতার বিষয়ে রাজধানীর পুরানা পল্টনে গতকাল প্রেস ব্রিফিং করে দলটির যুগ্ম মহাসচিব ও মুখপাত্র গাজী আতাউর রহমান এ কথা জানান। সেই সঙ্গে ২৬৮ আসনে নিজেদের প্রার্থীদের এককভাবে নির্বাচনে অংশ নেয়ার প্রস্তুতির কথাও জানান তিনি।

ইসলামী আন্দোলনের মুখপাত্র গাজী আতাউর রহমান বলেন, ‘ওয়ান বক্স পলিসির মাধ্যমে ইসলামপন্থী শক্তি এক করার যে চেষ্টা ছিল, সেটি নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে বলেই নিজেদের মতো নির্বাচনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইসলামী আন্দোলন। ২৭০ আসনে আমাদের মনোনয়নপত্র জমা দেয়া হয়েছিল, দুটি বাতিল হয়েছে। অর্থাৎ ২৬৮ আসনেই ইসলামী আন্দোলন নির্বাচন করবে। তারা কেউ মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করবেন না।’ বাকি ৩২ আসনেও মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের পর অংশ নেয়া যোগ্য প্রার্থীকে নিজেদের সমর্থন দেয়ার ঘোষণাও দিয়েছে দলটি।

সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হবে কিনা সে বিষয়েও শঙ্কা প্রকাশ করছে ইসলামী আন্দোলন। গাজী আতাউর রহমান বলেন, ‘আমরা অত্যন্ত শঙ্কিত যে আগামী দিনে আসলে একটি সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হবে কিনা। আমাদের মধ্যে এ আশঙ্কা প্রবল হয়েছে যে আমাদের সঙ্গে ঐক্য করে পর্দার আড়ালে বা তলে তলে অন্য কোনো পরিকল্পনা করা হচ্ছে কিনা। আজ এ বিষয়গুলো জনগণের সামনে প্রকাশ করা জরুরি বলে আমরা মনে করছি। জনগণ পরিস্থিতি উপলব্ধি করছে। আমাদের কাছেও বিভিন্ন দিক থেকে নানা ধরনের সংবাদ আসছে। বিভিন্ন রাষ্ট্রের সঙ্গে কী ধরনের পরিকল্পনা বা সমন্বয় করা হচ্ছে, তা আমাদের কাছে এখনো অস্পষ্ট।’

তিনি আরো বলেন, ‘নির্বাচনের আগে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে দেখা করে জামায়াতের আমির জাতীয় সরকার গঠনের যে প্রস্তাব দিয়েছেন, এর মাধ্যমে সুষ্ঠু নির্বাচন হওয়া নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। নির্বাচনের আগে প্রতিদ্বন্দ্বী দলের সঙ্গেই সমঝোতা করে এসেছেন, এক্ষেত্রে একটি পাতানো নির্বাচন হবে কিনা সে শঙ্কাও তৈরি হয়ে গেছে।’

ইসলামী দলগুলোর ভোট এক বাক্সে আনতে ‘ওয়ান বক্স পলিসি’ স্লোগান নিয়ে নয় মাস আগে নির্বাচনে আসন সমঝোতার মোর্চা গঠন করেছিল জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলন, খেলাফত মজলিসসহ আটটি ইসলামী দল। এমনকি নির্বাচনের আগে জুলাই সনদ ও সংস্কার বাস্তবায়নের দাবিতেও আন্দোলনের মাঠে ছিল এ মোর্চা। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা হলে আন্দোলন থেকে সরে এসে তারা তৎপর হয় আসন সমঝোতায়। পরে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি), আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি) নির্বাচনী এ জোটে যোগ দেয়।

জানা যায়, শুরুতে ৮০টি আসনে সমঝোতার ভিত্তিতে নির্বাচন করতে চেয়েছিল ইসলামী আন্দোলন। তবে নানা ফোরামে এ বিষয়ে কয়েক দফা আলোচনা হলেও সমঝোতায় পৌঁছা সম্ভব হয়নি। ইসলামী আন্দোলনের সঙ্গে মধ্যস্থতার জন্য দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হককে। জোটের পক্ষ থেকে ৪৫টি আসন দেয়ার প্রস্তাব এলেও সেটি কার্যকর হয়নি।

এর মধ্যে ইসলামী আন্দোলনকে ছাড়াই গত বৃহস্পতিবার ২৫৩ আসনে প্রার্থী সমঝোতা করে জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোট। এর মধ্যে জামায়াত ১৭৯ আসনে ও এনসিপি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে ৩০টি আসনে। মাওলানা মামুনুল হকের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ২০টি, খেলাফত মজলিস ১০টি, এলডিপি সাতটি, এবি পার্টি তিনটি, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টি (বিডিপি) দুটি ও বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি দুটি আসনে জোটের হয়ে লড়বে। জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি (জাগপা) ও বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন সমঝোতায় থাকলেও তাদের আসন এখনো চূড়ান্ত হয়নি।

আসন বণ্টনের বিষয়ে সমঝোতা না হওয়ায় আগেই এ জোট থেকে বেরিয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছিল ইসলামী আন্দোলন। গতকালের সংবাদ সম্মেলনে দলটির মুখপাত্র গাজী আতাউর রহমান অভিযোগ করেন, রাজনৈতিক স্বার্থে জামায়াতে ইসলামী তাদের মৌলিক স্লোগান থেকে সরে ক্ষমতাকেই একমাত্র মুখ্য মনে করছে।

গাজী আতাউর রহমান বলেন, ‘আমাদের ভোট নিয়ে যারা সংসদে যাবেন, তাদের পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ থাকতে হবে। কিন্তু যেখানে আমাদের পারস্পরিক শ্রদ্ধা নেই, আস্থা নেই, সেখানে থাকা যায় না। এছাড়া জামায়াত আমির বলেছেন, জিতলে বিএনপির সঙ্গে জাতীয় সরকার গঠন করবেন। আগামীতে জাতীয় সরকার হবে কিনা...ঐক্যের পাটাতনে দাঁড়িয়ে দেশ চালানোর ঘোষণা জামায়াত এককভাবে দিয়েছে। এটা তো মানা যাবে না।’

নিজেদের লক্ষ্যের কথা উল্লেখ করে ইসলামী আন্দোলনের মুখপাত্র বলেন, ‘প্রচলিত আইন শান্তি প্রতিষ্ঠায় ব্যর্থ হয়েছে, বৈষম্য তৈরি করেছে। এ আইন পরিবর্তন করে ইসলামের আইন প্রতিষ্ঠা করাই আমাদের মূল লক্ষ্য।’