উত্তরবঙ্গের বৃহৎ ও গুরুত্বপূর্ণ নৌবন্দর বাঘাবাড়ী। এ বন্দরে যুক্ত রয়েছেন প্রায় ১ হাজার ২০০ শ্রমিক। জাহাজ থেকে পণ্য খালাসে বন্দর এলাকা সরগরম থাকার কথা। কিন্তু বাস্তব চিত্র উল্টো। শতাধিক শ্রমিক বাঁশের চাটাই দিয়ে তৈরি সিঁড়িপথ দিয়ে ছোট নৌযান থেকে সামান্য সিমেন্ট ও সার খালাস করে ট্রাকে তুলছেন। বন্দরের চারদিকের অবস্থা নোংরা ও জরাজীর্ণ। মৃতপ্রায় নদী, নেই কোলাহল। যেন জীবনী শক্তি হারিয়ে কোনো রকমে চলছে বন্দরের কার্যক্রম।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বন্দরটি স্থাপনের পর থেকে লাগেনি উন্নয়নের ছোঁয়া। এখনো প্রতিষ্ঠাকালীন অবকাঠামো দিয়ে চলছে দৈনিক কার্যক্রম। প্রতি বছরই শুষ্ক মৌসুমে নাব্য সংকটে পড়ছে নৌ চ্যানেল। এতে পণ্যবাহী জাহাজ বন্দরে ভিড়তে পারছে না। দূরে বড় জাহাজ থেকে ছোট ছোট নৌযানে পণ্য ঘাটে আনতে হচ্ছে। এতে সময় ও অর্থ ব্যয় হচ্ছে। ক্ষতির মুখে পড়ছেন শ্রমিক, আমদানিকারক ও ইজারাদার।

সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর উপজেলায় বাঘাবাড়ীতে বড়াল নদীর তীরে দ্বিতীয় শ্রেণীর বাঘাবাড়ী নৌবন্দর ১৯৮১ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। আনুষ্ঠানিকভাবে বন্দর চালু হয় ১৯৮৩ সালে। বন্দরের আয়তন প্রায় সাড়ে পাঁচ কিলোমিটার। সেই সময় খাদ্যপণ্য ও অন্যান্য পণ্য ওঠা-নামার জন্য তিনটি জেটি নির্মাণ করা হয়। এছাড়া বাফার তিন হাজার মেট্রিক টন ও বিসিআইসির পাঁচ হাজার টন ধারণক্ষমতার দুটি সার গুদাম নির্মাণ করা হয় এখানে। বর্তমানে তিনটি জেটিই এখন ব্যবহারের অনুপযোগী। জেটি থেকে নামার সিঁড়িগুলো ভেঙে গেছে। জেটি থেকে নামার জন্য বাঁশের চাটাইয়ের তৈরি সিঁড়ি ব্যবহার করা হচ্ছে। একটু বৃষ্টি হলেই বন্দর এলাকাজুড়ে কাদা পানিতে ভরে থাকে। ফলে এ সময় হেঁটেও চলাচল করা কঠিন হয়ে পড়ে। বন্দর এলাকা ময়লা-আবর্জনায় ভরপুর। প্রয়োজনীয় গোডাউন না থাকায় শত শত টন সার খোলা আকাশের নিচে পলিথিন দিয়ে ঢেকে রাখা হয়েছে। উন্মুক্তভাবে রাখা হয়েছে কয়েক হাজার টন কয়লা। এখানে নির্মিত অফিস ঘর গোডাউনসহ প্রয়োজনীয় অবকাঠামো বন্দর শুরুর দিকে নির্মিত। এরপর এ বন্দরে আর কোনো নতুন জেটি বা সার গুদাম নির্মাণ বা সংস্কার করা হয়নি।

অথচ এ বন্দর ব্যবহার করে ইরি-বোরো মৌসুমে দেশের অভ্যন্তর ও বিদেশ থেকে আমদানি করা ইউরিয়াসহ অন্যান্য সার উত্তরাঞ্চলের ১৬ জেলার ২৬টি বাফার গুদামে পাঠানো হয়। এছাড়া উত্তরাঞ্চলের ১৬টি জেলার জ্বালানি তেল, কয়লা, গমসহ অন্যান্য পণ্য সরবরাহের প্রধান মাধ্যমও এ নদীবন্দর। বন্দরটি ইজারা প্রদান বাবদ প্রতি বছর প্রায় দেড় কোটি টাকা রাজস্ব পায় সরকার। শুষ্ক মৌসুমে নাব্য সংকটের কারণে ঘাটে ভিড়তে পারে না জাহাজ। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন ব্যবসায়ীরা।

বাংলাদেশ লঞ্চ শ্রমিক অ্যাসোসিয়েশন বাঘাবাড়ী ঘাট শাখার সাধারণ সম্পাদক মো. আসাদুর রহমান বলেন, পুরনো জরাজীর্ণ ঘাট ব্যবস্থায় চলছে বন্দরটি। প্রতি বছরই এ বন্দরে নাব্য সংকট দেখা দেয়। দীর্ঘদিনেও এর সংস্কার বা উন্নয়নে কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না কর্তৃপক্ষ। উপায় না থাকায় শ্রমিকরা কষ্ট করে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন।

শ্রমিক সরদার নজরুল ইসলাম বলেন, বাঘাবাড়ী নৌবন্দর জাহাজশূন্য হয়ে পড়ায় এক সপ্তাহ ধরে আমাদের হাতে কাজ নেই। ফলে আমরা পরিবার-পরিজন নিয়ে চরম মানবেতর জীবন-যাপন করছি। বাঘাবাড়ী নৌবন্দর ইজারাদার আব্দুস সালাম ব্যাপারী বলেন, নাব্য সংকট, পুরনো জেটি এবং জরাজীর্ণ অবস্থার মধ্য দিয়েই দীর্ঘদিন ধরে চলছে এ বন্দর। বড় অংকের টাকা দিয়ে ইজারা নিতে হয়। সরকারের আয়ের বড় উৎস এ বন্দর। অথচ বন্দরটির সংস্কার ও উন্নয়নে সরকার ও কর্তৃপক্ষ কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করছে না।

বাঘাবাড়ী নদীবন্দরের সহকারী পরিচালক এসএম সাজ্জাদুর রহমান বলেন, বাঘাবাড়ী নদীবন্দরটির উন্নয়নে সরকার ব্যাপক কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। এরই মধ্যে বন্দরের সীমা বৃদ্ধি করা হয়েছে, বন্দর সংস্কার উন্নয়নে অর্থ বরাদ্দ হয়েছে। আশা করা যাচ্ছে, বন্দরটির উন্নয়নে দ্রুতই কাজ শুরু হবে।