চলমান বন্যা যেন লণ্ডভণ্ড করে দিয়েছে সিলেটের গ্রামীণ অবকাঠামো। সিলেট নগর ও জেলায় বন্যার পানি কোথাও বেড়েছে, আবার কোথাও কমেছে। কয়েকটি স্থানে বন্যার পানি নেমে যেতে শুরু করায় সড়কগুলো ভেসে উঠতে শুরু করেছে। একই সঙ্গে ফুটে উঠছে ক্ষতের চিহ্ণ। কৃষকের পাকা ধান, গ্রামীণ রাস্তাঘাট ক্ষতিগ্রস্ত হওয়াসহ বানের পানিতে বেরিয়ে গেছে পুকুরের হাজার হাজার মাছ। ব্যবসায়ীদের গুদামে রাখা সারি সারি ধান-চালের বস্তা ভিজে নষ্ট হয়েছে বন্যার পানিতে। সময়মত না শুকানোর কারণে অনেক ধানে চারা গজিয়েছে। অনেকে কর্মহীন হয়ে পড়েছেন, অন্যদিকে ঘরে মজুত করা খাবারও শেষ হয়ে গেছে। বন্যাদুর্গত মানুষ পর্যাপ্ত ত্রাণ পাচ্ছে না বলেও অনেকে অভিযোগ করেছেন। তবে দুর্গত এলাকায় পর্যাপ্ত ত্রাণ বিতরণ করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে জেলা প্রশাসন। 

সংশ্লিষ্ট দফতর সমূহের প্রাথমিক হিসাব মতে, গতকাল শনিবার পর্যন্ত ১ হাজার ৬৬০ হেক্টর আউশ ধানের বীজতলা, বোরো ধান ১ হাজার ৭০৪ হেক্টর ও গ্রীষ্মকালীন সবজি ১ হাজার ৫শ ৩৮ হেক্টর বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে নগরীসহ সিলেট সড়ক ও জনপথ, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রায় ৫৩৬ কিলোমিটার সড়ক। জেলার ১১ উপজেলার ৭ হাজার ২৫১টি পুকুরের মাছ বেরিয়ে গেছে। সবমিলিয়ে ১ হাজার ৩৩৭ মেট্রিক টন মাছ ও ১২১ মেট্রিক টন পোনা ভেসে যায়। যার ক্ষতির পরিমাণ টাকার হিসাবে মোট ৬ কোটি ৭৪ লাখ টাকা।

যোগোযাগ খাতে বন্যায় ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। সরকারের সংশ্লিষ্ট দফতরে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নগরীসহ সিলেট সড়ক ও জনপথ, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রায় ৫৩৬ কিলোমিটার সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে সিলেট সিটি কর্পোরেশন এলাকায় প্রায় আড়াইশ’ কিলোমিটার, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতরের ২৩০ কিলোমিটার এবং সড়ক ও জনপথের (সওজ) আওতাধীন ৮টি সড়কে ৫৫ কিলোমিটার সড়ক রয়েছে। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের আওতাধীন সিলেট জেলার ১০টি উপজেলার ৬৬টি সড়কে ২৩০ কিলোমিটার সড়ক পানির নিচে ছিল। এই দফতরের প্রাথমিক হিসাব মতে ১৭২ কোটি ২৭ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। 

স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী এনামুল কবীর জানান, জেলার গোয়াইনঘাটে ২৭টি সড়কে ৮২ দশমিক ১৩ কিলোমিটার, কানাইঘাটে ১৫টি সড়কে ৩০ দশমিক ৫ কিলোমিটার, জৈন্তাপুর উপজেলার ১১টি সড়কের ৩২ দশমিক ০১ কিলোমিটার, সিলেট সদরের ১২টি সড়কে ২১ দশমিক ৩৮ কিলোমিটার, গোলাপগঞ্জে ১০টি সড়কে ২২ দশমিক ০৩ কিলোমিটার, কোম্পানীগঞ্জে ৪টি সড়কে ৩৪ দশমিক ৬৩ কিলোমিটার, দক্ষিণ সুরমার ৪টি সড়কে সাড়ে তিন কিলোমিটার, ফেঞ্চুগঞ্জে ১টি সড়কের দেড় কিলোমিটার, ওসমানীনগর উপজেলায় একটি সড়কের প্রায় দেড় কিলোমিটার, বালাগঞ্জে একটি সড়কে দেড় কিলোমিটার ক্ষতি হয়েছে।

সিলেট সিটি কর্পোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী নূর আজিজুর রহমান জানান, সিসিক এলাকার ৫০০ কিলোমিটার সড়কের মধ্যে ২৭টি ওয়ার্ডের মধ্যে ১৪টি ওয়ার্ডের প্রায় আড়াইশ’ কিলোমিটার সড়কে বন্যার পানি উঠে। অনেক সড়ক এখনো পানি নেমে যায়নি। পানি ডুবে থাকায় রাস্তাঘাটগুলোর ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে।

অপরদিকে সিলেটে নগরীর সুরমার তীরঘেষা কাজিরবাজার এলাকায় রয়েছে অর্ধশতাধিক অটো রাইস মিল। বন্যার পানিতে এসব রাইস মিলের গুদামে পানি উঠে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। গুদামে রাখা সারি সারি ধান-চালের বস্তা ভিজে নষ্ট হয়েছে বন্যার পানিতে। তা সরিয়ে নেয়ার সুযোগও পাননি ব্যবসায়ীরা। গুদামের এক হাজার ২০০ বস্তা চাল নষ্ট হয়ে গেছে বলে জানান মোস্তাক এন্ড ব্রাদার্সের ব্যবস্থাপক আবুল কালাম। তিনি জানান, চাল একবারেই নষ্ট হয়ে গেছে। শুকিয়েও কোন লাভ হবেনা।

সিলেট জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. আবুল কালাম আজাদ জানান, সিলেটের ১৩টি উপজেলার মধ্যে ১১টি উপজেলায় ৮ হাজার ৩২২টি পুকুরে খামারিরা মাছ চাষ করেছেন। এগুলোর মধ্যে ৭ হাজার ২৫১টি পুকুর বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। টাকার হিসাবে মোট ৬ কোটি ৭৪ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। জেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি পুকুরের মাছ ভেসে গেছে জকিগঞ্জ উপজেলায়। কৃষি অধিদফতর সিলেটের উপ পরিচালক কাজী মুজিবুর রহমান জানান, বন্যায় সিলেট ১ হাজার ৬শ ৬০ হেক্টর আউশ ধানের বীজতলা, বোরো ধান ১ হাজার ৭০৪ হেক্টর ও গ্রীষ্মকালীন সবজি ১ হাজার ৫শ ৩৮ হেক্টর বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে।

সিলেটের জেলা প্রশাসক মো. মজিবর রহমান জানান, বন্যায় সামগ্রিকভাবে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। বন্যার উন্নতি হচ্ছে। আমরা সবকটি দফতর ক্ষয়ক্ষতি নির্ধারণে কাজ করছে। বিশেষ করে কৃষকদের যাতে দ্রুততম সময়ে চাষাবাদে যুক্ত হতে পারেন সে ব্যাপারে সহায়তার পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে।