দেশে ডেঙ্গু পরিস্থিতির ক্রমেই অবনমন ঘটছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, গতকাল সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত, ২৮ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। আর ডেঙ্গুতে আক্রান্তের সংখ্যা ছাড়িয়েছে ৫০ হাজারে। এর আগে ৫ অক্টোবর পর্যন্ত ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে অন্তত নয়জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিল কমপক্ষে ১ হাজার ৪২ জন, যা চলতি বছরের একদিনে সর্বোচ্চ ছিল। সব মিলিয়ে চলতি বছর ডেঙ্গুতে এ পর্যন্ত ২১৫ জনের মৃত্যু হয়েছে।

সরকারিভাবে সর্বপ্রথম ২০০০ সালে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাবের কথা স্বীকার করা হয়। এ সময় ডেঙ্গুকে বলা হতো বর্ষাকালের রোগ। আগস্টে এতে সর্বোচ্চ সংক্রমণ ও মৃত্যু হতো। আবার একসময় ডেঙ্গু কেবল ঢাকায় সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু কালক্রমে এটি কেবল বর্ষাকাল বা ঢাকায় সীমাবদ্ধ থাকেনি। পুরো দেশে ছড়িয়ে পড়ে এবং ২০২১ সাল থেকে ডেঙ্গুর সংক্রমণে নতুন বৈশিষ্ট্য পরিলক্ষিত হয়। এ বছর থেকে সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরে হাসপাতালে সবচেয়ে বেশি ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হতে দেখা যায়। সেই সঙ্গে মৃত্যুর সংখ্যাও এ সময় বেড়ে যায়।

বর্তমানে আগস্ট থেকে অক্টোবর, বর্ষা ও বর্ষা পরবর্তী সময়কে ডেঙ্গুর ভরা মৌসুম ধরা হয়। দেশের ইতিহাসে ডেঙ্গুতে সর্বোচ্চ সংক্রমণ ও মৃত্যু হয় ২০২৩ সালে। সে বছর ৩ লাখ ২১ হাজার ১৭৯ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয় এবং মৃত্যু হয় ১ হাজার ৭০৫ জনের। এর মধ্যে কেবল সেপ্টেম্বরে ডেঙ্গুতে সবচেয়ে বেশি ৩৯৬ জনের মৃত্যু হয়েছিল। আর একই সময়ে ডেঙ্গু নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিল ৭৯ হাজার ৫৯৮ জন। গত বছরের সেপ্টেম্বর-অক্টোবরেও ডেঙ্গু সংক্রমণ ও মৃত্যুর হার ছিল ঊর্ধ্বমুখী। এমনকি ঋতুবৈচিত্র্যগত কারণে নভেম্বর থেকে ডেঙ্গুর প্রকোপ স্বাভাবিকভাবেই কমার কথা থাকলেও এ মাসেও এ হার ঊর্ধ্বমুখী ছিল। এদিকে চলতি বছরের সেপ্টেম্বরেও সবচেয়ে বেশি ৭৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। গত বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর মাসের তুলনায় এ বছরের একই সময়ে ডেঙ্গুতে আক্রান্তের সংখ্যা বেড়েছে ৫৩ শতাংশ। সেই সঙ্গে মৃত্যুর হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৬ দশমিক ৯৫ শতাংশে। তবে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, বাস্তবে এ হার আরো বেশি। কেননা হাসপাতাল থেকে নেয়া তথ্য দিয়ে কেবল ডেঙ্গুতে মৃত্যুর হিসাব করা হয়েছে। এর বাইরে অনেকেরই মৃত্যু হচ্ছে ডেঙ্গুতে, যাদের হাসপাতালে চিকিৎসা দেয়া হয়নি।

দীর্ঘকাল ধরে এমন পরিস্থিতির পরও সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্তদের ডেঙ্গু প্রতিরোধে কার্যকর উদ্যোগ নিতে না পারাটা হতাশাজনক। সেই সঙ্গে এ পরিস্থিতি তাদের দায়িত্ব পালনে অবহেলারও প্রতিফলন। বছর বছর একেকটা ডেঙ্গু সিজন আসছে এবং তাতে জনগণের শারীরিক ভোগান্তি বাড়ছে, মৃত্যুর হার বাড়ছে। সেই সঙ্গে উচ্চ মূল্যস্ফীতির সময়ে স্বাস্থ্য খাতে জনগণের পকেট ব্যয়ও বেড়ে চলেছে। অন্যদিকে হাসপাতালগুলোয় রোগীর চাপ বাড়ছে। বেড না পেয়ে অনেক হাসপাতালে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে সেবা নিতে দেখা যায় রোগীদের।

ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব কোন সময়ে বা কেন দেখা যায়, তা দায়িত্বপ্রাপ্তদের অজানা থাকার কথা নয়। সঠিকভাবে কীটনাশক প্রয়োগ না করা, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, পানি নিষ্কাশন সমস্যা ও আবহাওয়ার প্রভাবে মশার বংশবিস্তার হচ্ছে। পাশাপাশি অপর্যাপ্ত সরকারি উদ্যোগ বিভিন্ন সংস্থার সমন্বয়হীনতা ও ফগিংনির্ভর মশা নিধনের ভ্রান্ত ধারণাও এর জন্যও দায়ী। তাছাড়া প্রতি বছর ডেঙ্গু পরিস্থিতি বুঝতে তিন দফায় এডিস মশার জরিপ করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগনিয়ন্ত্রণ শাখা।

প্রথম জরিপটি পরিচালনা করা হয় প্রাক-বর্ষা মৌসুমে, যাতে পিক সিজনে ডেঙ্গু পরিস্থিতি মোকাবেলায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া যায়। এ বছরও প্রাক-বর্ষা জরিপ হয়েছে। সে জরিপের তথ্য মোতাবেক কীটতত্ত্ববিদরা সতর্ক করেছিলেন এ বছর ডেঙ্গুর কারণে সারা দেশে বড় ধরনের স্বাস্থ্য সংকট দেখা দিতে পারে। বিশেষত গত জানুয়ারি থেকেই দেশের বিভিন্ন জেলায় এডিস মশার লার্ভার অস্বাভাবিক বেশি ঘনত্ব পাওয়া যায়। যে কারণে তাদের আশঙ্কা ছিল কার্যকর ডেঙ্গু ব্যবস্থাপনা ছাড়া এ বছরও এর সংক্রমণ উদ্বেগজনক হারে বাড়বে। কীটতত্ত্ববিদদের সুপারিশ ছিল, ডেঙ্গুর হটস্পটগুলোয় মশা নিধন ও দেশের সর্বত্র এর প্রজনন উৎসগুলো ধ্বংসে কাজ করতে হবে। কিন্তু সরকার ও সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্তদের কেউ সফল উদ্যোগ নিতে পারেনি। এ বছরের মার্চ ব্যতীত প্রতি মাসেই ডেঙ্গুতে মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। জানুয়ারিতে ১০, ফেব্রুয়ারিতে তিন, এপ্রিলে সাত, মে মাসে তিন, জুনে ১৯, জুলাইয়ে ৪১, আগস্টে ৩৯ ও সেপ্টেম্বরে ৭৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। বর্তমানে রাজধানীসহ পুরো দেশের ডেঙ্গু পরিস্থিতি উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। প্রাক-বর্ষা জরিপ অনুযায়ী, ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের ১৩টি ওয়ার্ডকে ডেঙ্গুর উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সাতটি এবং ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ছয়টি ওয়ার্ড রয়েছে। জরিপে আরো বলা হয়েছে, মশার প্রজনন উৎস হিসেবে সিমেন্টের পানির ট্যাংক সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ (২২ শতাংশ)। দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে মেঝেতে জমে থাকা পানি। অন্যান্য প্রজনন উৎসের মধ্যে রয়েছে প্লাস্টিকের ড্রাম, ওয়াটার মিটার চেম্বার, প্লাস্টিকের বালতি, ফুলের টব ও ট্রে/প্লাস্টিকের পাইপের গর্ত, পরিত্যক্ত টায়ার, বাড়ির ভেতরের পানির চ্যানেল ইত্যাদি। আর এডিস মশার লার্ভার সবচেয়ে বেশি ঘনত্ব (৫৮ দশমিক ৮৮ শতাংশ) পাওয়া গেছে বহুতল ভবনগুলোয়।

এসব তথ্য থাকার পরও নেই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা। কীটতত্ত্ববিদরা দীর্ঘকাল ধরেই বলে আসছেন পূর্ণাঙ্গ মশা মারার চেয়ে মশার লার্ভা নির্মূল করা ডেঙ্গু প্রতিরোধের সহজ উপায়। কিন্তু সরকারের মশা নিধনের দিকে মনোযোগ নেই, লার্ভা নির্মূলের দিকেও নজর নেই। ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব বাড়তে থাকলে সরকারকে নানা উদ্যোগ নিতে দেখা যায়, কিন্তু সেগুলো আর কাজে আসে না। ডেঙ্গুর সাধারণত চারটি ধরন রয়েছে। প্রথমবার ডেঙ্গু আক্রান্ত হলে তেমন আতঙ্কের কিছু নেই। দ্বিতীয়বারও ভাইরাসের একই ধরনে আক্রান্ত হলেও ভয়ের কিছু নেই। তবে কেউ যদি প্রথমবার একটি ধরন এবং দ্বিতীয়বার ভিন্ন ধরনে আক্রান্ত হয় তাহলে মৃত্যুঝুঁকি বেড়ে যায়। এক্ষেত্রে মৃত্যুঝুঁকি কমানোর জন্য প্রয়োজন ভাইরাস নিয়ে কাজ করা। কেউ যদি আগে থেকে জানতে পারে এবার ভাইরাসের কোন টাইপের প্রকোপ বেশি বা কোন এলাকায় কোন টাইপ ছড়াচ্ছে, তাহলে ডেঙ্গুতে মৃত্যু প্রতিরোধ করা যাবে। কিন্তু এ ধরনের কোনো কাজও পরিলক্ষিত হয় না। এজন্য প্রয়োজন বিস্তর গবেষণা ও তথ্য-উপাত্ত। প্রয়োজনীয় তথ্যের অভাবেও ডেঙ্গুতে মৃত্যুর হার ঊর্ধ্বমুখীই থেকে যাচ্ছে। বিভিন্ন মাধ্যমে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, দক্ষিণ এশিয়ায় ডেঙ্গুতে সর্বোচ্চ মৃত্যুহার বর্তমানে বাংলাদেশে, আর বিশ্বব্যাপী মৃত্যুহারের দিক থেকে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে এ দেশ। বর্তমানে ডেঙ্গু প্রতিরোধে জাতীয় পর্যায়ে যে অনীহা পরিলক্ষিত হচ্ছে তা চলমান থাকলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশ এ তালিকার শীর্ষে চলে আসতে পারে। তবে এক্ষেত্রে জনগণের সচেতনতাও যে গুরুত্বপূর্ণ, সে কথাও অস্বীকার করার উপায় নেই।