করোনাকালে রফতানি বন্ধ থাকায় পানের দরপতনে হতাশ ঝিনাইদহ জেলার চাষীরা। ঝিনাইদহ জেলায় উৎপাদিত পানের একটি বড় অংশ যেত বিদেশে। করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব ও সালমোনেলা ব্যাকটেরিয়ার আক্রমণের কারণে বর্তমানে পান রফতানি বন্ধ। এ কারণে পানের দাম পড়ে গেছে।

কৃষকরা জানান, দুই বছর ধরে করোনার কারণে চাহিদা কম আর রফতানি না হওয়ায় পানির দরে বিক্রি হচ্ছে পান। বর্তমানে দাম কম হওয়ায় উৎপাদন খরচও উঠছে না বলে জানিয়েছেন কৃষকরা। বর্তমানে দেশের সব জেলায় কমবেশি পান চাষ হচ্ছে। এছাড়া এবার বেশি বৃষ্টির কারণে পান ভালো হয়েছে। ক্ষতির পরিমাণ নেই বললেই চলে। ফলে এবার পানের দাম খুবই কম।

ঝিনাইদহ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের দেয়া তথ্যমতে, ঝিনাইদহ জেলা সদর, হরিণাকুণ্ডু, শৈলকুপা, কালীগঞ্জ, কোটচাঁদপুর ও মহেশপুর উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে ২০২০-২১ অর্থবছরে ২ হাজার ২৩৯ হেক্টর জমিতে পান আবাদ হয়। হেক্টরপ্রতি ফলন হয় ১২ দশমিক ৭ টন। ২০২১-২২ অর্থবছরে ২ হাজার ৩৬৯ হেক্টরে আবাদ হয়। হেক্টরপ্রতি ফলন হয় ১৩ দশমিক ৩ টন।

ঝিনাইদহে জেলার বিভিন্ন উপজেলার পানের হাটে ভালোমানের পান সর্বোচ্চ ৪০ টাকা ও সর্বনিম্ন ৫ টাকা পণ দরে বিক্রি হচ্ছে। জেলার ভাটই, কুলচারা, বিন্নি, পোড়াহাটী, মান্দিয়া, হলিধানী, ডাকবাংলা, হরিণাকুণ্ডু উপজেলার আমতলা, জিন্দারের মোড়সহ বিভিন্ন হাটে পান গত বছরগুলোর তুলনায় অনেক কম দামে বিক্রি হচ্ছে।

সরেজমিনে ঝিনাইদহ শহরের নতুন হাটখোলা পান বাজারে গিয়ে দেখা যায়, প্রতি পণ পান সর্বোচ্চ ৪০ টাকা ও সর্বনিম্ন ৫ টাকা দরে বিক্রি হয়েছে, যা গত বছরে ২০০ টাকার বেশি ছিল। সর্বনিম্ন ১০-২০ টাকা দরে পান বিক্রি হয়েছে।

হরিণাকুণ্ডু উপজেলার পোলতাডাঙ্গা গ্রামের পানচাষী আবুল হোসেন বলেন, এবার পানের দাম কয়েক বছরের তুলনায় সবচেয়ে কম। এক বিঘা জমিতে পান আবাদ করতে বর্তমানে খরচ হচ্ছে ৩ লাখ টাকার ওপরে। পানের সার, খৈল, বিচালি, পাটকাঠি, শ্রমিকের মজুরিসহ সব হিসাব করলে এ খরচ হচ্ছে। কিন্তু বর্তমানে পানের যে দাম পাওয়া যাচ্ছে, তাতে ভালোমানের পান হলেও ১ লাখ টাকার বেশি হচ্ছে না। দাম কম হওয়ায় এবারো আমাদের লোকসান গুনতে হচ্ছে। পানের দাম কম হওয়ার কারণে এবার উৎপাদন খরচও উঠছে না।

একই উপজেলার তাহেরহুদা গ্রামের কৃষক জাহিদুল ইসলাম বলেন, পানের দাম ভালো পেতে এখন সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে। ভারত থেকে কিছু পান আসে, সেই পান আনা বন্ধ করতে হবে। আর আমাদের পান রফতানি বাড়াতে হবে।

ঝিনাইদহ সদর উপজেলার রাজনগর গ্রামের পানচাষী আব্দুল লতিফ বলেন, করোনার কারণে দুই বছর পান বিক্রি কম হয়েছে। এখন বিক্রি বাড়লেও দাম কম পাচ্ছি। এভাবে চলতে থাকলে পানের আবাদ বন্ধ করে অন্য আবাদ করা লাগবে।

ভবানীপুর গ্রামের পানচাষী মজনু জানান, বর্তমানে দেশের সব জেলায় কমবেশি পান চাষ হচ্ছে। এছাড়া এবার বেশি বৃষ্টির কারণে পান বেশি ভালো হয়েছে। ক্ষতির পরিমাণ নেই বললেই চলে। ফলে এবার পানের দাম খুবই কম। এছাড়া আমেরিকা, ইংল্যান্ড, সৌদি-আরব ও কুয়েতসহ বিভিন্ন দেশে পান রফতানি হতো। সেখানে বর্তমানে পান যাচ্ছে না।

একই এলাকার ইব্রাহিম জোয়ারদার জানান, আমদানি বেশি হওয়ার কারণে এবার পানের দাম খুবই কম। সারা বাংলাদেশে কমবেশি মন্টু, মিষ্টি ও ঝালপান আবাদ হচ্ছে। ফলে পানের দাম নেই বললে চলে। এর আগে দেশের চাহিদা মিটিয়ে রফতানিও করা হতো। সেটা এখন বন্ধ। ফলে পানচাষীরা চরম বিপদে আছেন।

ঝিনাইদহ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আজগর আলী বলেন, সালমোনেলার কারণে বর্তমানে পান রফতানি বন্ধ। ফলে পানের দাম পড়ে গেছে। কৃষকদের পানের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে আমরা কাজ করছি। পানচাষীরা যেন সিন্ডিকেটের কবলে না পড়েন, এজন্য নিয়মিতভাবে বাজার পরিদর্শন করছি। আর কৃষি বিভাগের সঙ্গে আলোচনা করে পান রফতানি বাড়ানোর ব্যাপারে কথা চলছে।