বিভিন্ন কারণে অনেক বহুজাতিক জায়ান্ট সাম্প্রতিক বছরে চীনের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে আনছে। এসব ক্ষেত্রে দ্বিতীয় পছন্দ হিসেবে অনেক প্রতিষ্ঠান ভারতে ব্যবসা সম্প্রসারণকে বেছে নিচ্ছে। এতে উৎপাদনমুখী বিভিন্ন খাতে কাজের সুযোগ বেড়েছে একসময় শ্রমবাজারে অবহেলিত থাকা ভারতীয় নারীদের। খবর ইকোনমিক টাইমস।  

শিল্পোন্নত দেশগুলোয় কর্মজীবী নারীরা সরাসরি রোজগারের সুযোগ পান, যা তার জীবনমান উন্নয়ন ও স্বাধীন সিদ্ধান্ত নিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সে তুলনায় পিছিয়ে আছেন ভারতীয় নারীরা। সুযোগের অভাব, লৈঙ্গিক বৈষম্যসহ এর একাধিক কারণ তুলে ধরেছেন বিশ্লেষকরা।

নয়াদিল্লির ন্যাশনাল কাউন্সিল ফল অ্যাপ্লায়েড ইকোনমিক রিসার্চের বিশেষজ্ঞ সোনালদে দেশাই বলেন, ‘ভারতে কর্মক্ষম প্রচুর নারী শ্রমিক আছেন, যারা কাজের সুযোগ পেলে শ্রমবাজারে যুক্ত হতে চান।’ 

গত ৫০ বছরে উৎপাদনমুখী শিল্পের বিকাশের কারণে এশিয়ার দেশগুলোয় অর্থনৈতিক উন্নতি হয়েছে। আয় বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে দারিদ্র্য হ্রাস ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বেড়েছে। আর এ পরিবর্তনে নারীদের উল্লেখযোগ্য অংশগ্রহণ ছিল। বিশ্বব্যাংকের তথ্য বলছে, ভিয়েতনামে ১৫ বছরের বেশি মেয়ে ও প্রাপ্তবয়স্ক নারীদের ৬৮ শতাংশ কোনো না কোনো মজুরিভিত্তিক কাজ করেন। চীনে এ পরিমাণ ৬৩ শতাংশ, থাইল্যান্ডে ৫৯, ইন্দোনেশিয়ায় ৫৩ শতাংশ। কিন্তু ভারত সরকারের তথ্যমতে, দেশটির কর্মজীবী নারীর পরিমাণ ৩৩ শতাংশেরও নিচে। 

ভারতে নারীরা সাধারণত গৃহস্থালি কাজ ও সন্তানদের দেখাশোনা করে থাকেন। এর বাইরে কৃষিকাজ ও গৃহপালিত পশুপাখি লালন করেন তারা। সোনালদে দেশাই বলেন, ‘এসব কাজের বিনিময়ে নারীদের অর্থ নেয়ার সুযোগ নেই। এর বাইরে তারা মজুরিভিত্তিক কাজ পান এমন না, কিন্তু সেগুলোর মজুরিও তত বেশি নয়।’ 

অন্যদিকে আইনিভাবে বেতন ও কর্মপরিবেশের সুরক্ষা নিশ্চিত করা হয়েছে, এমন কাজে ভারতীয় নারীদের উপস্থিতি উল্লেখযোগ্য নয়। লৈঙ্গিক বৈষম্য ও যৌন হয়রানিসহ সামাজিক বাধার কারণে নারীদের কাজে জড়িত হওয়ার হার কম। 

তবে প্রতিবন্ধকতার বিষয়টি এখানেই সীমাবদ্ধ নয়। সম্প্রতি রয়টার্সের একটি প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ভারতে আইফোন প্রস্তুতকারী একটি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান বিবাহিত নারীদের নিয়োগ বন্ধ করে দিয়েছে। বিবাহোত্তর পারিবারিক দায়িত্ব পালনের কারণে এসব নারীর পারফরম্যান্স সন্তোষজনক না হওয়ার দাবি করেছে কোম্পানিটি। 

ভারতে অর্থনীতি শক্তিশালী হয়ে উঠলেও দেশটিতে কর্মসংস্থানের হার ততটা বাড়েনি। বিদ্যমান কর্মক্ষেত্রে পুরুষের একচেটিয়া প্রাধান্য। প্রযুক্তি খাত কিছুটা ব্যতিক্রম হলেও নতুন খাতগুলোয় নারীরা সাধারণত কম মজুরি পান। সেখানে একজন নারী যে ধরনের প্রতিবন্ধকতা মোকাবেলা করে কর্মক্ষেত্রে আসেন, এর তুলনায় মজুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ফলে অনেকেই গৃহস্থালি জীবনে ফিরে যান।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হলে অর্থনৈতিক অগ্রগতির জন্য নারীরা কাজ করবেন। বিশেষ করে নারী শিক্ষায় অগ্রগতির কারণে কাজ করতে ইচ্ছুক নারীর সংখ্যা বেড়েছে। 

দিল্লির অদূরে স্মার্টিভিটি নামের একটি খেলনা তৈরির কারখানায় কাজ করেন পূরবী। নিজের কাজকে জীবনযাত্রার ঊর্ধ্বমুখী ব্যয় নির্বাহের উপায় হিসেবে দেখেন তিনি। তবে কোম্পানিটিতে পূরবীর নিয়োগ পাওয়া খুব সহজ ছিল না। ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট ফর টেকনোলজি (আইআইটি) থেকে পাস করেছেন— কোম্পানিটির এমন দুই শীর্ষ কর্মকর্তা তাকে নিয়োগ দিতে অনীহা প্রকাশ করেছিলেন।

 অথচ সেখানে নারীদের পারফরম্যান্স পুরুষদের চেয়েও ভালো বলে জানিয়েছেন কোম্পানিটির চিফ অব স্টাফ পুলকিত সিং।

এদিকে স্মার্টিভিটির সিইও অশ্বিনী কুমার জানান, কোম্পানিটির ২০০ কাজের অন্তত ৪০ শতাংশ করে থাকেন নারীরা। সম্প্রতি তাদের তৈরি খেলনা যুক্তরাষ্ট্রে বিক্রির জন্য ওয়ালমার্টের সঙ্গে আলোচনা চলছে। ব্যবসা সম্প্রসারণ হলে নারীদের কাজের সংখ্যা আরো বাড়বে। 

সম্প্রতি মুম্বাইয়ের স্থানীয় সরকার আইন পরিবর্তন করে রাতে নারীদের কাজের অনুমতি দিয়েছে। সেখানকার অল টাইম প্লাস্টিকস নামের আরেকটি কোম্পানিতে ৭০ শতাংশ শ্রমিকই নারী। প্রতি বছরই এ পরিমাণ বাড়ছে। নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে বাসও চালু করেছে কোম্পানিটি।