বাংলাদেশের কৃষি খাতে, বিশেষত ধান উৎপাদনে ব্যাপক যান্ত্রিকীকরণের গল্প হরহামেশা শোনা যায়। তবে স্বীকার করতেই হবে, এসব খবর যত না উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে থাকে, তার চেয়ে অনেক কম প্রকাশ করে উদ্বেগ। আপাতদৃষ্টে ধারণা এই, কৃষিতে যান্ত্রিকীকরণ একটা অবশ্যম্ভাবী পরিণতি, যার মূলে আছে বিকল্প উপকরণ শ্রমের স্বল্পতা এবং মজুরির ঊর্ধ্বগামী প্রবণতা। কিন্তু কৃষকের সামনে যান্ত্রিকীকরণ একটা কূটাভাসের (প্যারাডক্স) জন্ম দিল: যদি কখনো এ ধরনের যান্ত্রিকীকরণ কৃষকের জন্য ফলন এবং লাভ উভয়ই বাড়িয়ে দিত তাহলে পণ্যের যথাযথ মূল্য থেকে বঞ্চিত হয়ে কৃষককে যন্ত্রণায় ভুগতে হতো না। অভিযোগ আছে যে, তারা নিম্নমুখী মার্জিন নিয়ে মাঝেমধ্যে মহাবিপদে পতিত হয়।

তবে সাম্প্রতিক এক গবেষণায় ক্রমবর্ধমান যান্ত্রিকীকরণ এবং উৎপাদন থেকে কৃষকের ভাগ্যের নাজুক পরিস্থিতি যথেষ্টভাবে পর্যালোচনা করা হয়েছে। ইন্টারন্যাশনাল ফুড পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (ইফ্রি) এক দল গবেষক, যার মধ্যে আছেন আখতার আহমেদ, মেহরাব বখতিয়ার, বেন বেল্টন, রুহুল আমিন তালুকদার, আমিনুল করিম এবং রাইসা শাম্মা— বাংলাদেশের কৃষি যান্ত্রিকীকরণের অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ অন্তর্দৃষ্টি দেয়ার চেষ্টা করেছেন। বাংলাদেশের কৃষি যান্ত্রিকীকরণের অবস্থার ওপর ওই গবেষণার সামগ্রিক লক্ষ্য ছিল কৃষি খাতে যান্ত্রিকীকরণ সহায়তা কর্মসূচির প্রভাব এবং এর কার্যকারিতা মূল্যায়ন করা। 

দুই.

গবেষকরা আলোচনার সূত্রপাত ঘটান ২০০৫-২২ সময়কালে কৃষি শ্রমশক্তির অংশগ্রহণ হ্রাস এবং ২০১০-২২ সময়কালে কৃষিতে প্রকৃত মজুরি তির্যক ঊর্ধ্বমুখী বৃদ্ধির পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে। এটা আজ সুবিদিত যে, গ্রামাঞ্চলে নানা কারণে শ্রমস্বল্পতার তীব্র সংকট সৃষ্টি হচ্ছে। যা-ই হোক, সময়ের আবর্তনে বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক যান্ত্রিকীকরণ নীতির একটি সংক্ষিপ্ত ক্রমিক ইতিহাসও উপস্থাপন করে তারা আলোচনায় ভিন্ন মাত্রা যোগ করেন। দু-একটা উদাহরণ দেয়া যাক: (ক) যান্ত্রিক সেচ গ্রহণকল্পে (১৯৭০-৯০) সরকার সেই সময় যেসব পদক্ষেপ নেয় তার মধ্যে ছিল উপকরণ বাজারের উদারীকরণ; যন্ত্রপাতির আমদানি শুল্ক দূর করা; একাধিক ইঞ্জিন এবং পাম্প ব্র্যান্ড এবং আকার এবং খুচরা যন্ত্রাংশ বাজারে প্রবেশ করে মেরামত কর্মশালার বিস্তার ইত্যাদি। (খ) যান্ত্রিক চাষ গ্রহণ (১৯৯০-২০০৫) উৎসাহিত করার লক্ষ্যে ২ ডব্লিউটি (১৯৯৫)-এর জন্য আমদানি শুল্ক মুক্তকরণ; এসএমই মেটাল ওয়ার্কশপের বিস্তার লাভ; যন্ত্রপাতি ভাড়া বাজার এবং স্থানীয় পরিষেবা প্রদানকারীর লভ্যতা বৃদ্ধি এবং (গ) (২০০৫) সময়কালে যান্ত্রিক মাড়াই গ্রহণে নির্বাচিত যন্ত্রপাতি (কম্বাইন, ট্রান্সপ্লান্টার ইত্যাদি) ক্রয়ে লক্ষ্যযুক্ত সরকারি প্রণোদনা; যান্ত্রিকীকরণ পিছিয়ে রয়েছে এমন ক্ষেত্রে বিশেষ বিবেচনা ইত্যাদি। 

স্মরণীয় যে, সরকার কর্তৃক উদার নীতিমালা গ্রহণ সত্ত্বেও বিভিন্ন কারণে উপকূলীয় এবং হাওর অঞ্চলের সঙ্গে মেশিন ব্যবহারে একটি বড় আঞ্চলিক তারতম্য রয়েছে, যা ন্যূনতম যান্ত্রিকীকরণের সাক্ষী। যা-ই হোক, বিবেচিত মেশিনের মধ্যে আছে পাওয়ার পাম্প, সিডার, পাওয়ার টিলার, ট্রাক্টর, থ্রেসার প্রভৃতি। আরো দেখা গেছে, উপকূলীয় অঞ্চল এবং উত্তর-পূর্বে মালিকানার সর্বনিম্ন স্তর (সরকারি যান্ত্রিকীকরণ অগ্রাধিকারের ফোকাস), পশ্চিম এবং উত্তর-পশ্চিমে মেশিনের মালিকানার সর্বোচ্চ স্তর (উচ্চ ফসলের তীব্রতাসহ জেলা) এবং পশ্চিম ও উত্তর পশ্চিমাঞ্চলে ছোট আকারের যন্ত্রপাতি উৎপাদনের হাব আবির্ভূত হয়েছে।

তিন.

আগেই বলা হয়েছে, সরকার বিভিন্ন প্রণোদনার মাধ্যমে যান্ত্রিকীকরণে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে, বিশেষ করে যন্ত্রপাতি আমদানিতে উদার বাণিজ্যনীতি গ্রহণের মাধ্যমে। উদাহরণস্বরূপ, প্রথম পর্বে (২০০৫-১২) ছিল পাওয়ার থ্রেসার, রিপার স্প্রেয়ার, পাওয়ার টিলার, সিডার, উইডার, ড্রায়ার, পাওয়ার উইনোয়ার, স্প্রিংকলার সেচ সেট ইত্যাদি ক্রয়ে ৩০ শতাংশ প্রণোদনা। দ্বিতীয় পর্বে (২০১২-১৯) সরকার মঞ্জুর করেছে ৫০-৭০ শতাংশ প্রণোদনা পাওয়ার থ্রেসার, রিপার, স্প্রেয়ার (ফুট পাম্প), কম্বাইন হারভেস্টার, রাইস ট্রান্সপ্লান্টার কেনার জন্য এবং তৃতীয় পর্বে (২০১৯) সরকার ৫০-৭০ শতাংশ প্রণোদনা প্রদান করেছে পাওয়ার থ্রেসার রিপার স্প্রেয়ার (পাওয়ার থ্রেসার) ফসল কাটার সমন্বিত রাইস ট্রান্সপ্লান্টার সিডার/বেড প্লান্টার, পাওয়ার উইডার, ড্রায়ার, ভুট্টার খোসা, আলু খননকারী, আলুর চিপ মেকার, গাজর ধোয়ার যন্ত্র ইত্যাদি ক্রয়ের জন্য।

চার.

সরকারি এ প্রণোদনার ফলস্বরূপ ২০০৮ ও ২০১৯ থেকে মেশিনের মালিকানা বেড়েছে; কিন্তু খুব কম ভিত্তি থেকে। আবার ক্ষুদ্র মালিকদের মধ্যে কৃষি যন্ত্রপাতির মালিকানা বেড়েছে, কিন্তু বৃহত্তর খামারগুলোর মধ্যে যন্ত্র কেন্দ্রীভূত রয়েছে এবং মজার কথা কৃষকদের ব্যবহৃত ৮৪-৯৮ শতাংশ কৃষি মেশিন ভাড়া দেয়া হয়। উদাহরণস্বরূপ ২০১৮ সাল পর্যন্ত চাষাবাদ ৭৮-৯৮ শতাংশ চাল উৎপাদনকারী চাষী ধান মাড়াই এবং অন্যান্য কৃষি পদ্ধতি যান্ত্রিকীকরণের জন্য মেশিন ভাড়া করে থাকে বলে জানতে পারি। এর অর্থ হলো গ্রামীণ এলাকায় কৃষি মেশিনের জন্য একটি বড় ভাড়ার বাজার গড়ে উঠেছে।

রিগ্রেশন বিশ্লেষণের মাধ্যমে গবেষকরা যান্ত্রিকীকরণের প্রভাবে পৌঁছেছেন (২০১১-১৮)। যেমন মাড়াইয়ের বেলায় মাড়াই থেকে সামান্য ফলন লাভ (শস্যের ক্ষতি হ্রাস), মাড়াই থেকে শ্রম বাঁচানো, মাড়াই থেকে শ্রম উৎপাদনশীলতায় সামান্য বৃদ্ধি এবং মাড়াইয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত লাভের কোনো বৃদ্ধি নেই (ভাড়ার খরচ শ্রম সঞ্চয়/ফলন বৃদ্ধিকে অফসেট করতে পারে)। অন্যান্য মেশিনের ক্ষেত্রে প্রভাব নিম্নরূপ: সমীক্ষার সময়কালে যান্ত্রিক ভূমি প্রস্তুতি থেকে কোনো ফলন, শ্রম বা লাভজনকতা লাভ হয় না (প্রত্যাশিত হিসেবে) এবং এই মেশিনগুলো ব্যবহারের পেছনে যুক্তির প্রধান অংশ সুবিধা, গতি এবং কঠোর পরিশ্রম এড়ানো বলে মনে হয়।

অন্যদিকে ২০১১-১৮ সময়ে মজুরির হার সময়ের সঙ্গে ক্রমবর্ধিষ্ণু ওপরের দিকে উঠছে এবং বিভিন্ন উপসময়ে ১৬-৩০ শতাংশ পর্যন্ত মজুরি বেড়েছে, কিন্তু ধানের দাম ক্রমাগত নিম্নমুখী; সময়ে সময়ে ১৮-২৯ শতাংশ হ্রাস। সম্ভবত সেই জন্য বোরো চাষের জন্য প্রকৃত মোট মার্জিন (স্থির ২০১১ মূল্য) ২০১১-১৮-এর মধ্যে প্রতি একরে প্রায় ১৮ হাজার থেকে প্রায় ৭ হাজার টাকায় এবং নিট মার্জিন (সুযোগ খরচসহ) ১০ হাজার থেকে কমে ৮-এ নেমে এসেছে। পর্যবেক্ষণটি খুবই তাৎপর্যপূর্ণ—এটি আপাতদৃষ্টিতে দেখায় যে, সেচের যান্ত্রিকীকরণ, জমি তৈরি এবং মাড়াই কৃষকদের অর্থনৈতিক কর্মক্ষমতা উন্নত করার জন্য অপর্যাপ্ত। একই সময়ে পর্যবেক্ষণটি পরামর্শ দেয় যে, কৃষকের সার্বিক লাভালাভের জন্য এতকাল ব্যাপকভাবে অযান্ত্রিক থাকা শ্রমনিবিড় কাজগুলোর (রোপণ ও ফসল তোলা) যান্ত্রিকীকরণের প্রয়োজন হবে।

গবেষকরা যুক্তি দেখিয়েছেন, সবচেয়ে শ্রমঘন হলো রোপণ ও মাড়াই, যেখানে যন্ত্রের কোনো অনুপ্রবেশের প্রমাণ নেই এবং এক্ষেত্রে শ্রমের উচ্চ মজুরির কারণে কৃষকের মুনাফা হ্রাস পায়। উদাহরণস্বরূপ ২০১৮ সালে মাত্র শূন্য দশমিক ১ শতাংশ ধানচাষী রোপণের জন্য এবং শূন্য দশমিক ৯ শতাংশ ফসল কাটার জন্য যন্ত্র ব্যবহার করেছিলেন।

সুতরাং যতক্ষণ না ধানের ফসল উৎপাদনের সবচেয়ে শ্রমনিবিড় অংশগুলো, যেমন রোপণ ও কাটার মতো যান্ত্রিকীকরণ না হয়, যান্ত্রিকীকরণ ও যন্ত্রণার বিরোধী অবস্থান খুব কমই সমাধান করা যায় এবং সব প্রচেষ্টা সেদিকে নিক্ষেপ করা উচিত।

গবেষকদের মতে, উদীয়মান নীতিগত বিবেচনার বিষয়গুলো নিম্নরূপ: কৃষি যন্ত্রপাতিতে ক্ষুদ্র চাষীদের প্রবেশাধিকারের জন্য ভাড়ার বাজার হচ্ছে প্রধান উৎস; ছোট যন্ত্রপাতির চেয়ে বড় যন্ত্র অনেক বেশি ব্যয়বহুল; গ্রামাঞ্চলে ব্যাংকগুলোর সীমিত উপস্থিতি, ক্রেডিট ইতিহাসের অভাব, ভাড়া পরিষেবা ব্যবসার কার্যকারিতা বোঝার অভাবের কারণে ব্যাংকগুলো ঋণ প্রদানে দ্বিধাবোধ করে; আমদানিকারক ও নির্মাতাদের ক্রেডিট প্রসারিত করার (বা প্রাপ্তির) ক্ষমতা সীমিত; বর্তমান যান্ত্রিকীকরণ নীতি মেশিনের মালিকানা হস্তান্তর নিষিদ্ধ করে; ব্যাংকের মাধ্যমে কোনো ভাড়া-ক্রয় ঋণ নেই (অন্যান্য দেশে প্রচলিত); খুচরা যন্ত্রাংশসহ চ্যালেঞ্জ রয়েছে অত্যাধুনিক মেশিনের রক্ষণাবেক্ষণে; এবং কিছু দক্ষ অপারেটর, মেকানিকস, সামান্য প্রশিক্ষণ।

উপসংহারে, লেখকরা কতগুলো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পর্যবেক্ষণ করেন, যেমন গ্রামীণ শ্রমবাজার তেজি হয়ে যাওয়া এবং খাদ্যশস্যের মূল্যহ্রাসের কারণে দীর্ঘমেয়াদে চাষের লাভজনকতা হ্রাস (প্রাক-২০২২); সেচ, জমি তৈরি এবং মাড়াইয়ে উচ্চ মাত্রার যান্ত্রিকীকরণ; উৎপাদনশীলতা লাভ বা খরচ সঞ্চয়ের জন্য সীমিত সুযোগ; যান্ত্রিকীকরণ করে ফসল কাটা এবং রোপণের শ্রমের সীমাবদ্ধতা হ্রাস, উৎপাদনশীলতা উন্নত, শ্রমমুক্ত করে খরচ কমানোর সম্ভাবনা রয়েছে। 

বর্তমান প্রেক্ষাপটে কৃষিতে যান্ত্রিকীকরণই পারে কৃষকের যন্ত্রণা লাঘব করতে। উচ্ছ্বাস আছে অপেক্ষাকৃত কম শ্রমঘন চাষাবাদ ও ফসল মাড়াইয়ে যন্ত্রের ব্যবহার দেখে, কিন্তু উদীয়মান উদ্বেগ শ্রমনিবিড় রোপণ ও ফসল মাড়াইয়ের মাঠে যন্ত্রের খুব কম উপস্থিতির কারণে। উদ্বেগের পেছনে উদ্বেগ হচ্ছে শেষোক্ত যন্ত্রগুলো বিশাল এবং অত্যন্ত ব্যয়বহুল। তাছাড়া সেচ-যন্ত্রের মতো বহুবিধ ব্যবহারের অনুপস্থিতি অর্থনৈতিক লাভালাভকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে। বড় কথা হচ্ছে, বাংলাদেশের কৃষি এখন প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষকের হাতে, যাদের পক্ষে এমন সাদা হাতি পোষা কষ্টকর। সুতরাং মালিকানা প্রশ্নটির সুরাহা করাও জরুরি। তবে যে যা বলিস ভাই, কৃষিতে যান্ত্রিকীকরণ বিহনে উপায় নাই।

আব্দুল বায়েস: সাবেক উপাচার্য, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়