ডলারের বিপরীতে স্থানীয় মুদ্রার বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখতে লড়ছে এশিয়ার দেশগুলো। সাম্প্রতিক এ প্রবণতা থেকে ব্যতিক্রম নয় মিয়ানমার। তবে গৃহযুদ্ধ পরিস্থিতি দেশটির অর্থনীতিতে ভিন্ন একটি মাত্রা তৈরি করেছে। ধারাবাহিক পদক্ষেপ নিয়েও মুদ্রার বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখার চ্যালেঞ্জে ব্যর্থ ক্ষমতাসীন জান্তা সরকার। এমন পরিস্থিতিতে ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতি দেশটির জনগণকে নাভিশ্বাস অবস্থায় ঠেলে দিয়েছে। খবর নিক্কেই এশিয়া।

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশটির অর্থনৈতিক রাজধানী ইয়াঙ্গুনের ৩১ বছর বয়সী এক হোটেল কর্মী জানান, উচ্চ পণ্যমূল্যের সঙ্গে মানিয়ে নেয়ার একদম শেষ পর্যায়ে চলে এসেছেন। ওই নারী বলেন, ‘খরচ কমিয়েও আমরা চলতে পারছি না।’

স্বামী ও স্ত্রী মিলে মাসে ৬০০ ডলারের মতো আয় করেন তারা। সংসারে আরো রয়েছে তিন বছর বয়সী শিশু ও ওই নারীর বৃদ্ধ মা। চারজনের সংসার নিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই হোটেল কর্মী। তিনি বলেন, ‘আমি ঘরের জিনিসপত্র বিক্রি করেছি ও বন্ধুদের কাছ থেকে টাকা ধার নিয়েছে।’

মূল্যবৃদ্ধির এ চক্র থামার কোনো লক্ষণ নেই। ইয়াঙ্গুনে পেট্রল লিটারপ্রতি সর্বকালের সর্বোচ্চ ২ হাজার ৯০০ কিয়াতে পৌঁছেছে সম্প্রতি। চাল, পেঁয়াজ ও রসুনের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের মূল্য এক বছরের আগের তুলনায় বেড়েছে ৫০ শতাংশের বেশি।

গত ডিসেম্বরে বিশ্বব্যাংক এক পূর্বাভাসে জানায়, মিয়ানমারে চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত মূল্যস্ফীতি ২০ দশমিক ১ শতাংশে পৌঁছতে পারে, যা পুরো অঞ্চলে সর্বোচ্চ।

এপ্রিলে মিয়ানমারজুড়ে পালিত হয় নববর্ষ। এ ছুটির সময় খাদ্য ও পরিবহনের খরচ বাড়তে থাকে। ওই সময় অনুষ্ঠিত হয় জনপ্রিয় পানি উৎসব। কিন্তু এবার অন্য বছরের তুলনায় খরচের ধাক্কা ছিল বেশি।

মিয়ানমারে ক্রমবর্ধমান পণ্যমূল্যের খবর রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমও স্বীকার করেছে। যদিও এ পরিসংখ্যানের সঙ্গে প্রকৃত পরিস্থিতির বড় পার্থক্য রয়েছে বলে অভিযোগ আছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন যে চড়তে থাকা মূল্যস্ফীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে ডলারের বিপরীতে কিয়াতের বিনিময় হারে পতন। বর্তমানে ১ ডলারের বিপরীতে পাওয়া যাচ্ছে প্রায় ৪ হাজার কিয়াত। ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে সামরিক জান্তা যখন ক্ষমতা দখল করে, তখন থেকে বিনিময় হারের পতন ঘটেছে প্রায় ৭০ শতাংশ।

২০২২ সালের আগস্টের শেষের দিকে রেকর্ড দুর্বলতায় পৌঁছে বিনিময় হার। তখন থেকে মুদ্রার বাজার নিয়ন্ত্রণে আনতে সরকার পদক্ষেপ নিয়ে আসছে। চলতি বছরে ২০ বারের বেশি সময় কিয়াতের বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখতে পদক্ষেপ নেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এ সময় বৈদেশিক মুদ্রা বিক্রির ওপর হস্তক্ষেপ করা হয়। এর আগে মিয়ানমারের কেন্দ্রীয় ব্যাংক জোরপূর্বক মুদ্রা বিনিময় ও মানি-চেঞ্জারদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থা নেয়। এমনকি কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিজেও বাজারে মুদ্রা কেনা-বেচা থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রেখেছিল। তা সত্ত্বেও পরিস্থিতি সহজ হয়নি।

সাম্প্রতিক সময়ে ডলারের বিপরীতে দুর্বল হয়ে পড়েছে এ অঞ্চলের উদীয়মান দেশগুলোর মুদ্রা। কিন্তু মিয়ানমারের গৃহযুদ্ধের সঙ্গে যুক্ত কারণগুলো কিয়াতের পতন আরো দ্রুত করে দেয়। এর একটি কারণ গত ১০ ফেব্রুয়ারিতে ঘোষিত একটি সামরিক পদক্ষেপ। যার অধীনে তরুণদের সশস্ত্র পন্থীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যেতে বাধ্য করা হচ্ছিল। অনেক যুবক সেনাবাহিনীতে নিয়োগ এড়াতে সীমান্ত অতিক্রম করেছেন। এ সময় তারা ব্যাপক সংখ্যক ডলার ও বাথ সঙ্গে নিয়ে যান।

ইয়াঙ্গুনে কর্মরত একটি আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং গ্রুপের একজন সিনিয়র ম্যানেজার জানান, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হস্তক্ষেপ প্রথম দিকে প্রভাব ফেললেও সেনাবাহিনীতে যোগদানের বাধ্যবাধকতা সে প্রভাবকে বিবর্ণ করে দিয়েছে।

এখন মুদ্রার লাগামহীন পতন মিয়ানমারের স্থানীয় ব্যবসায় পরিচালনা ও মূলধন বাবদ খরচ বাড়িয়ে তুলছে। এর অন্যতম কারণ পেট্রলের মূল্যবৃদ্ধি। ব্যবসায়ীদের ওপর এ বাবদ অতিরিক্ত খরচ যোগ হচ্ছে, যা পরবর্তী গ্রাহকদের ওপর চেপে বসে।

অন্যান্য খাতের মধ্যে চিকিৎসার ক্ষেত্রে মূল্যস্ফীতির ব্যাপক প্রভাব পড়েছে। কারণ দেশটিতে বেশির ভাগ চিকিৎসা পণ্যই আমদানি করতে হয়, যাতে সাম্প্রতিক সময়ে খরচ দুই-তিন গুণ বেড়েছে। চিকিৎসা সরবরাহের ঘাটতিও পড়েছে। এতে মিয়ানমারের মানুষ বেশ প্রভাবিত হচ্ছে।

বাত রোগে আক্রান্ত ২৯ বছর বয়সী এক নারী বলেন, ‘খরচের ভয়ে আমি বাইরে খাওয়ার নিমন্ত্রণ গ্রহণ করি না। কিন্তু ওষুধের খরচ চালাতে হচ্ছে। এজন্য জমানো স্বর্ণ ও গহনা বিক্রি করেছি।’

২০২১ সালে সেনা অভ্যুত্থানের পর মিয়ানমারব্যাপী বিক্ষোভের সূচনা হয়। ওই সময় অং সান সু চিসহ ক্ষমতাসীন দলের প্রথম সারির সব নেতা গ্রেফতার হন। তারা বিভিন্ন মেয়াদে সাজা খাটছেন বর্তমানে। তবে গণতন্ত্রপন্থীদের বদলে এখন মিয়ানমারের ক্ষমতাসীনদের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে বিদ্রোহী গ্রুপগুলো। সশস্ত্র পক্ষগুলো দেশের অনেক অংশ নিয়ন্ত্রণ করছে। গত অক্টোবর থেকে সামরিক ও জাতিগত সশস্ত্র সংগঠনগুলোর মধ্যে সংঘর্ষ বাড়তে শুরু করেছে এবং তা থেমে যাওয়ার কোনো লক্ষণ নেই।