আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩০০ সংসদীয় আসনে ১ হাজার ৮৪২ জনের প্রার্থিতা বৈধ ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। তাদের মধ্যে পুরুষ প্রার্থী ১ হাজার ৭৭৭ জন ও নারী প্রার্থী ৬৫ জন। সে হিসাবে মাত্র ৩ দশমিক ৫৩ শতাংশ নারী প্রার্থী এবার নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। ইসির সিদ্ধান্তের বিপরীতে আপিল করে জয়ী হলে বা মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করলে এ সংখ্যা পরিবর্তন হতে পারে।

ইসির সরবরাহকৃত তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, বিএনপি থেকে নয়জন, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) থেকে তিন, জাতীয় পার্টি থেকে পাঁচ, গণঅধিকার পরিষদ থেকে দুই, গণসংহতি আন্দোলন থেকে চার, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ) থেকে তিন, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ মার্ক্সবাদী) থেকে আট, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল জেএসডি থেকে ছয়, ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশ থেকে ছয় ও গণফোরাম থেকে দুইজন নারী প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বৈধতা ঘোষণা করা হয়।

তাছাড়া বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি), নাগরিক ঐক্য, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, বাংলাদেশ রিপাবলিকান পার্টি (বিআরপি), জাতীয় পার্টি-জেপি, আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি), আম জনতার দল, ইসলামী ফ্রন্ট বাংলাদেশ, বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টি (বিএসপি) এবং বাংলাদেশ মুসলিম লীগ থেকে একজন করে নারী প্রার্থী রয়েছেন। এছাড়া সারা দেশে বিভিন্ন দলের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত আরো সাতজন স্বতন্ত্র নারী প্রার্থী বৈধতা পেয়েছেন।

এত কম সংখ্যক নারী প্রার্থী থাকাকে হতাশাজনক উল্লেখ করে সাবেক নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশনের প্রধান শিরিন পারভীন হক বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এবারের নির্বাচনে নারী প্রার্থী মাত্র ৬৫ জন হওয়া হতাশাজনক হলেও বিস্ময়কর নয়। দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি এখনো পুরুষ আধিপত্যশীল এবং জুলাই অভ্যুত্থানের পরও রাজনৈতিক দলগুলোর মানসিকতায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসেনি। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রের অভাব ও নারীবান্ধব নীতির ঘাটতির কারণেই নারী প্রার্থীর সংখ্যা কম।’

তিনি আরো বলেন, ‘জুলাই সনদ প্রণয়নের সময় নারীদের অংশগ্রহণ ছিল না। এমনকি নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশনসহ দ্বিতীয় ধাপে গঠিত সংস্কার কমিশনগুলোকে আলোচনায় ডাকা হয়নি। এ বিষয়ে লিখিতভাবে অনুরোধ জানানো হলেও সাড়া পাওয়া যায়নি। নারীদের অর্থবহ প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে প্রতিটি নির্বাচনী এলাকায় একটি সাধারণ আসনের পাশাপাশি নারীদের জন্য সরাসরি ভোটে নির্বাচিত সংরক্ষিত আসনের প্রস্তাব দেয়া হয়েছিল। সেটি তো আলোর মুখ দেখেইনি, এমনকি আলোচিতও হয়নি।’

নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, আসন্ন নির্বাচনের ভোটার সংখ্যা ১২ কোটি ৭৭ লাখ ১১ হাজার ৭৯৩। এর মধ্যে পুরুষ ও নারী ভোটারের সংখ্যা যথাক্রমে ৬ কোটি ৪৮ লাখ ২৫ হাজার ৩৬১ ও ৬ কোটি ২৮ লাখ ৮৫ হাজার ২০০। এছাড়া তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার আছেন ১ হাজার ২৩২ জন।

৩০০ আসনে মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষিত নারী প্রার্থীদের মধ্যে আছেন বিএনপি থেকে নাটোর-১ আসনে ফারজানা শারমীন, ঝালকাঠি-২ আসনে ইসরাত সুলতানা ইলেন ভুট্টো, শেরপুর-১ আসনে সানসিলা জেবরিন, মানিকগঞ্জ-৩ আসনে আফরোজা খানম, ঢাকা-১৪ আসনে সানজিদা ইসলাম, ফরিদপুর-২ আসনে শামা ওবায়েদ ইসলাম, ফরিদপুর-৩ আসনে নায়াব ইউসুফ আহমেদ, মাদারীপুর-১ আসনে নাদিরা আক্তার, সিলেট-২ আসনে মোছা. তাহসিনা রুশদীর।

জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) থেকে আছেন ঝালকাঠি-১ আসনে মাহমুদা আলম মিতু, ঢাকা-১৯ আসনে দিলশানা পারুল, ঢাকা-২০ আসনে নাবিলা তাসনিদ।

জাতীয় পার্টি থেকে প্রার্থী করা হয়েছে ঠাকুরগাঁও-২ আসনে নুরুন নাহার বেগম, ঝিনাইদহ-১ আসনে মনিকা আলম, ঢাকা-১০ আসনে বহ্নি বেপারী, নরসিংদী-৫ আসনে মেহেরুন নেছা খান হেনা, খাগড়াছড়ি আসনে মিথিলা রোয়াজাকে।

গণঅধিকার পরিষদ থেকে আছেন সিরাজগঞ্জ-১ আসনে মোছা. মল্লিকা খাতুন, ঢাকা-৮ আসনে মেঘনা আলম, নরসিংদী-১ আসনে শিরিন আক্তার।

গণসংহতি আন্দোলন থেকে নাটোর-২ আসনে তাহামিদা ইসলাম তানিয়া, ঢাকা-১২ আসনে তাসলিমা আখতার, ঢাকা-১৮ আসনে বিলকিস নাসিমা রহমান, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৫ আসনে নাহিদা জাহানকে প্রার্থী করা হয়েছে।

বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) থেকে নেত্রকোনা-৪ আসনে আছেন জলি তালুকদার।

বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) নারী প্রার্থীরা হলেন মাগুরা-১ আসনে শম্পা বসু, বরিশাল-৫ আসনে মনীষা চক্রবর্তী।

বাসদ-মার্ক্সবাদী থেকে গাইবান্ধা-৫ আসনে মোছা. রাহেলা খাতুন, রংপুর-৪ আসনে প্রগতি বর্মণ তমা, জয়পুরহাট-১ আসনে তৌফিকা দেওয়ান, ঢাকা-৫ আসনে শাহিনুর আক্তার সুমি, ঢাকা-৭ আসনে সীমা দত্ত, গাজীপুর-১ আসনে তাসলিমা আক্তার, মৌলভীবাজার-২ আসনে সাদিয়া নোশিন তাসনিম চৌধুরী, চট্টগ্রাম-১০ আসনে আসমা আক্তার, চট্টগ্রাম-১১ আসনে দীপা মজুমদারকে প্রার্থী করা হয়েছে।

জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল জেএসডির নারী প্রার্থীরা হলেন সিরাজগঞ্জ-৬ আসনে ইলোরা খাতুন, ঢাকা-৭ আসনে শাহানা সেলিম, ফরিদপুর-৩ আসনে আরিফা আক্তার বেবী, কুমিল্লা-৫ আসনে শিরিন আক্তার, নোয়াখালী-১ আসনে রেহানা বেগম, লক্ষ্মীপুর-৪ আসনে তানিয়া রব।

ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশ থেকে মুন্সিগঞ্জ-১ আসনে রোকেয়া আক্তার, ঢাকা-১২ আসনে মোছা. সালমা আক্তার, ঢাকা-১৩ আসনে ফাতেমা আক্তার মুনিয়া, গাজীপুর-২ আসনে সরকার তাসলিমা আফরোজ, নরসিংদী-৫ আসনে তাহমিনা আক্তার, চট্টগ্রাম-১০ আসনে সাবিনা খাতুনকে প্রার্থী করা হয়েছে।

গণফোরামের নারী প্রার্থীরা হলেন ঝিনাইদহ-৪ আসনে খনিয়া খানম ও ঢাকা-৯ আসনে নাজমা আক্তার।

এছাড়া নাগরিক ঐক্য থেকে পাবনা-৪ আসনে শাহনাজ হক, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি থেকে রাঙ্গামাটি আসনে জুঁই চাকমা, বাংলাদেশ রিপাবলিকান পার্টি (বিআরপি) থেকে কুষ্টিয়া-৩ আসনে মোছা. রুমপা খাতুন, জাতীয় পার্টি-জেপি থেকে ঝিনাইদহ-১ আসনে মনিকা আলম, আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টি থেকে ঢাকা-১০ আসনে নাসরীন সুলতানা, আম জনতার দল থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনে শরিফা আক্তার, ইসলামী ফ্রন্ট বাংলাদেশ থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৩ আসনে আয়েশা আক্তার, বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টি (বিএসপি) থেকে কুড়িগ্রাম-৪ আসনে মোছা. শেফালী বেগম এবং বাংলাদেশ মুসলিম লীগ থেকে দিনাজপুর-৩ আসনে লায়লা তুল রীমাকে প্রার্থী করা হয়েছে।

এছাড়া স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন রংপুর-৩ আসনে মোছা. আনোয়ারা ইসলাম রানী, নাটোর-২ আসনে সাবিনা ইয়াসমিন, জামালপুর-৪ আসনে মেহেরজান আরা তালুকদার, ময়মনসিংহ-৬ আসনে আখতার সুলতানা, নেত্রকোনা-৪ আসনে তাহমিনা জামান, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনে রুমিন ফারহানা ও নোয়াখালী-৫ আসনে হাসনা জসীম উদ্দীন মওদুদ।

নারী প্রার্থী কম থাকার বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক আসিফ শাহান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘গণ-অভ্যুত্থান-উত্তর সময়ে রাজনৈতিক প্রক্রিয়াটি যেভাবে চলছে তাতে এর চেয়ে অন্য কিছু তো আমরা আশা করতে পারি না। সাড়ে ৩ শতাংশ নারী প্রার্থীর কথা বলা হচ্ছে, কিন্তু এর মাঝখানে তো একটা রাজনৈতিক জোট আছে, যে জোটের নগণ্য সংখ্যক প্রার্থী নারী। বিএনপিও খুব সম্ভবত ৫ শতাংশ নারী আসনের কোটাটি পূরণ করেনি। সুতরাং জুলাই সনদে নারী আসন নিয়ে ন্যূনতম যে ঐকমত্য হয়েছিল সেটিও তারা এ নির্বাচনে দেয়নি। এর অর্থ রাজনৈতিক দলগুলোর খুব সুস্পষ্টভাবেই এক্ষেত্রে কমিটমেন্ট নেই। বরং আমার ধারণা, সম্ভবত সবচেয়ে কম নারী প্রার্থী এবার দেয়া হচ্ছে।’

নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের প্রধানের দায়িত্ব পালন করেছেন সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার। তার ভাষ্যমতে, ‘এটি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। কোনো কোনো রাজনৈতিক দল নারী প্রার্থী দেয়নি বলেও শুনেছি। যদিও প্রতিটি দল থেকে সাধারণ আসনে প্রতিযোগিতার জন্য ৫ শতাংশ নারী প্রার্থী দেয়ার ব্যাপারে দলগুলো একমত হয়েছিল। এটি নিশ্চিত না করে তারা রাজনৈতিক অঙ্গীকার রক্ষা করতে পারেনি। এতে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি আস্থার সংকট তৈরি হবে।’

গত রোববার মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাইয়ের শেষ দিনে ৭২৩ প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল করে ইসি। গত ২৯ ডিসেম্বর প্রার্থীরা মনোনয়নপত্র জমা দেয়ার পরদিন যাচাই-বাছাই শুরু করেন রিটার্নিং অফিসাররা। ৩০০ আসনে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিলেন ২ হাজার ৫৬৮ জন।

এদিকে তফসিল অনুযায়ী যাচাই-বাছাইয়ে মনোনয়নপত্র বাতিল হওয়া প্রার্থীরা গতকাল থেকে আপিল আবেদন শুরু করেছেন। এটি চলবে ৯ জানুয়ারি পর্যন্ত। আপিল নিষ্পত্তি হবে ১০-১৮ জানুয়ারি পর্যন্ত। প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ তারিখ ২০ জানুয়ারি। রিটার্নিং কর্মকর্তা চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করে প্রতীক বরাদ্দ করবেন ২১ জানুয়ারি। নির্বাচনী প্রচারণা শুরু হবে ২২ জানুয়ারি। প্রচার চালানো যাবে ১০ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে ৭টা পর্যন্ত। আর ভোটগ্রহণ হবে ১২ ফেব্রুয়ারি।