তিনি বলেন, কাজ এখন আর আগের মতো মানুষের জীবনে স্থিতি এনে দেয় না। মানুষ কঠোর পরিশ্রম করেও পরিবারের জন্য খাবার জোগাতে পারে না, সন্তানের স্কুলের পোশাক কিনতে পারে না, শীতের দিনে ঘর গরম রাখতে পারে না, এমনকি যে পেনশনের আশায় সারা জীবন কাজ করেছে, সেটার ওপর নির্ভর করেও বাঁচতে পারে না।

স্পেন্সার যে দুর্দশার কথা বলেছেন, তা এক দশকের বেশি সময় ধরে আমি যে আর্থিক অনিরাপত্তার সূচক নিয়ে কাজ করেছি, তার সঙ্গে গভীরভাবে মিলে যায়। সবকিছু একসঙ্গে বিবেচনা করলে স্পষ্ট হয়, ইউরোপজুড়ে ডান ও বাম—উভয় ধারার জনতুষ্টিবাদের উত্থানের পেছনে অর্থনৈতিক চাপই কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করছে।

গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, স্পেন্সারের বক্তব্য কেবল চরম দারিদ্র্য বা ভয়াবহ কষ্টের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি আরো সাধারণ অথচ গভীরভাবে অনুভূত হয় এমন এক ধরনের আর্থিক অনিরাপত্তার কথাও বলেছেন—যেমন জীবনে কোনো দিন ছুটি কাটাতে যাওয়ার স্বপ্নও দেখতে না পারা। এ চাপ এখন আর শুধু দরিদ্রতম পরিবারগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; ইউরোপের মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মধ্যেও তা ক্রমেই সাধারণ হয়ে উঠছে।

ব্রেক্সিট এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রথম নির্বাচনী জয়ের প্রায় এক দশক পরও রাজনৈতিক অসন্তোষকে এখনো প্রায়ই এক ক্ষুব্ধ, সোচ্চার সংখ্যালঘু গোষ্ঠীর ক্ষেত্র হিসেবে উপস্থাপন করা হয়—যাদের অনগ্রসর জনগোষ্ঠী বলা হয় এবং সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রধান কারণ হিসেবেও দেখানো হয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো সবচেয়ে দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী সাধারণত রাজনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন থাকে এবং ভোট দেয়ার ক্ষেত্রেও তারা সবচেয়ে কম সক্রিয়।

বরং আমি আমার সাম্প্রতিক বই ‘ইনসিকিউরিটি পলিটিক্স’-এ যেমন দেখিয়েছি, বর্তমানের নির্বাচনী পরিবর্তনগুলো আসলে এমন এক সাধারণ অনিরাপত্তার প্রতিফলন, যা জনসংখ্যার বিস্তৃত একটি অংশকে প্রভাবিত করছে। এ অনিরাপত্তার উৎসের মধ্যে রয়েছে বাড়তি কাজের চাপ, কর্মক্ষেত্রে অবিরাম মানসিক চাপে থাকা, হঠাৎ কোনো খরচ সামাল দিতে না পারা, কিংবা ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চয় গড়ে তুলতে ব্যর্থ হওয়া।

অনগ্রসর ভোটাররাই রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রধান চালক—এ যুক্তির সবচেয়ে পরিচিত প্রচারকদের একজন, হলেন কট্টর ডানপন্থী কর্মী এবং রিফর্ম ইউকের প্রার্থী ম্যাথিউ গুডউইন, যিনি যুক্তরাজ্যের গর্টন ও ডেন্টনের উপনির্বাচনে স্পেন্সারের কাছে পরাজিত হন। একজন শিক্ষাবিদ হিসেবে গত এক দশকে গুডউইন বেশ কয়েকটি প্রভাবশালী গবেষণা প্রকাশ করেছেন, যার মধ্যে বহুল উদ্ধৃত একটি বিশ্লেষণে বলা হয়েছিল যে ব্রিটেনের ব্রেক্সিটপন্থী ‘ভোট লিভ’ মূলত ছিল শ্রমজীবী ভোটারদের বিদ্রোহ।

গুডউইনের এ ব্যাখ্যা ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যমে ব্যাপক গুরুত্ব পেলেও বিকল্প বিশ্লেষণগুলো তেমন মনোযোগ পায়নি। যেমন ২০১৭ সালে আমার সহলিখিত একটি গবেষণায় দেখানো হয়েছিল যে ব্রেক্সিটের সঙ্গে মধ্যবিত্ত ভোটারদের অর্থনৈতিক অনিরাপত্তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। গবেষণাটি বিদেশে বেশ আলোচিত হলেও যুক্তরাজ্যে তা প্রায় উপেক্ষিত ছিল।

সে সময় আর্থিক কষ্টকে কেবল শ্রমজীবী ও অতিদরিদ্র মানুষের সমস্যা হিসেবে তুলে ধরা ছিল খুবই সাধারণ এবং রাজনৈতিকভাবে সুবিধাজনকও। কিন্তু তারপর থেকে ক্রমেই স্পষ্ট হয়েছে, ব্রিটেনের বৃহৎ মধ্যবিত্ত শ্রেণীরও আর আগের মতো নিরাপদ বা সচ্ছল থাকার অবস্থা নেই। তবু যুক্তরাজ্যের অর্থনৈতিক অবক্ষয়ের বাস্তবতা জনপরিসরের বিতর্কে প্রায় অনুপস্থিত। সম্ভবত কারণ, এটি জাতীয় গর্বের এক গুরুত্বপূর্ণ ধারণাকেই প্রশ্নের মুখে ফেলে।

কনজারভেটিভ-লেবার দ্বিমেরু রাজনীতির বাইরে যারা ভোট দেয়, তাদের প্রান্তিক বা বিচ্ছিন্ন মানুষ হিসেবে দেখানো অনেক সহজ; কিন্তু তাদের ভোট যে যুক্তরাজ্যের অর্থনৈতিক মডেলের ব্যর্থতার দিকে আঙুল তোলে, সে সত্যের মুখোমুখি হওয়া অনেক কঠিন। গর্টন ও ডেন্টন অবশ্যই বিশেষভাবে বঞ্চিত একটি আসন, কিন্তু স্পেন্সারের জয় সীমানা ছাড়িয়ে প্রতিধ্বনি তুলেছে। কারণ তার বার্তা এমন বিস্তৃত ও গভীর অনিরাপত্তার কথা বলে, যা মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলো সচরাচর স্বীকারই করতে চায় না।

স্পেন্সারের এ জয় অনেককেই বিস্মিত করেছে, কারণ এর আগে গ্রিন পার্টির পার্লামেন্টে ছিল মাত্র আরেকটি আসন। তবে বিস্ময়ের আরেকটি কারণও ছিল। তাত্ত্বিকভাবে তার প্রস্তাবিত নীতিগুলো গুডউইনের বর্ণিত তথাকথিত ‘পেছনে পড়ে থাকা’ জনগোষ্ঠীর কাছে আকর্ষণীয় হওয়ার কথা নয়। গুডউইনের ব্যাখ্যায় এরা মূলত সাংস্কৃতিক রক্ষণশীলতা এবং অভিবাসনবিরোধী মনোভাব দ্বারা পরিচালিত। লেবার পার্টির বড় অংশসহ বহু মূলধারার রাজনীতিকও একইভাবে রাজনৈতিক ক্ষোভকে ব্যাপক অভিবাসনের প্রতিক্রিয়া হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন—ক্রমবর্ধমান অনিরাপত্তা এবং সেই অনিরাপত্তাকে বোঝাতে ব্যবহৃত রাজনৈতিক বয়ানের ফল হিসেবে নয়।

অর্থনৈতিক অনিরাপত্তা মূলত অভিবাসনের ফল—এ ধারণাকে গ্রহণ করে মূলধারার দলগুলো পরোক্ষভাবে এটাও মেনে নিয়েছে যে নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার একমাত্র উপায় হলো অভিবাসন সীমিত করা, কিংবা অন্তত সে রকম দেখানো। কিন্তু স্পেন্সারের জয় ভিন্ন এক পথের ইঙ্গিত দেয়: ক্ষোভকে অভিবাসী বা জাতিগত সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে নয়, বরং অর্থনৈতিক অভিজাতদের বিরুদ্ধে সংগঠিত করা। বিজয়ী ভাষণে তিনি বলেন, ‘ভালো একটা জীবন গড়ার জন্য কাজ করার বদলে আমরা কাজ করছি কোটিপতিদের পকেট ভরাতে। আমাদের রক্ত শুষে নেয়া হচ্ছে’।

সম্পদ কেন্দ্রীভূত করা এবং অর্থনৈতিক বৈষম্যের দিকে জনঅসন্তোষকে পরিচালিত করার মধ্যে উল্লেখযোগ্য রাজনৈতিক সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু এর জন্য আগে বুঝতে হবে, ঠিক কী কারণে ভোটাররা মূলধারার রাজনীতি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। অভিবাসন আসল কারণ নয়; মানুষের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতার জন্য এটি কেবল একটি সুবিধাজনক ব্যাখ্যা।

গুডউইনের নির্বাচনী পরাজয় শুধু একজন প্রার্থীর পরাজয় নয়; এটি ব্রিটিশ সমাজ সম্পর্কে তার ব্যাখ্যারও পরাজয়। ইউরোপজুড়ে রাজনীতিকদের জন্য এর মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা রয়েছে। জনতুষ্টিবাদের জোয়ার ঠেকাতে চাইলে তাদের অবশ্যই সেই আর্থিক অনিরাপত্তার মুখোমুখি হতে হবে, যা জনগণের ক্ষোভ ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের প্রতি উদাসীনতা বাড়িয়ে তুলছে।

[স্বত্ব:প্রজেক্ট সিন্ডিকেট, ২০২৬]

লোরেঞ্জা আন্তোনুচ্চি: কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞানের সহযোগী অধ্যাপক