কার্পজাতীয় মাছ চাষ করে লোকসানে পড়েছেন সাতক্ষীরার মৎস্য খামারিরা। উৎপাদন খরচের তুলনায় কেজিতে গড়ে ৪০ টাকা পর্যন্ত লোকসান দিয়ে বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন তারা। ব্যবসায়ীরা বলছেন, বাজারে চাহিদার তুলনায় কার্পজাতীয় মাছের জোগান অনেক বেশি। তাই কম দামে বিক্রি করতে হচ্ছে। তাছাড়া সংরক্ষণের ব্যবস্থা না থাকায় লোকসান আরো বাড়ছে।
সাতক্ষীরা জেলা মৎস্য অফিস সূত্রে জানা গেছে, জেলায় দু-আড়াই লাখ খামারি মাছ চাষ করেন। এ খাতে জড়িত চার-পাঁচ লাখ মানুষ। চলতি মৌসুমে জেলার সাত উপজেলায় ৬০ হাজার নিবন্ধিত ঘেরে কার্পজাতীয় মাছ চাষ হয়েছে। এসব ঘের থেকে ১ লাখ ৩৫ হাজার থেকে ১ লাখ ৪০ হাজার টন মাছ উৎপাদন হবে, যা গত দু-তিন বছরের ব্যবধানে সর্বোচ্চ উৎপাদন বলে দাবি মৎস্য বিভাগের। জেলায় ২০১৮-১৯ মৌসুমে ৯০ হাজার ও ২০১৯-২০ মৌসুমে ৯৫ হাজার টন কার্পজাতীয় মাছ উৎপাদন হয়।
সাতক্ষীরা জেলা সদরে সবচেয়ে বৃহৎ মাছের আড়ত সুলতানপুর বড় বাজার। এখানে প্রতিদিন হাজার টন মাছ কেনাবেচা হয়।
বাজারের অন্যতম মাছের আড়ত মেসার্স আল-আমীন ফিশের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবুল বাসার জানান, চাহিদার তুলনায় সরবরাহ বেশি থাকায় মাছের ন্যায্য দাম পাচ্ছেন না চাষীরা। জেলায় প্রায় একই সময়ে অধিকাংশ ঘের শুকিয়ে যায়। এসব ঘেরে কোনো কোনো চাষী ধান রোপণ করেন আবার কেউ নতুন করে মাছ ছাড়ার প্রস্তুতি নেন। ফলে কে আগে মাছ ঘেরে ছাড়তে পারবে—এ নিয়ে প্রতিযোগিতা চলে। আর এ সুযোগটি নেন ব্যবসায়ীরা। তাছাড়া করোনার প্রভাবও রয়েছে মাছ বাজারে।
তিনি বলেন, বর্তমানে দেড়-দুই কেজি ওজনের রুই মাছ প্রতি কেজি বিক্রি হচ্ছে ১৬০-১৬৫ টাকায়। একই দাম কাতল মাছের। তাছাড়া সিলভার কার্প, গ্রাস কার্প, ব্ল্যাক কার্পসহ অন্যান্য মাছের দাম আরো কম।
সাতক্ষীরা উপজেলার এল্লাচর এলাকায় মাছচাষী হোসেন শেখ রফিকুল ইসলাম রানা। চলতি মৌসুমে ৬০ বিঘা পরিমাণ ঘেরে রুই, মৃগেল, কাতলা, সিলভার ও গ্রাস কার্প মাছ চাষ করেছেন। তবে অন্য যেকোনো বছরের তুলনায় চলতি মৌসুমে মাছের উৎপাদন ভালো হয়েছে বলে দাবি তার। কিন্তু বাজারে দাম না থাকায় লোকসান গুনতে হচ্ছে তাকে।
তিনি জানান, দেড়-দুই কেজি ওজনের যে রুই গত বছরের এ সময় প্রতি কেজি ২৬০-২৮০ টাকা দরে বিক্রি হয়েছে, তা বর্তমান বাজারে দর পাচ্ছেন ১৫৫-১৬০ টাকা। একই ভাবে দুই কেজি ওজনের কাতলা মাছের দামও প্রতি কেজি ১৫০-১৫৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অথচ দুই কেজি ওজনের একটি মাছ উৎপাদনের জন্য অন্তত দেড় বছর সময় লাগে। এ সময় মাছের খাদ্য সরবরাহ, শ্রমিকের বেতন নিজের পরিশ্রম সব মিলিয়ে একটি মাছের উৎপাদন খরচ ১৮০-১৯০ টাকায় গিয়ে দাঁড়ায়। অথচ এখন সেই মাছ প্রতি কেজি সর্বোচ্চ ১৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
তিনি জানান, চার-পাঁচ কেজি ওজনের গ্রাস কার্প, ব্ল্যাক কার্প ও সিলভার কার্প মাছের দাম আরো মন্দা। পাঁচ কেজি ওজনের গ্রাস কার্প ও ব্ল্যাক কার্প বাজারে বিক্রি হচ্ছে ১৪৫-১৫০ টাকা দরে। অথচ গত বছর এই সময় পাঁচ কেজি ওজনের গ্রাস কার্প ও ব্ল্যাক কার্প বাজারে বিক্রি হয়েছে ২২০-২৩০ টাকায়। চলতি মৌসুমে ৬০ বিঘা ঘেরের কার্পজাতীয় মাছ উৎপাদনে ৮-১০ লাখ টাকা লোকসান হবে।
সাতক্ষীরার দেবহাটা উপজেলার শ্যামনগর এলাকার মাছচাষী নিবাস চন্দ্র মণ্ডল বলেন, আমি ৩০ বছর ধরে মাছ চাষ করি। এ দীর্ঘ সময়ে কার্পজাতীয় মাছের বাজারে এমন মন্দা দেখিনি।
তিনি বলেন, চলতি মৌসুমে ৭০ বিঘা চিংড়িঘেরের সঙ্গে কার্পজাতীয় মাছ চাষ করেছিলাম। গত বছর এমন সময় যে রুই প্রতি কেজি বিক্রি করেছি ২২০ টাকা দরে, তা বর্তমানে বাজারে বিক্রি হচ্ছে ১৩০ টাকায়। ১৬০ টাকা কেজি দরের গ্রাস কার্প বিক্রি করেছি ১০০ টাকা দরে।
সাতক্ষীরা জেলা মৎস্য অফিসার মো. মশিউর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, শুধু কার্পজাতীয় নয়, সব ধরনের মাছ উৎপাদনের জন্য খুবই উপযোগী সাতক্ষীরা জেলা। অন্য যেকোনো বছরের তুলনায় চলতি মৌসুমে কার্পজাতীয় মাছের উৎপাদন খুবই ভালো। তবে বাজারে কার্পজাতীয় মাছের ভালো দাম না থাকায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন চাষীরা।










