দেশের পুঁজিবাজারে অতীতে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন অনিয়মের ঘটনা ঘটেছে। অনেক ক্ষেত্রেই এসব অনিয়মের সঙ্গে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) কর্মকর্তাদেরও সংশ্লিষ্টতা ছিল। এসব অনিয়মের বিষয়ে তদন্ত করে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে জানিয়েছেন বিএসইসির নতুন চেয়ারম্যান রাশেদ মাকসুদ। এক্ষেত্রে সুশাসন নিশ্চিতের কাজটি নিজ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমেই শুরু করতে চান তিনি। চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার পর প্রথমবারের মতো আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন তিনি।

সংবাদ সম্মেলনে বিএসইসির চেয়ারম্যান রাশেদ মাকসুদ বলেন, ‘‌আমি প্রথমেই সুশাসন ও কমপ্লায়েন্সের দিকে জোর দিতে চাই। দীর্ঘদিন ধরে যে অনিয়ম হয়েছে সেগুলো কি খুব সহজে আমরা দূর করতে পারব, সেটি নিয়ে কিছুটা সন্দেহ থাকতে পারে। তবে আমরা যদি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়ে ধারাবাহিকভাবে লেগে থাকি তাহলে হয়তো একটি স্বস্তিদায়ক অবস্থানে পৌঁছাতে পারব। এজন্য প্রত্যেককে যার যার জায়গা থেকে প্রক্রিয়া ও বিধি অনুসারে কাজ করতে হবে।’

আগামী দিনের কর্মপরিকল্পনার বিষয়ে বিএসইসির চেয়ারম্যান বলেন, ‘আমরা কোর অপারেশনাল এরিয়া ও নন কোর এরিয়া দুই ভাগে আমাদের কাজগুলোকে ভাগ করতে পারি। কোর অপারেশনাল কাজগুলোর মধ্যে প্রথমেই আসবে স্বচ্ছতার বিষয়টি। সব ধরনের লেনদেন, চুক্তির ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। এক্ষেত্রে কোনো ধরনের কারসাজি হচ্ছে কিনা, কেউ তার দায়িত্বের অপব্যবহার করছে কিনা সেটি নজরদারি করা হবে। দ্বিতীয় যে বিষয়টি আছে সেটি হলো সুশাসন নিশ্চিত করার চেষ্টা করব। সুশাসন হচ্ছে পুঁজিবাজারের প্রাণ। এটি ছাড়া কোনো কিছুই টেকসই হবে না। এক্ষেত্রে প্রথমে আমাদের নিজেদের মধ্যে সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে। পুঁজিবাজারসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর পর্ষদকে প্রতিনিধিত্ব করতে হবে। বাজার মধ্যস্থতাকারীদের কার্যক্রমে সুশাসন নিশ্চিত করা হবে। আমাদের আইন-কানুন অনেক ভালো, কিন্তু এটিকে সব জায়গায় প্রয়োগ করতে হবে। তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোয় সুশাসন নিশ্চিত করাটা গুরুত্বপূর্ণ। এটি নিশ্চিত করতে আমরা কঠোরভাবে কাজ করব। এক্ষেত্রে স্বতন্ত্র পরিচালকদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। কোম্পানির সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা কখনই স্বতন্ত্র পরিচালক হতে পারেন না। আমরা তাদের ব্যাকগ্রাউন্ড চেক করে দেখব। তাদের ভূমিকার বিষয়ে প্রয়োজনে ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করা এবং তাদের কাজের স্বীকৃতি দেয়া হবে। পুঁজিবাজারে পণ্য বাড়ানোর জন্য আমরা কাজ করব। তবে এটি আমাদের মধ্যমেয়াদের অগ্রাধিকার হিসেবে থাকবে।’

গত কয়েক বছরে পুঁজিবাজারে বিভিন্ন লেনদেনের ক্ষেত্রে যেসব অনিয়ম হয়েছে সেগুলোর বিষয়ে একটি গভীর পর্যালোচনা করতে হবে উল্লেখ করে বিএসইসির চেয়ারম্যান বলেন, ‘এটি সহজ কাজ নয়। তবে আমরা যদি এক্ষেত্রে অনিয়মকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিই তাহলে সামনে এ ধরনের পরিস্থিতি আবার তৈরি হবে। আমাদের অনেক আইন-কানুন আছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও তারা এসব অনিয়ম কীভাবে করেছেন সেই ফাঁকফোকর খুঁজে বের করতে হবে। এসব ফাঁকফোকর যদি বন্ধ না করি তাহলে ভবিষ্যতে এ ধরনের কাজ আবারো হতে পারে। যেসব অনিয়ম হয়েছে সেগুলোর বিষয়ে তদন্ত করে ব্যবস্থা নিতে হবে।’

কতদিনের মধ্যে সেটি করা সম্ভব হবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘কতদিন সেটি বলতে পারছি না, তবে যত শিগগির সম্ভব তদন্তের উদ্যোগ নেয়া হবে। পুঁজিবাজার সংস্কার করার একটি ঐতিহাসিক সুযোগ আমাদের সামনে এসেছে। সেটিকে কাজে লাগাতে হবে।’

অতীতে অনিয়মের সঙ্গে বিএসইসির কর্মকর্তাদেরও সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি উঠে এসেছে। এক্ষেত্রে তাদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেয়া হবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি সুশাসন নিশ্চিত করার কথা বলেছি এবং সেটি নিজেদের ঘর থেকেই শুরু হবে। বিভিন্ন সময়ে যেসব লেনদেন ও চুক্তি হয়েছে সেখানে কার কী ভূমিকা ছিল সেটি পর্যালোচনা করা হবে। পুঁজিবাজারে বিএসইসির কর্মীদের কী ধরনের সম্পৃক্ততা থাকবে এবং তাদের আচরণবিধি কী হবে সে বিষয়ে আমরা একটি গাইডলাইন তৈরি করব।’

নিয়ন্ত্রক সংস্থার পক্ষ থেকে পুঁজিবাজারের সূচক ওঠানামায় হস্তক্ষেপ করার বিষয়ে জানতে চাইলে রাশেদ মাকসুদ বলেন, ‘বাজার কিংবা সূচক কোথায় যাবে সেখানে হস্তক্ষেপ করা একটি ভুল চিন্তাধারা। এ ধরনের চিন্তাধারার সঙ্গে আমরা একমত নই। আমরা বাজারে কী ধরনের পণ্য আসতে পারে সেটি নিয়ে চিন্তা করতে পারি। বাজার গতিশীল কিনা এবং সবাই সেখানে সুরক্ষা পাচ্ছে কিনা সেটি গুরুত্বপূর্ণ। সরকারি কোম্পানির পাশাপাশি বেসরকারি খাতের ভালো কোম্পানিকে তালিকাভুক্ত করতে হবে। এক্ষেত্রে প্রশাসনিকভাবে নয়; বরং সুযোগ-সুবিধা ও প্রণোদনার মাধ্যমে তাদের তালিকাভুক্ত হওয়ার জন্য উৎসাহিত করা হবে।’

ফ্লোর প্রাইস ও সার্কিট ব্রেকারের ক্ষেত্রে বৈষম্যমূলক নীতি প্রত্যাহার করা হবে কিনা জানতে চাইলে বিএসইসি চেয়ারম্যান বলেন, ‘সার্কিট ব্রেকার দুদিকেই সমান হওয়া উচিত। এটি অবশ্যই একটি বৈষম্যের ব্যাপার। শুধু সার্কিট ব্রেকার নয়; পুঁজিবাজারের জন্য যেসব বিষয় গুরুত্বপূর্ণ আমরা সেগুলোকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে অতিদ্রুত পর্যালোচনার উদ্যোগ নিয়েছি।’

মিউচুয়াল ফান্ডের অনিয়মের বিষয়ে জানতে চাইলে বিএসইসির কমিশনার ড. এটিএম তারিকুজ্জামান বলেন, ‘অতীতে মিউচুয়াল ফান্ডের ক্ষেত্রে কিছু অনিয়ম হয়েছে। আইনের ক্ষেত্রেও কিছু বৈষম্য ছিল। এগুলো পর্যালোচনা করে যেসব বৈষম্য রয়েছে সেগুলো দূর করা হবে।’

সংবাদ সম্মেলনে অন্যদের মধ্যে বিএসইসির কমিশনার মো. মহসিন চৌধুরী ও বিএসইসির নির্বাহী পরিচালক মো. আনোয়ারুল ইসলাম উপস্থিত ছিলেন।