ভারী বৃষ্টি ও উজানের পাহাড়ি ঢলে সিলেটে আবারো বন্যা দেখা দিয়েছে। সীমন্তাবর্তী বিভিন্ন উপজেলাসহ নগরীর নিচু এলাকা প্লাবিত হয়ে পড়েছে। এতে আবারো পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন গোয়াইনঘাট, কোম্পানীগঞ্জ, জৈন্তাপুর , কানাইঘাট ও সিলেট সদরের শতাধিক গ্রামের মানুষ। অন্যদিকে টানা বর্ষণের কারনে বিভিন্ন স্থানে পাহাড় টিলা ধসের ঘটনা ঘটেছে।

জরুরি ভিত্তিতে সিলেটের ১৩ উপজেলায় ৪৪ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দিয়েছে জেলা প্রশাসন। বিভিন্ন প্রাথমিক বিদ্যালয়কে বন্যা আশ্রয় কেন্দ্র হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।
দ্রুত পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় বানভাসি মানুষের মধ্যে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। সুরমার পানি উঠে গেছে নগরীর প্রধানতম পাইকারি বাজার কালিঘাটে। এরই মধ্যে সিলেট শহরের সঙ্গে অনেক এলাকার সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে।

সিলেটে পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, আজ বুধবার সকাল ৯টায় সুরমা নদী কানাইঘাট পয়েন্টে দশমিক ৫৮ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। একই সময়ে কুশিয়ারা নদী ফেঞ্চুগঞ্জ পয়েন্টে দশমিক ১১ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এছাড়া সারিঘাটে সারি নদী বিপৎসীমার দশমিক ২০ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। বুধবার বিকাল পর্যন্ত পানি বৃদ্ধি অব্যাহত ছিল।

বন্যায় পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন প্রায় তিন লাখ মানুষ। গত কয়েক দিনের মতো বুধবার ভোর থেকেও অবিরাম বৃষ্টির ফলে পানি ক্রমশ বাড়ছে। এরই মধ্যে কোম্পানীগঞ্জ ও গোয়াইনঘাট উপজেলার তিন শতাধিক গ্রাম, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও রাস্তাঘাট প্লাবিত হয়েছে।

এদিকে, সুরমা ও কুশিয়ারা নদীর দুটি পয়েন্টে পানি বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। সুরমা নদীর তীরবর্তী নগরীর বিভিন্ন এলাকার বাসাবাড়ি ও দোকানপাটে এরই মধ্যে পানি প্রবেশ করেছে। নগরীর পাইকারি বাজার হিসেবে পরিচিত কালিঘাট ও মহাজনপট্টিতে নদী তীরবর্তী ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে পানি ঢুকেছে। নগরীর তালতলা এলাকার ফায়ার স্টেশনে পানি ঢুকে গেছে। ফায়ার কর্মীরা নগরী রিকাবীবাজারস্থ সিলেট অডিটোরিয়ামে আশ্রয় নিয়েছেন।

এর আগে গত ১৫ মে থেকে ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে জেলার কয়েক লাখ মানুষ পানিবন্দি ছিলেন। সেই সময়ে নগরীতেও বিপুল সংখ্যক মানুষ বন্যা কবলিত হয়ে চরম দুর্ভোগে পড়েছিলেন। সেই দুর্ভোগের রেশ কাটতে না কাটতে নতুন করে বন্যার কবলে পড়েছে মানুষ।

গোয়াইনঘাট উপজেলা সদরের সঙ্গে সবকটি ইউনিয়নের সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। নিম্নাঞ্চলের ৯০ শতাংশ মানুষ পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছেন। এই উপজেলার সদর, পূর্ব ও পশ্চিম জাফলং, মধ্য জাফলং, পূর্ব ও পশ্চিম আলীর গাঁও, রুস্তমপুর, তোয়াকুল, লেংগুড়াসহ বিভিন্ন ইউনিয়নের মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন।

ডৌবাড়ি ইউপি চেয়ারম্যান মো. নিজাম উদ্দিন জানান, দ্রুততম সময়ে পানি বেড়েছে এবং এখনো পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। পানি আরো বাড়লে গত বন্যার চেয়ে ভয়ারবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে।

গোয়াইনঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) তাহমিলুর রহমান জানান, এক মাসের মধ্যে দ্বিতীয় দফা বন্যায় বিপুল সংখ্যক মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। তার উপজেলায় ৪২টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে বলে জানান তিনি। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে পানিবন্দি মানুষকে আশ্রয় কেন্দ্রে আনার কার্যক্রম হাতে নেওয়া হয়েছে।

এদিকে কানাইঘাট উপজেলার লক্ষীপ্রসাদ পূর্ব ও পশ্চিম, চতুল, সদর ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। মঙ্গলবার রাত থেকে কানাইঘাট পৌর শহরের পূর্ব বাজারে পানি প্রবেশ করায় অনেক দোকানপাট তলিয়ে গেছে। সীমান্তবর্তী আরেক উপজেলা জকিগঞ্জের নিম্নাঞ্চলের গ্রামগুলোতে শত শত মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। জৈন্তাপুরেও পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে।

অপরদিকে সিলেট সদর উপজেলার জালালাবাদ, হাটখোলা, কান্দিগাঁও ইউনিয়ন ও খাদিমনগরের আংশিক এলাকা প্লাবিত হয়েছে।

সিলেট সদর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আলহাজ্ব আশফাক আহমদ জানান, তিনি এলাকাগুলো পরিদর্শন করেছেন। কাল থেকে ত্রাণ তৎপরতা শুরু হবে।

কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে টানা কয়েক দিনের বৃষ্টিপাত ও উজান থেকে নেমে আসা ঢলে। গ্রামীণ অনেক রাস্তা পানিতে তলিয়ে গেছে। গবাদিপশু নিয়ে দুর্ভোগে পড়েছেন মানুষ।

কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা লুসিকান্ত হাজং বলেন, কোম্পানীগঞ্জে বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় উপজেলা প্রশাসন প্রস্তুত রয়েছে। আশ্রয় কেন্দ্রগুলো প্রস্তুত রাখা হয়েছে বলেও জানান তিনি।

সিলেটের জেলা প্রশাসক মো. মজিবর রহমান জানান, একমাসের মাথায় ফের বন্যায় আক্রান্ত সিলেট। তিনি বানভাসিদের আতঙ্কিত না হওয়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ইতোমধ্যে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ৪৪ টন চাল বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। বন্যা মোকাবিলার সব ধরনের প্রস্তুতি রয়েছে। পাহাড় টিলার নিচে বসবাসকারীদের নিরাপদে চলে যাওয়ার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে বলে তিনি জানান।