প্রশাসনের অভিযানের মধ্যেও কক্সবাজারে বন্ধ হচ্ছে না পাহাড় কাটা। দিনে অভিযানের ভয়ে এখন রাতে কাটা হচ্ছে পাহাড়। ২০ জানুয়ারি উখিয়ার জালিয়াপালং ইউনিয়নে পাহাড় কাটার সময় মুসলিম উদ্দিন নামে শ্রমিকের মৃত্যুও হয়েছে। নির্বিচারে পাহাড় কাটার ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন পরিবেশবাদীরাও।
স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা জানান, সম্প্রতি শহরের কলাতলী বিকাশ বিল্ডিং এলাকায় অভিযানের ৯ ঘণ্টার মধ্যেই জব্দ করা এক্সক্যাভেটর ছিনিয়ে নেয় পাহাড় কাটার সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা। এছাড়া সৈকতপাড়ায় সিলগালা ভেঙে এবং শহরের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের বাদশাঘোনায় ফের নির্মাণকাজ শুরু করে সংঘবদ্ধ চক্রটি। কলাতলী বাইপাস সড়কের বিকাশ বিল্ডিংয়ে স্থানীয় ইউপি সদস্য ইউনুসকে মারধর এবং অস্ত্র ঠেকিয়ে প্রশাসনের জব্দ করা এক্সক্যাভেটর ছিনিয়ে নিয়ে যায় একদল অস্ত্রধারী। তাৎক্ষণিক ৯৯৯-এ ফোন করে সহযোগিতা চান ওই ইউপি সদস্য। কিন্তু পুলিশ পৌঁছার আগেই তারা এক্সক্যাভেটর নিয়ে পালিয়ে যায়। এরপরই সৈকতপাড়ায় ট্যুর অপারেটর অ্যাসোসিয়েশন অব কক্সবাজারের (টুয়াক) সাধারণ সম্পাদক নুরুল কবির পাশা পল্লবের পাহাড় কাটার স্থানে সিলগালা ভেঙে এবং শহরের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের বাদশাঘোনা এলাকায় মাঙাই বম ওরফে মেঘা নামে এক নারীর নির্মাণাধীন স্থাপনার কাজ পুনরায় শুরু করা হয়।
সৈকতপাড়ার কয়েকজন বাসিন্দা অভিযোগ করেন, নুরুল কবির প্রভাবশালী ব্যক্তি। তার সঙ্গে প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তা ও কিছু সাংবাদিকের সম্পর্ক রয়েছে। প্রভাব বিস্তার করেই তিনি সিসি ক্যামেরা লাগিয়ে এক্সক্যাভেটর দিয়ে প্রকাশ্যে পাহাড় কাটছিলেন। অভিযানের একদিন পার না হতেই সেখানে সিলগালা ভেঙে আবারো কার্যক্রম চালান পল্লব।
বাদশাঘোনার নুরুল ইসলাম বলেন, ‘মেঘা নামের ওই নারী খুব প্রভাবশালী। তিনি তিন মাস ধরে নৌবাহিনীর সীমানাপ্রাচীর ঘেঁষে সরকারি পাহাড় কেটে অবৈধভাবে স্থাপনা নির্মাণ করলেও কেউ বাধা দেয়নি। সম্প্রতি অভিযান চালিয়ে কাজ বন্ধ করলেও একদিন না যেতেই আবারো কাজ শুরু করেন।’
এসব বিষয়ে জানতে চাইলে কক্সবাজার সদর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) আরিফ উল্লাহ নিজামী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ঘটনা তিনটি আমি শুনেছি। এসব বিষয়ে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। তাদের ছাড় দেয়া হবে না। সবার বিরুদ্ধে মামলা করার জন্য পরিবেশ অধিদপ্তরকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে।’
এদিকে ২২ জানুয়ারি গভীর রাতে পাহাড় কেটে মাটি পাচারকালে উখিয়া উপজেলার হলদিয়া ইউপি সদস্য মো. শাহজাহানের মালিকাধীন একটি ডাম্পার আটক করেছে স্থানীয় প্রশাসন।
বন বিভাগ ও স্থানীয়দের তথ্য মতে, উখিয়া উপজেলার হলদিয়াপালং ইউনিয়নের ইউপি সদস্য মো. শাহজাহান ও তুর্জয় চৌধুরী রিগ্যানের নেতৃত্বে বন বিভাগের জায়গা থেকে মাটি কেটে বিভিন্ন স্থানে পাচার করে আসছিল। এছাড়া পশ্চিম হলদিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের উত্তরে আমির হোসেন পয়েন্ট, জামবাগান ফরেস্ট অফিসের উত্তরে সরকারি পাহাড়, পাগলিরবির, মধুঘোনা, উত্তর ও দক্ষিণ বড়বিল, পাতাবাড়ীসহ শতাধিক পয়েন্ট থেকে পাহাড় কেটে মাটি পাচার করে আসছে তারা।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা জানান, ইউপি সদস্য শাহজাহানের দুটি ডাম্পার রয়েছে। তার ছোট ভাই রহিম ডাম্পার নিয়ে প্রতিদিন সন্ধ্যার পরই বিভিন্ন পয়েন্ট থেকে মাটি কেটে পাচার করে। হলদিয়ার বেশির ভাগ স্থাপনা নির্মাণের জন্য জায়গা ভরাট করা পাহাড়ি এসব মাটি দিয়ে। হলদিয়া বিট কর্মকর্তা মো. আব্দুস ছালামকে গাড়িপ্রতি ৩০০ টাকা দেয়া হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।
হলদিয়া বিট কর্মকর্তা মো. আব্দুস ছালাম অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘এসব চক্রের বিরুদ্ধে আগেও একাধিক অভিযান পরিচালিত হয়েছে।’
অন্যদিকে কক্সবাজার সদর উপজেলায় বহুল আলোচিত পাহাড় কাটার দুই ঘটনায় মামলা করেছে পরিবেশ অধিদপ্তর। মামলায় আটজনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতনামা আরো আটজনকে আসামি করা হয়েছে। শহরতলির কলাতলীর সৈকতপাড়ায় পাহাড় কাটার ঘটনায় দায়ের করা মামলায় ট্যুর অপারেটর অ্যাসোসিয়েশন অব কক্সবাজারের (টুয়াক) সাধারণ সম্পাদক নুরুল কবির পাশা পল্লবের নাম উল্লেখ রয়েছে। পরিবেশ অধিদপ্তরের কক্সবাজার কার্যালয়ের সিনিয়র কেমিস্ট মো. আবদুছ ছালাম বাদী হয়ে ২২ জানুয়ারি সদর থানায় মামলা দুটি করেন।
কক্সবাজার সদর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মো. কাইছার হামিদ জানান, সংশ্লিষ্ট আইনে মামলাটি নথিভুক্ত করে আসামিদের গ্রেফতারে পুলিশ অভিযান শুরু করেছে।










