বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনা এবং দুর্ঘটনায় মানুষের মৃত্যু নিত্য-নৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর কারণ বিদ্যমান সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮-এর কোনো ফলপ্রসূ ও কার্যকর প্রয়োগ নেই। যদিও ২০১৮ সালে তরুণ শিক্ষার্থীদের নিরাপদ সড়কের দাবিতে এ আইন প্রণীত হয়েছিল। পুরনো আইন সংশোধন করে এ আইনে অপরাধের দণ্ডের মাত্রা বাড়ানোসহ বেশকিছু কঠোরতা আরোপ করা হয়েছিল। আশা ছিল, এ আইনের যথাযথ প্রয়োগের মাধ্যমে সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানো যাবে, মৃত্যুর মিছিল কমে আসবে। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির বার্ষিক দুর্ঘটনা পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত বছর সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে ৬ হাজার ২৬১টি। এতে প্রাণ হারান ৭ হাজার ৯০২ জন এবং আহত হয়েছেন ১০ হাজার ৩৭২ জন। বিদ্যমান আইনের প্রয়োগ নিশ্চিত না করে সম্প্রতি এ আইনের অন্তত ১২টি ধারায় পরিবর্তন আনা হয়েছে। যেখানে অধিকাংশ ধারায় চালক ও চালকের সহকারীদের জেল জরিমানা ও শাস্তি কমানো হয়েছে। পাশাপাশি যানবাহনের বীমা বাধ্যতামূলক করা, সুপারভাইজার সংযুক্ত করা ও গণপরিবহনে ভাড়ার চার্ট প্রদর্শন অথবা নির্ধারিত ভাড়ার অতিরিক্ত ভাড়া দাবি বা আদায়সংক্রান্ত ধারা লঙ্ঘনের দণ্ড আলাদাভাবে করা হয়েছে। এরই মধ্যে প্রস্তাবিত সড়ক পরিবহন সংশোধন আইন-২০২৪-এর খসড়া নীতিগত অনুমোদনও দিয়েছে মন্ত্রিসভা। বণিক বার্তার প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এ চিত্র। বিদ্যমান আইনের বাস্তবায়ন যেখানে হয়নি, সেখানে সংশোধনীতে শিথিলতা আগামীতে সড়ক দুর্ঘটনা বাড়াবে বলে আশঙ্কা রয়েছে।
সড়ক পরিবহন খাতের মালিক ও শ্রমিকদের সংগঠনগুলো শুরু থেকেই বিদ্যমান আইনের বিরোধিতা করে এসেছে। কেননা তা তাদের স্বার্থের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) সাম্প্রতিক গবেষণায় পরিবহন মালিক-শ্রমিক পক্ষের হাতে সড়ক ব্যবস্থাপনার জিম্মি দশার প্রকটতা উঠে আসে। টিআইবির মতে, সংশোধনী চূড়ান্ত অনুমোদন পেলে তা আত্মঘাতমূলক নৈরাজ্য বাড়াবে। নিরপাদ সড়ক নিশ্চিত করাই সড়ক পরিবহন আইনের একমাত্র লক্ষ্য হওয়া উচিত। নয়তো সড়কে বিশৃঙ্খলা, দুর্ঘটনা, মৃত্যু— কোনোটাই নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভবপর নয়। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে দেশের উন্নয়নেও। দেশের যোগাযোগ খাত, বিশেষত সড়কপথ যদি নিরাপদ না হয়, তাহলে ব্যবসায়ের গতি কখনো বাড়ানো সম্ভব হবে না। দেশী ও বিদেশী বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে ব্যর্থ হবে দেশ। সড়ক দুর্ঘটনায় আর্থসামাজিক ক্ষতির হিসাব তৈরি করেছে বুয়েটের সড়ক দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউট (এআরআই)। সেখানে দেখা গেছে, ২০১৮ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত তিন বছরে সড়ক দুর্ঘটনায় আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ১ লাখ ৯ হাজার কোটি টাকা। আর রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্যমতে, গত বছর সড়ক দুর্ঘটনায় মানবসম্পদের যে ক্ষতি হয়েছে, তার আর্থিক মূল্য ১৮ হাজার কোটি টাকার বেশি। এজন্য সড়ককে নিরাপদ ও উন্নত করতে হবে। অর্থনীতির পাশাপাশি মানবিক দিকও সরকারকে বিবেচনা করতে হবে। সড়কে অকালমৃত্যু কখনো কাম্য নয়। সড়ক দুর্ঘটনায় সবচেয়ে মৃত্যু বেশি শিক্ষার্থীদের। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে সড়কে ১ হাজার ২৩৭ জন শিক্ষার্থীর মৃত্যু হয়েছে। দিনে অন্তত তিনজন শিক্ষার্থীর প্রাণ গেছে সড়কে। যদি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নিরাপদ সড়ক ব্যবস্থা তৈরি করা না যায় তাহলে এক সময় মানবসম্পদে ঘাটতি দেখা দেবে, অর্থনৈতিক উন্নয়ন টেকসই হবে না।
বিশ্বের প্রথম সারির উন্নত পরিবহন ব্যবস্থার কথা বলতে গেলে সিঙ্গাপুরের নামটি সামনে চলে আসে। সিঙ্গাপুরে পরিবহন ব্যবস্থা আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে ল্যান্ড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি গঠিত হয় ১৯৯৫ সালে। এক দশকের ব্যবধানে সংস্থাটি দেশটির পরিবহন ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আনে। গ্রাহক সন্তুষ্টির দিক থেকে সিঙ্গাপুরের পরিবহন ব্যবস্থা বিশ্বে প্রথম সারিতে। এশিয়ার মধ্যে চীন, জাপান, দুবাই, ইউরোপের সুইডেন, জার্মানি, ফ্রান্স, ইতালি প্রভৃতি দেশের পরিবহন ব্যবস্থা বিশ্বে আদর্শ। প্রতিটি দেশই নিরাপদ যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। দেশগুলোয় সংশ্লিষ্ট আইনটি অত্যন্ত শক্তিশালী। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো আইন বাস্তবায়নে তাদের প্রশাসন খুবই কঠোর, কোনো ছাড় দেয়া হয় না। অথচ বাংলাদেশের চিত্র এর উল্টো। একদিকে আইনের বাস্তবায়ন নেই, অন্যদিকে সড়কে ঘুস প্রদান ও গ্রহণের প্রবণতা রয়েছে অধিকাংশের। সড়ক পরিবহন আইন কেবল কাগজ-কলমে সীমাবদ্ধ। প্রভাবশালী ও সবলদের ওপর আইন প্রয়োগ না করে কেবল দুর্বলের ওপর আইন প্রয়োগ করা হয়। এছাড়া ছোট যানবাহনের আধিক্যের কারণে সড়ক পরিবহন নেটওয়ার্ক ভেঙে পড়ছে। উন্নত দেশে গণপরিবহনকে প্রাধান্য দেয়া হয়, আর আমাদের দেশে ছোট যানবাহনকে প্রাধান্য দেয়া হচ্ছে। সড়কে দুই ও তিন চাকার গাড়ির সংখ্যা বাড়ছে। মানুষের মাঝেও নেই পথ পারাপারে নিয়মাবলির সচেতনতা। বেশির ভাগ যাত্রীই রাস্তা পারাপারের সময় ফুট ওভারব্রিজ ব্যবহার করে না। একদিকে গাড়ির বেপরোয়া গতি, বিপজ্জনক ওভারটেকিং, রাস্তা নির্মাণে ত্রুটি, ফিটনেসবিহীন যানবাহনের অবাধে চলাচল, চালকের অদক্ষতা ও বেপরোয়া মনোভাব, অন্যদিকে যাত্রী ও পথচারীদের অসতর্কতা— সব মিলিয়ে বর্তমানে দেশের সড়ক ব্যবস্থা নড়বড়ে হয়ে পড়েছে।
সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে যেসব আইনি ব্যবস্থা রয়েছে তা বাস্তবায়ন করতে হবে। তাহলে সড়কে ফিটনেসবিহীন গাড়ি, অদক্ষ চালক, বেপরোয়াভাবে গাড়ি চালানো, দুর্নীতি সমস্যা মোকাবেলা করা সম্ভব। দেশের সড়ক-মহাসড়কে প্রয়োজনীয় রোড সাইন (ট্রাফিক চিহ্ন) স্থাপন ও জেব্রা ক্রসিং অঙ্কন করার পাশাপাশি পথচারীদের তা মানতে বাধ্য করতে হেবে। গাড়িচালকদের দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণের পাশাপাশি নৈতিক শিক্ষায় শিক্ষিত করা আবশ্যক। সর্বোপরি সড়ক দুর্ঘটনায় আর্থিক সহায়তা তহবিল গঠনপূর্বক হতাহতদের দ্রুত উন্নত চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের সুব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
বিশ্বে সড়ক নিরাপত্তায় সবচেয়ে এগিয়ে থাকা কয়েকটি উন্নত দেশের মধ্যে রয়েছে নরওয়ে, সুইজারল্যান্ড, সুইডেন, যুক্তরাজ্য ও জাপান। দেশগুলোয় সড়ক দুর্ঘটনা ও মৃত্যুহার লক্ষণীয়ভাবে কম। উন্নয়নশীল দেশ থাইল্যান্ড, ওমান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, তাইওয়ানসহ অনেক দেশ সড়ক নিরাপত্তায় উন্নতি সাধন করেছে। এটা সম্ভব হয়েছে উন্নত ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার উন্নয়ন, ট্রাফিক আইনের কঠোর প্রয়োগ, চালক-যাত্রী নির্বিশেষে ট্রাফিক শৃঙ্খলা সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং সার্বক্ষণিক নজরদারির মাধ্যমে। আমাদেরও উচিত এসব মডেল অনুসরণ করে উন্নত ও নিরাপদ সড়ক ব্যবস্থা গড়ে তোলা।










