বিশ্বে অতিধনীর সংখ্যা প্রায় তিন হাজার, তাদের হাতে রয়েছে মোট সম্পদের বড় একটি অংশ। সে তুলনায় দারিদ্র্য, বৈষম্য ও জলবায়ু সংকট মোকাবেলায় এ ধনকুবেরদের অবদান কম। উন্নত ও উন্নয়নশীল অর্থনীতির দেশগুলোর জোট জি২০-এর নেতারা মনে করেন, বৈশ্বিক সংকটগুলোয় অতিধনীদের অবদান রাখা উচিত। সরকারগুলো ধনীদের দ্রুতবর্ধনশীল সম্পদের ওপর ন্যূনতম ২ শতাংশ কর আরোপ করতে পারে। সম্প্রতি জোটভুক্ত শীর্ষ চার অর্থনীতির মন্ত্রীরা এ পরামর্শ দিয়েছেন। খবর দ্য গার্ডিয়ান।

জোটের প্রস্তাব অনুযায়ী, অতিধনীরা তাদের সম্পদের ওপর ২ শতাংশ কর দিলে এর পরিমাণ দাঁড়াবে প্রায় ২৫ হাজার কোটি পাউন্ড। কভিড-১৯ মহামারীজনিত অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে এটি হতে পারে অতিপ্রয়োজনীয় তহবিলের জোগান, যা বৈশ্বিক বৈষম্য কমাতে ব্যাপক ভূমিকা রাখবে। পাশাপাশি চলমান জলবায়ু সংকট এবং ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সামরিক সংঘাতের শান্তিপূর্ণ সমাধানের ক্ষেত্রেও অবদান রাখতে পারে।

জি২০ জোটের সদস্য দেশ ব্রাজিল, জার্মানি, দক্ষিণ আফ্রিকা ও স্পেনের নেতারা এ বিষয়ে একমত হয়েছেন। চলতি বছরের শুরুর দিকে দেশগুলোর অর্থমন্ত্রীদের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। তখন ব্রাজিলের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সে বৈঠকে কর-সংক্রান্ত এ এজেন্ডা নিয়ে আলোচনা হয়। আগামী জুনে আরেকটি বৈঠক হওয়ার কথা। সেখানে বিষয়টি বিস্তারিতভাবে আলোচনায় আসতে পারে।

জি২০ জোটের নেতারা এ প্রচারণায় যোগ দিতে অন্যান্য দেশকেও আহ্বান জানিয়েছেন। তারা বলেন, ‘‌গত বছর বিরূপ আবহাওয়ায় সৃষ্ট ক্ষয়ক্ষতির আনুমানিক খরচ মেটাতে উত্থাপিত এ অর্থ যথেষ্ট হতে পারে।’

দ্য গার্ডিয়ানকে দেয়া মন্তব্যে মন্ত্রীরা বলেন, ‘বৈষম্য মোকাবেলা ও বৈশ্বিক জনসাধারণের জানমালের নিরাপত্তায় অর্থায়নের বিষয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উদ্যোগী হওয়ার এখনই সময়।’

তারা আরো বলেন, ‘সমতা নিশ্চিত করতে সরকারগুলোর অন্যতম প্রধান উপকরণ হতে পারে করনীতি। শুধু আর্থিক সংস্থান বাড়ালেই হবে না সামাজিক সুরক্ষা, শিক্ষা ও জলবায়ু সুরক্ষায় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। একটি গতিশীল উপায়ে বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে, যাতে সমাজের প্রত্যেকে তাদের আর্থিক সক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে অর্থ প্রদান করতে পারে। একটি সমন্বতি নায্য অংশীদারত্বভিত্তিক অবদান সামাজিক কল্যাণকে ত্বরান্বিত করতে সহায়তা করে।’

ফরাসি অর্থনীতিবিদ ড্যানিয়েল জুকম্যান সম্প্রতি অতিধনীদের সম্পদ করসংক্রান্ত পরিকল্পনার একটি বিবরণ দেন। ফ্রান্স এরই মধ্যে সে পরিকল্পনায় সমর্থনের ইঙ্গিত দিয়েছে। ব্রাজিলও এতে সায় দিয়েছে। তবে বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতি যুক্তরাষ্ট্র সমর্থন না করলেও বিরোধিতা করেনি।

ড্যানিয়েল জুকম্যান বলেন, ‘সমাজের অন্যান্য শ্রেণীর তুলনায় বিলিয়নেয়ারদের ক্ষেত্রে কর দেয়ার হার সবচেয়ে কম। সর্বোচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন কোনো লোক সর্বনিম্ন হারে কর দিচ্ছে, এটাকে কেউ সমর্থন করে বলে আমি মনে করি না।’

কভিড-১৯ ও এর পরবর্তী সময়ে সম্পদ বৃদ্ধি নিয়ে সম্প্রতি এক গবেষণা প্রকাশ করেছে অক্সফাম। সেখানে দেখা যায়, ২০২০ সালের তুলনায় ২০২৩ সালের শেষে অতিধনীদের সম্পদ বেড়েছে ৩ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন ডলার বা ৩৪ শতাংশ। এদিকে বিশ্বব্যাংকের এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, কভিড-১৯ মহামারী দরিদ্র্যতার হ্রাসকে থামিয়ে দিয়েছে।

মন্ত্রীরা বলেন, ‘করনীতিটি অতিধনীদের সম্পদের ২ শতাংশের সমতুল্য ন্যূনতম কর সামনে রেখে প্রস্তুত করা যেতে পারে। তবে যারা এরই মধ্যে একটি ন্যায্য অংশ দিয়ে অবদান রেখে যাচ্ছেন, তাদের ক্ষেত্রে এ নীতি প্রযোজ্য হবে না। এছাড়া যারা আয়কর এড়াতে চেষ্টা করেন, তারা আরো বেশি অবদান রাখতে বাধ্য হবেন।’

ইউরোপের দুই বৃহত্তম অর্থনীতি জার্মানি ও স্পেন এবং উদীয়মান অর্থনীতি ব্রাজিল ও দক্ষিণ আফ্রিকার মন্ত্রীদের স্বাক্ষরিত ওই মতামতে বলা হয়েছে, এ প্রস্তাব হতে পারে অতিধনীদের ওপর কর আরোপের তৃতীয় স্তম্ভ। এর আগে বছরের শুরুতে ডিজিটাল অর্থনীতি ও বহুজাতিক কোম্পানির জন্য ন্যূনতম ১৫ শতাংশ করপোরেট ট্যাক্স প্রবর্তন করা হয়েছে।