সিরাজগঞ্জের কাজীপুর উপজেলার কুনকুনিয়া গ্রামে ১৯৯০-৯২ সালের দিকে প্রথম ঝুট কাপড় দিয়ে কম্বল তৈরি শুরু হয়। দীর্ঘ ২৮ বছরের ব্যবধানে এটি রীতিমতো শিল্পে পরিণত হয়েছে। এ শিল্পের সঙ্গে বর্তমানে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ৪০ হাজার মানুষ জড়িত। উপজেলার গণ্ডি পেরিয়ে সারা দেশের নিম্ন আয়ের মানুষের শীত নিবারণের অন্যতম হাতিয়ার হিসেবে পরিণত হয়েছে ঝুট কাপড়ের এ কম্বল। প্রত্যেক বছর শীত মৌসুমে দেশব্যাপী এ কম্বলের চাহিদা থাকে ব্যাপক।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, কুনকুনিয়া গ্রামের আব্দুল খালেক ঝুট কাপড় দিয়ে প্রথম কম্বল তৈরি শুরু করেন ১৯৯০-৯২ সালে। তার দেখাদেখি একই উপজেলার বর্শীভাঙ্গা গ্রামের ছাইদুল হকও শুরু করেন একই ব্যবসা। ঢাকা থেকে গার্মেন্টসের পরিত্যক্ত ঝুট কাপড় সংগ্রহ করে জোড়াতালি দিয়ে বানানো হয় এ কম্বল। প্রথমে স্বল্প পরিসরে তৈরি করা কম্বল সাইকেলে নিয়ে ফেরি করে গ্রামে গ্রামে বিক্রি করতেন তারা। দাম কম ও শীত নিবারণে কার্যকর হওয়ায় দ্রুতই জনপ্রিয়তা পায় নিম্ন আয়ের মানুষের মধ্যে। তাদের দেখাদেখি ধীরে ধীরে মানিকপটল, শিমুলদাইড়, ঢেকুরিয়া, বর্শীভাঙ্গা, সাতকয়া, শ্যামপুর, ছালাভরা, পাইকরতলী, বরইতলা, মুসলিমপাড়া, ভবানীপুর, গাড়াবেড়, রশিকপুর, হরিনাথপুর, মাথাইলচাপড়, রৌহাবাড়ী, পলাশপুর, বিলচতলসহ বিভিন্ন গ্রামে এ কম্বল তৈরি শুরু হয়। বর্তমানে কম্বল তৈরির কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে আধুনিক সেলাই মেশিন ও উপকরণ।

কুনকুনিয়া গ্রামের রহিমা জানান, স্বামীর আয়ে সংসার চলে না। তাই কাজ করেন কম্বল তৈরির কারখানায়। সংসারের কাজের ফাঁকে ফাঁকে এ কম্বল সেলাই করছেন। কম্বল সেলাই করে প্রতিদিন ২০০-৩০০ টাকা পর্যন্ত আয় হয়।

শুধু রহিমা নয় উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের কয়েক শতাধিক নারীই কম্বল তৈরি করে সংসারে বাড়তি আয় করছেন।

স্থানীয়রা জানায়, প্রত্যেক বছর শীত মৌসুমে এ কম্বলের চাহিদা অনেক বেড়ে যায়। এজন্য উপজেলার অন্তত ২০টি গ্রামের নারী-পুরুষ কম্বল তৈরিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত চলে কম্বল তৈরির কাজ। মানভেদে একেকটি কম্বল ১৫০ থেকে ১ হাজার টাকায় বিক্রি হয়।

উপজেলার মাইজবাড়ী ইউনিয়নের ছালাভরা গ্রামের কম্বল তৈরির কারিগর আমিনুল ইসলাম বলেন, গার্মেন্টসের ফেলে দেয়া ঝুট কাপড় বিশেষ কায়দায় জোড়াতালি দিয়ে সেলাই করে কম্বল তৈরি করা হয়। সেলাইয়ের কাজে পরিবারের সবাই সাহায্য করে। তবে কয়েক বছর ধরে নতুন কাপড় কেটেও কম্বল তৈরি হচ্ছে।

একই উপজেলার শিমুলদাইড় গ্রামের সোহরাব আলী বলেন, এখানে কম্বল তৈরির ব্যবসা শুরু হওয়ায় আমাদের মতো মানুষের আয়ের পথ সৃষ্টি হয়েছে। অনেকে স্বাবলম্বী হয়েছেন। একটি লেপ তৈরি করতে কমপক্ষে ৮০০ থেকে ১ হাজার টাকা লাগে। অথচ একটি ঝুট কম্বল ১৫০ থেকে ৩০০ টাকার মধ্যে পাওয়া যায়। ব্লেজার তৈরির পরিত্যক্ত ঝুট জোড়া দিয়ে বানানো কম্বল একদিকে যেমন হালকা, অন্যদিকে প্রচণ্ড শীতেও এ কম্বল বেশ গরম ও আরামদায়ক। এছাড়া বিতরণের জন্য বেসরকারি-সরকারিভাবে বেশির ভাগ কম্বল এখান থেকে কেনা হয়।

ঝুট ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি রফিকুল ইসলাম বলেন, আমার মতো অনেকে ঢাকা থেকে ঝুট কিনে আনেন। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা সেই ঝুট কিনে নেন। ঝুট দিয়ে তৈরি কম্বলের চাহিদা শীত মৌসুমে বেড়ে যায়। প্রত্যেক মৌসুমে প্রায় ৫০ কোটি টাকার কম্বল বিক্রি হয়। এখানকার তৈরি কম্বল পাঠানো হয় বিভিন্ন জেলায়। অনেকে ত্রাণ হিসেবে বিতরণের জন্যও এ কম্বল কিনে নেন।

উপজেলার মাইজবাড়ি ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান তালুকদার জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ঝুটের কম্বল তৈরির শিল্পটি মানুষের ভাগ্য বদলে বড় ভূমিকা রাখছে। অথচ এখানে ব্যাংকের কোনো শাখা নেই। ব্যবসায়ীরা ঋণ সুবিধাও পান না।

কাজীপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) জাহিদ হাসান সিদ্দিকী বলেন, পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়াই নিজস্ব উদ্যোগে কাজীপুরে ঝুটের জোড়াতালি দিয়ে তৈরি করা কম্বলে ভাগ্য বদল হয়েছে অনেকের।

সিরাজগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি আবু ইউসুফ সুর্য বণিক বার্তাকে বলেন, কোনো ধরনের সহযোগিতা ছাড়াই স্থানীয়রা নিজস্ব উদ্যোগে এ শিল্প গড়ে তুলেছেন। এটি অনেক সম্ভবনাময় শিল্প । শীত মৌসুমে প্রতি বছর অর্ধশতকোটি টাকার কম্বল বিক্রি হচ্ছে। উৎপাদিত পণ্যের বাজার তৈরি, ব্যাংক ঋণ সুবিধাসহ পরিকল্পিতভাবে সরকারি-বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে এখানে কমপক্ষে এক লাখ মানুষের নতুন কর্মসংস্থান তৈরি করা সম্ভব হবে। এ শিল্পের বিকাশে এবং নতুন উদ্যোক্তা তৈরিতে ভূমিকা রাখতে সরকারি-বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা জরুরি।