উচ্চ শিক্ষা নিয়ে কথা বলার আগে আরো কিছু মাথায় রাখতে হবে। আপনার উচ্চ শিক্ষার মান নিয়ে কথা বলার আগে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার গুরুত্ব সম্পর্কে বলা দরকার। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষায় যদি মান না থাকে তাহলে সরাসরি উচ্চ শিক্ষার মান চার বছরে ধরে রাখা যাবে না।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট বিবেচনায় বিগত ১৫ বছরে ব্যাংক ও আর্থিক খাতে অনেক ক্ষতি হয়ে গেছে। তবে শিক্ষা খাতের ক্ষতি অপূরণীয়। ব্যাংক খাতে যে ক্ষতি হয়েছে তা হয়তো কয়েক বছরে পূরণ করা যাবে। কিন্তু শিক্ষা খাতে যে ক্ষতি হয়েছে তা পূরণ করতে কতদিন লাগবে তা বলা কঠিন। উচ্চ শিক্ষার মান বজায় রাখতে হলে প্রয়োজন দুটি জিনিস—মানসম্মত শিক্ষার্থী ও মানসম্মত শিক্ষক।

বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য পিএইচডিধারী শিক্ষক পাওয়া অনেক বড় চ্যালেঞ্জ। দ্বিতীয়ত, আমাদের মাধ্যমিক শিক্ষা থেকে যারা বিশ্ববিদ্যালয়ে আসেন তাদের মান নিয়ে প্রশ্ন আছে। তাদের শ্রেণীকক্ষে পড়াতে গিয়ে নিয়মিত হিমশিম খেতে হচ্ছে। কাজেই সেদিকটিও আমাদের ভাবা দরকার।

এবার শিক্ষকদের মান নিয়ে বলা দরকার। শিক্ষকরা সর্বাত্মক চেষ্টা করেন। তবে আমাদের পিএইচডিধারী শিক্ষকের প্রচণ্ড অপ্রতুলতা রয়েছে। তবে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়কে আমি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় বলতে চাই না, বরং বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় বলতে চাই। প্রাইভেট বললে মনে হয় কেউ যেন এর মালিক, কারোর কিছু একটা রয়েছে এখানে। কিন্তু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো একটা ট্রাস্টি বোর্ডের অধীনে চলে। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় হয় না। ইংরেজিতে এটাকে ‘নন-গভর্নমেন্ট ইউনিভার্সিটি’ বলা উচিত। সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে একটা বড় বৈষম্য আছে। সেই বৈষম্য আমরা সবসময় পাচ্ছি। এটা কিন্তু ঠিক না। কারণ এখন আমাদের অনেকগুলো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় মানসম্মত শিক্ষা দিচ্ছে। তাদের মানসম্মত গবেষক আছেন। কিন্তু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি ডিগ্রি চালুর ব্যাপারে সরকারের কাছ থেকে ইতিবাচক সাড়া পাচ্ছি না। অনেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণার সক্ষমতা আছে এবং ভালো শিক্ষক আছেন। অনেক সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ছুটি নিয়ে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াতে আসেন। তিনি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকাকালীন পিএইচডি ডিগ্রি দিতে পারবেন কিন্তু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি দিতে পারবেন না—এ ধরনের বৈষম্য দ্রুত দূর করা দরকার। আর পিএইচডি ডিগ্রির ক্ষেত্রে সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় বিবেচনায় না নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সক্ষমতা বিচার করা দরকার। পিএইচডি ডিগ্রি প্রদানের সক্ষমতা বিচারের জন্য স্বাধীন একটি কমিটি থাকা দরকার, যা আমাদের পার্শ্ববর্তী অনেক দেশেই রয়েছে। এ কমিটির কাজ হবে কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইচডি ডিগ্রির মান তদারকি করা।

C34A0129

আমাদের মানসম্মত শিক্ষায় গুরুত্ব দেয়া উচিত। মানসম্মত শিক্ষার জন্য আমাদের মানসম্মত শিক্ষকের প্রয়োজন। তবে এ মানসম্মত শিক্ষক রাতারাতি পাওয়া যাবে না। আমাদের অনেক নন-রেসিডেন্ট বাংলাদেশী (এনআরবি) বিদেশে অবস্থান করছেন। তারা মানসম্মত সম্মানী ও সামাজিক স্বীকৃতি পেলে দেশে ফিরে আসবেন। তাদের সম্মানীর বিষয়ে সরকারের সহযোগিতা প্রয়োজন। দেশের সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে হলে মানসম্মত শিক্ষক নিশ্চিত করতে হবে। মানসম্মত শিক্ষক নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করা সম্ভব হলে শিক্ষার মানের উন্নতি হবে। আমাদের আশাবাদের জায়গা হচ্ছে, আমাদের শিক্ষার্থীদের আইকিউ যথেষ্ঠ ভালো। তাদেরকে উপযুক্ত শিক্ষা দিতে পারলে তারা দেশ তথা বিশ্বের জন্য সম্পদ হয়ে দাঁড়াবে।

সবশেষে আমি এই মুহূর্তে আমাদের করণীয় সম্পর্কে বলতে চাই। আমি মনে করি, সরকারি-বেসরকারি বিভাজন ভুলে গিয়ে আমাদের মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করায় জোর দিই। সরকারি-বেসরকারি নির্বিশেষ কারা মানসম্মত শিক্ষা প্রদান করতে পারে সেদিকে দৃষ্টি দেয়া উচিত। এখানে উল্লেখ করতে চাই, বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে মঞ্জুরী কমিশনে (ইউজিসি) বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধিত্ব থাকা দরকার।এতে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে কথা বলার সুযোগ তৈরি হবে। সবাই মিলে শিক্ষার মানোন্নয়নে যদি ঐকবদ্ধ হই তাহলে অবশ্যই আমরা বাংলাদেশকে উন্নত বিশ্বের কাতারে নিয়ে যেতে পারব।

ড. মো. আবুল কাশেম মিয়া: উপাচার্য, ইউনাইডেট ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি (ইউআইইউ)

[‘উচ্চ শিক্ষায় বৈশ্বিক মান: বাংলাদেশের করণীয়’ শীর্ষক বণিক বার্তা আয়োজিত প্রথম বাংলাদেশ উচ্চ শিক্ষা সম্মেলন ২০২৪ অনুষ্ঠানে প্যানেল আলোচকের বক্তব্য]