আমরা যদি বাংলাদেশের প্রাথমিক জ্বালানি পরিস্থিতি দেখি, তবে দেখা যায়—আমাদের মোট জ্বালানির প্রায় ৬৫ শতাংশ এখন আমদানিনির্ভর। বিদ্যুৎ খাতে ব্যবহৃত জ্বালানির বড় অংশই আসে আমদানি করা কয়লা, তেল ও গ্যাস থেকে। অর্থাৎ আমাদের জ্বালানি ব্যবস্থায় আমদানিনির্ভরতা ক্রমেই বেড়ে চলেছে, আর স্থানীয় গ্যাস সরবরাহ দিনকে দিন কমছে—এটা আপনারা সবাই জানেন।
গত ১০ বছরে প্রতি বছর গড়ে প্রায় ১০০ মিলিয়ন ঘনফুট করে গ্যাস উৎপাদন কমে গেছে। এখন সেই ঘাটতি আরো বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৫০ মিলিয়ন ঘনফুটে। সরকার বা পূর্ববর্তী বিভিন্ন সরকার গ্যাস উৎপাদন বাড়ানোর যে উদ্যোগগুলো নিয়েছে, সেগুলো এখনো কাঙ্ক্ষিত ফল দিচ্ছে না।
অন্যদিকে আমদানীকৃত গ্যাসের ক্ষেত্রেও আমাদের সীমাবদ্ধতা রয়েছে। দেশের বিদ্যমান ফিজিক্যাল ইনফ্রাস্ট্রাকচার বা গ্যাস আমদানির সক্ষমতা বর্তমানে সর্বোচ্চ ১ হাজার ১০০ মিলিয়ন কিউবিক ফিটে সীমিত। আমাদের হাতে মাত্র দুটি এফএসআরইউ (ফ্লোটিং স্টোরেজ অ্যান্ড রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিট) আছে, যা দিয়ে এর বেশি গ্যাস আমদানি সম্ভব নয়।
অর্থাৎ এখন আমরা গ্যাস সরবরাহ বাড়াতে চাইলে, তা না পারছি স্থানীয় উৎস থেকে, না পারছি আমদানির মাধ্যমে—দুই দিক থেকেই বাধা রয়েছে। স্থানীয় উৎপাদন ক্রমে কমছে, আর আমদানির সক্ষমতাও সীমিত। এ বাস্তবতায় এলপিজি আমাদের জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প জ্বালানি হিসেবে সামনে এসেছে, যা দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে ভবিষ্যতে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
বর্তমানে বাংলাদেশে প্রতিদিন প্রায় ১ হাজার ৭৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে। এর একটি বড় অংশই আসে শেভরন পরিচালিত বিবিয়ানা গ্যাসক্ষেত্র থেকে। শুধু এই একটি ক্ষেত্র থেকেই প্রতিদিন প্রায় ১ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পাওয়া যায়। কিন্তু উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে—বিবিয়ানা একটি ‘ডিক্লাইনিং ফিল্ড’, অর্থাৎ এর উৎপাদন ক্রমেই হ্রাস পাচ্ছে এবং এখন প্রায় এর জীবন চক্রের শেষ পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছে।
এ উৎপাদন দ্রুত নেমে গেলে সেটি বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে এক বড় ধরনের সংকট তৈরি করতে পারে। কারণ বাংলাদেশের পুরো অর্থনীতি এখনো মূলত গ্যাসনির্ভর। বিদ্যুৎ উৎপাদন থেকে শুরু করে সার কারখানা, শিল্প, এমনকি গৃহস্থালিতেও গ্যাসই প্রধান জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। সুতরাং হঠাৎ করে অন্য কোনো জ্বালানিতে সুইচ করা এত সহজ নয়—এটা একটি জটিল প্রক্রিয়া, যার জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন।
এখন যদি আমরা দেশের জ্বালানির উৎসগুলোর দিকে তাকাই, দেখা যায়—নিজস্ব উৎসগুলো দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে। গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন কমছে, অথচ কয়লা খাতে কোনো কার্যকর পরিকল্পনা বা উদ্যোগ এখনো নেয়া হয়নি, যদিও দেশে কয়লার কিছু সম্ভাবনাময় মজুদ রয়েছে।
অন্যদিকে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতও আশানুরূপ অগ্রগতি দেখাতে পারেনি; বরং আগের তুলনায় কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। ফলে আমাদের জ্বালানি সরবরাহ এখন মূলত আমদানিনির্ভর হয়ে পড়েছে—আমরা গ্যাস, তেল ও কয়লা—সবই বাইরে থেকে আনছি। আমাদের প্রাইমারি এনার্জি মিক্সের তথ্য বলছে, ২০১৯-২০ সাল থেকেই প্রাকৃতিক গ্যাসের সরবরাহ ধীরে ধীরে কমে আসছে, বিপরীতে কয়লার ব্যবহার এবং তেলের ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ডাটা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০১৬-১৭ অর্থবছর পর্যন্ত আমাদের নিজস্ব গ্যাস সরবরাহ সর্বোচ্চ পর্যায়ে ছিল। এরপর থেকেই উৎপাদনে ধারাবাহিক ও গভীর পতন শুরু হয়। এ পতন এখন এমন এক জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে, যেখানে এলপিজি ব্যবহার বাড়িয়েও সেই ঘাটতি পূরণ করা যাচ্ছে না।
অর্থাৎ এলপিজি যতই জনপ্রিয় হোক না কেন, তা দেশের প্রাকৃতিক গ্যাসের দ্রুত পতনের ধারা ঠেকাতে পারছে না। বাংলাদেশের জ্বালানি খাত এখন এক গভীর রূপান্তরের দ্বারপ্রান্তে—যেখানে সঠিক নীতিনির্ধারণ, বিকল্প জ্বালানির উন্নয়ন এবং টেকসই আমদানি কৌশল ছাড়া সামনে আসন্ন জ্বালানি সংকট এড়ানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে।
২০১৯ সালে পেট্রোবাংলা যে পূর্বাভাস দিয়েছিল সেটি ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তারা তখনই বলেছিল—এলপিজি ছাড়া যদি আমরা গ্যাস সরবরাহে কোনো উন্নয়ন বা ‘এনহ্যান্সমেন্ট’ করতে চাই, তবে চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে এক বিরাট ব্যবধান তৈরি হবে।
এরপর ২০২৩ সালে প্রকাশিত বিভিন্ন সিনারিও বিশ্লেষণেও পেট্রোবাংলা জানায় যে ২০২৯ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের গ্যাস চাহিদা প্রায় ৫ হাজার মিলিয়ন ঘনফুটে পৌঁছবে। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি হচ্ছে বর্তমানে আমাদের দৈনিক সরবরাহ মাত্র ২ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুটের মধ্যে সীমাবদ্ধ। অর্থাৎ এখনই দেশে প্রতিদিন প্রায় ১ হাজার ৫০০ থেকে ১ হাজার ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের ঘাটতি বিদ্যমান, যেখানে মোট চাহিদা দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪ হাজার মিলিয়ন ঘনফুটে। এ মুহূর্তের চিত্রই ভবিষ্যতের জন্য এক বড় সতর্কবার্তা। সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয় হচ্ছে এটি কোনো বাইরের সংস্থার বিশ্লেষণ নয়, বরং পেট্রোবাংলার নিজস্ব ২০২৪-২৫ সালের ডিমান্ড ফোরকাস্ট। এই ফোরকাস্টে দেখা যাচ্ছে, ২০৩০ সাল পর্যন্ত গ্যাসের চাহিদা প্রায় স্থিতিশীল থাকবে, উল্লেখযোগ্য কোনো বৃদ্ধি তারা ধরে নেয়নি।
এর মানে দাঁড়ায়, পেট্রোবাংলা বাস্তবে নিজস্বভাবে সেই চাহিদা মেটানোর সক্ষমতা থেকে প্রায় সরে এসেছে—অর্থাৎ তারা কার্যত স্থানীয়ভাবে পর্যাপ্ত সরবরাহের আশা ছেড়ে দিয়েছে। এ অবস্থায় বোঝা যাচ্ছে, দেশের জ্বালানি ভবিষ্যৎ এখন আর স্থানীয় উৎপাদনের ওপর নির্ভর করছে না; বরং আমদানি ও বিকল্প জ্বালানির দিকেই যাচ্ছে বাংলাদেশের জ্বালানি কৌশলের মূল দৃষ্টি। যদি আমরা পেট্রোবাংলার সাম্প্রতিক ডিমান্ড ফোরকাস্ট দেখি, সেখানে বিষয়টি বেশ স্পষ্ট হয়ে যায়—তারা মূলত এখন আর স্থানীয়ভাবে গ্যাস সরবরাহ বৃদ্ধির বিষয়ে খুব একটা আশাবাদী নয়। বরং মনে হচ্ছে, পেট্রোবাংলা কার্যত গ্যাস সরবরাহ ইস্যুতে হাত-পা তুলে ফেলেছে।
এ প্রেক্ষাপটে বিভিন্ন সেক্টরে গ্যাসের ব্যবহার বুঝে নেয়াটা আজকের আলোচনার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমান পরিস্থিতি অনুযায়ী, দেশের রেসিডেনশিয়াল সেক্টরে মোট গ্যাস ব্যবহারের প্রায় ১১ শতাংশ খরচ হয়, যা দৈনিক প্রায় ২৭৫ মিলিয়ন ঘনফুট। অন্যদিকে সিএনজি সেক্টরে ব্যবহৃত গ্যাসের পরিমাণ মোট ব্যবহারের প্রায় ৫ শতাংশ।
শিল্প খাতে, বিশেষ করে যেখানে গ্যাস সরাসরি উৎপাদন প্রক্রিয়ায় ব্যবহৃত হয় (যাকে আমরা ‘প্রসেস গ্যাস’ বলি), সেখানে গ্যাসের ব্যবহার প্রায় ১৮ শতাংশ। এছাড়া ক্যাপটিভ পাওয়ারের জন্য ব্যবহৃত গ্যাসের হার প্রায় ১৯ শতাংশ, যা বিদ্যুৎ উৎপাদনের সঙ্গে সম্পর্কিত। এর ফলে যদি আমরা গ্রিড পাওয়ার এবং ক্যাপটিভ পাওয়ার–এ দুই অংশকে একসঙ্গে ধরি, তাহলে দেখা যায়—দেশের মোট গ্যাস ব্যবহারের প্রায় ৬০ শতাংশই বিদ্যুৎ উৎপাদন খাতে খরচ হচ্ছে।
এই তিন ক্ষেত্র—বিদ্যুৎ, শিল্প ও গৃহস্থালি খাত—এলপিজির বিকল্প জ্বালানি হিসেবে ভূমিকা রাখার সবচেয়ে উপযুক্ত জায়গা। বাংলাদেশের শিল্প খাতের প্রায় ৪৫ শতাংশেরও বেশি জ্বালানি ব্যবহার গ্যাসনির্ভর, এবং এর সঙ্গে যদি রেসিডেন্সিয়াল খাতের ১১ শতাংশ যোগ করা হয়, তাহলে দেখা যায়—মোট ৫৬ শতাংশ জ্বালানি চাহিদা গ্যাসনির্ভর খাত থেকে আসছে। অর্থাৎ আমাদের শিল্পই এখন সবচেয়ে বড়ভাবে গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল।
এদিকে আমরা বর্তমানে বিপুল পরিমাণে এলএনজি, কয়লা ও অন্যান্য জ্বালানি আমদানি করছি। এ প্রেক্ষাপটে এলপিজি একটি কার্যকর বিকল্প জ্বালানি হিসেবে দেখা দিয়েছে—বিশেষ করে পরিবহন, গৃহস্থালি, বাণিজ্যিক এবং কিছু শিল্প খাতে, যেখানে এটি ধীরে ধীরে প্রাকৃতিক গ্যাসের জায়গা নিচ্ছে।
বর্তমানে এলপিজি দেশের মোট জাতীয় প্রাইমারি এনার্জি সরবরাহের প্রায় ২ শতাংশ অবদান রাখছে। কিন্তু এ প্রবৃদ্ধি অত্যন্ত দ্রুত—মাত্র ৬-৭ বছর আগেও এলপিজির মোট সরবরাহ ছিল ৮০ হাজার টন, যা এখন বেড়ে ১৫-১৬ লাখ টনে পৌঁছেছে। অর্থাৎ এক লাখ টনের নিচ থেকে মাত্র ছয়-সাত বছরের ব্যবধানে ১৬ গুণ বৃদ্ধি—এটা এক বিশাল অগ্রগতি। আজ এলপিজি একটি বৃহৎ জ্বালানি সরবরাহকারী খাতে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে ৮০ শতাংশ এলপিজি ব্যবহৃত হচ্ছে গৃহস্থালি পর্যায়ে। এর মূল কারণ হলো, অনেক জায়গায় এখনো পাইপলাইনে জাতীয় গ্যাস সরবরাহ পৌঁছায়নি, ফলে এলপিজিই সেখানে একমাত্র কার্যকর জ্বালানি বিকল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
এলপিজি খাতের এ দ্রুত বৃদ্ধির পেছনে আরো কিছু কারণ রয়েছে—বিনিয়োগ, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং বিতরণ ব্যবস্থার সম্প্রসারণ। বর্তমানে এ খাতে প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ হয়েছে। সারা দেশে ৪৫ হাজারেরও বেশি খুচরা পরিবেশক (রিটেইল ডিস্ট্রিবিউটর) কাজ করছে এবং ২৭টি অপারেটর কোম্পানি এলপিজি ব্যবসায় যুক্ত রয়েছে।
এর মধ্যে ২০টি কোম্পানির নিজস্ব আমদানির সুবিধা (ইমপোর্ট ফ্যাসিলিটি) রয়েছে, আর বাকি সাতটি প্রতিষ্ঠান স্যাটেলাইট অপারেটর হিসেবে কাজ করছে।
বর্তমানে বাজারে সবচেয়ে প্রভাবশালী বা প্রধান পাঁচটি কোম্পানি হচ্ছে—ওমেরা, বসুন্ধরা, ফ্রেশ, বিএম ও যমুনা। এ পাঁচ কোম্পানি মিলে দেশের মোট এলপিজি বাজারের প্রায় ৫৭ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করছে। বাকি ২২টি কোম্পানি অবশিষ্ট বাজার সরবরাহের দায়িত্বে রয়েছে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, অল্প সময়ের মধ্যেই এলপিজি খাত বাংলাদেশের জ্বালানি ব্যবস্থায় এক গুরুত্বপূর্ণ ও প্রভাবশালী সেক্টর হিসেবে জায়গা করে নিয়েছে এবং এটি ভবিষ্যতে গ্যাসনির্ভরতা হ্রাস ও জ্বালানি বৈচিত্র্য আনয়নের অন্যতম চালিকাশক্তি হতে পারে।
এলপিজি খাতের প্রবৃদ্ধি নিয়ে যদি আমরা সাম্প্রতিক তথ্য দেখি, তাহলে দেখা যায়, ২০২১-২২ অর্থবছরে সর্বোচ্চ দেড় মিলিয়ন টন এলপিজি সরবরাহ করা হয়েছিল। ২০২৩-২৪ সালে সরবরাহের পরিমাণ কিছুটা স্থিতিশীল হয়ে এখন মোট সক্ষমতা প্রায় ১ দশমিক ৬ মিলিয়ন টনে দাঁড়িয়েছে। বর্তমানে এ খাতের সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও বিতরণ–সব ধরনের অবকাঠামো এ পরিমাণ সরবরাহ বজায় রাখার মতো সক্ষমতা অর্জন করেছে।
ভবিষ্যতের দিকে তাকালে দেখা যায়, বিশেষ করে গৃহস্থালি খাতে চাহিদা বৃদ্ধির কারণে এলপিজির ব্যবহার আরো দ্রুত বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ২০৩০ সালের মধ্যে এই ব্যবহার প্রায় ২ দশমিক ৫ মিলিয়ন টনে পৌঁছবে—এমনটাই বর্তমান পূর্বাভাস।
তবে আমার ব্যক্তিগত বিশ্বাস, বাস্তব প্রবৃদ্ধি এর চেয়েও অনেক বেশি হবে। কারণ আগের অনুমানগুলো করা হয়েছিল পুরনো তথ্য ও পরিস্থিতির ভিত্তিতে। কিন্তু এখন এলপিজির ব্যবহার, বিনিয়োগ, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং বাজার সম্প্রসারণ—সব দিক দিয়েই এক নতুন গতি তৈরি হয়েছে। ফলে আমি মনে করি, এলপিজির ব্যবহার ২০৩০ সালের মধ্যেই ২ দশমিক ৫ মিলিয়নের অনেক ওপরে উঠে যাবে।
তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো, এলপিজি হচ্ছে বাংলাদেশের একমাত্র জ্বালানি খাত যা কখনই সরকারি ভর্তুকির আওতায় আসেনি। আমরা যখন জ্বালানি খাতে ভর্তুকি নীতি নিয়ে আলোচনা করি—তেল, গ্যাস কিংবা বিদ্যুতে সরকার দীর্ঘদিন ধরে বিপুল পরিমাণ ভর্তুকি দিয়ে এসেছে। অথচ এলপিজি খাত একেবারেই বাজারনির্ভর এবং কোনো ভর্তুকি ছাড়াই এ অবস্থানে পৌঁছেছে।
অতীতে অনেকেই ধারণা করেছিলেন, ভর্তুকি ছাড়া এ খাত টিকে থাকতে পারবে না, বাজার গড়ে উঠবে না। কিন্তু বাস্তবতা সম্পূর্ণ উল্টো প্রমাণ করেছে—এলপিজি সেই ব্যতিক্রম, যা কোনো সরকারি সহায়তা ছাড়াই দেশে এক বিশাল বাজার গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছে এবং এখন বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের এক অপরিহার্য অংশে পরিণত হয়েছে।
বাংলাদেশে আসলে যেকোনো জ্বালানি বাজারমূল্যে বিক্রি করা সম্ভব—এটা আমরা বাস্তবেই দেখেছি। এর সবচেয়ে ভালো উদাহরণ হলো এলপিজি। একসময় এ বাজার ৮০০ থেকে শুরু করে এক লাখ, পাঁচ লাখ, এমনকি ১৬ লাখ পরিবার পর্যন্ত ছাড়িয়ে গেছে—কোনো সরকারি ভর্তুকি ছাড়াই। কারণ সরকার এ খাত বেসরকারি খাতে ছেড়ে দিয়েছিল। আমি মনে করি, এটাই ছিল মূল কারণ—সরকারের এখানে ভর্তুকি দেয়ার সুযোগ ছিল না। ভারতের মতো নয়, যেখানে এলপিজি বোতলে ভর্তুকি দেয়া হয়। আর মূল্য প্রতিযোগিতার দিক থেকেও এলপিজি এখন বেশ কার্যকর হয়ে উঠেছে।
এর সঙ্গে আরো একটি বিষয় আছে—আমাদের জীবনযাত্রার মান দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছে, ক্রয়ক্ষমতা বেড়েছে। ফলে আগে যেখানে গৃহস্থালি পর্যায়ে বায়োমাস (কাঠ, খড়, পাতা) ব্যবহার করা হতো, এখন সেখানে মানুষ এলপিজি ব্যবহার করছে। এ পরিবর্তনের আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো শিল্প খাতে জ্বালানি ব্যবহারের ধরন। শিল্প ক্ষেত্রে আমি মনে করি সবচেয়ে বড় অগ্রগতি ঘটেছে যন্ত্রপাতি বা ইকুইপমেন্ট পর্যায়ে। কারণ ফুয়েল সোর্স পরিবর্তন করা খুবই ব্যয়বহুল একটি বিষয়। আপনি যদি তেল থেকে গ্যাসে যেতে চান, তবে আপনাকে বয়লার বদলাতে হবে, সরবরাহ ব্যবস্থা ও অন্যান্য জ্বালানি অবকাঠামোও পরিবর্তন করতে হবে।
কিন্তু আমাদের যে শিল্পগুলো প্রাকৃতিক গ্যাসভিত্তিক, তারা যদি এখন এলপিজিতে রূপান্তর হতে চায়, তাহলে সেটা তুলনামূলকভাবে অনেক সহজ। এ সহজ রূপান্তর প্রক্রিয়াটাই একটি বড় আকর্ষণ। মূল্য প্রতিযোগিতার দিক থেকেও এলপিজি ফার্নেস অয়েল বা কয়লার তুলনায় অনেক বেশি প্রতিযোগিতামূলক। কারণ এখন সবাই বিকল্প জ্বালানি খুঁজছে। গ্যাস না থাকলে শিল্প চলবে কীভাবে? বয়লার কীভাবে চালাব? শিল্পের ‘প্রসেস হিট’-এর মূল উৎসই তো বয়লার। এখন প্রশ্ন হলো, বয়লারের জন্য কোন জ্বালানি ব্যবহার করব—ফার্নেস অয়েল, কয়লা, নাকি জুট বার্ন করে চালাব?
আমরা এসব বিকল্প নিয়েই ভাবছি, কারণ প্রাকৃতিক গ্যাস এখন আর সহজলভ্য নয়। তাই সবচেয়ে কার্যকর ও সাশ্রয়ী বিকল্প হিসেবে আমি মনে করি এলপিজিই সবচেয়ে ভালো পছন্দ হতে পারে, বিশেষ করে শিল্প খাতে। গৃহস্থালি পর্যায়ে তো এলপিজি আছেই। যদি আমরা গৃহস্থালি পর্যায়ের পাইপলাইন গ্যাসের ভর্তুকি তুলে দিই, যা বর্তমানে ১৮ টাকা প্রতি ঘনমিটার হারে দেয়া হচ্ছে, তাহলে চিত্রটা আরো স্পষ্ট হবে।
কারণ যদি আমরা আমদানিনির্ভর প্রকৃত মূল্যে হিসাব করি, তাহলে প্রতি ঘনমিটার গ্যাসের গড় খরচ দাঁড়ায় প্রায় ৫৫ টাকা। আর যদি সত্যিই ৫৫ টাকা প্রতি ঘনমিটার নির্ধারণ করা হয়, তাহলে অনেক মানুষই স্বতঃস্ফূর্তভাবে এলপিজিতে চলে যাবে।
এখন বিভিন্ন জ্বালানির মূল্য তুলনা করলে দেখা যায়—অকটেন, ডিজেল, কেরোসিন, এসবের দাম যথাক্রমে ৩১, ২৯ ও ২৩ ডলার। এলপিজি তুলনামূলকভাবে সস্তা, প্রায় ১৮ ডলার। এলএনজি ১৩ ডলার, আর সিএনজি এখনো ভর্তুকিপ্রাপ্ত, যার বর্তমান মূল্য প্রায় ৪৩ টাকা। যদি এটিও ৫৫ টাকায় উন্নীত করা হয়, তবে সিএনজি ও এলএনজির মধ্যে তেমন পার্থক্য থাকবে না।
অন্যদিকে প্রাকৃতিক গ্যাস এখনো ব্যাপকভাবে ভর্তুকিনির্ভর, বিশেষ করে বাণিজ্যিক ব্যবহারে। এ কারণেই এর বাজারমূল্য প্রকৃত মূল্যের চেয়ে অনেক কম। তাই ভর্তুকি তুলে দিলে বাস্তবে দেখা যাবে—এলপিজিই একমাত্র জ্বালানি যা বিনা ভর্তুকিতে প্রতিযোগিতায় টিকে আছে। বর্তমানে অবশ্য অকটেন বা ডিজেলের মতো জ্বালানিতেও আর কোনো ভর্তুকি নেই; বরং সরকার এখান থেকে লাভ করছে।
সুতরাং সামগ্রিকভাবে বললে—এলপিজি বাংলাদেশের জ্বালানি বাজারে এমন এক বাস্তব উদাহরণ, যা প্রমাণ করে বাজারমূল্যে পরিচালিত হলেও একটি জ্বালানি খাত কীভাবে টেকসই, প্রতিযোগিতামূলক এবং জনপ্রিয় হয়ে উঠতে পারে।
এলপিজির ক্ষেত্রে যে ঝুঁকিগুলো নিয়ে আমরা কথা বলি, সেগুলো সাধারণত ‘হ্যাজার্ড উইকলি’ বা সাপ্তাহিক সুরক্ষা পর্যালোচনায় উল্লেখ করা হয়। মূলত এর সবচেয়ে বড় ঝুঁকিটি হলো দাহ্যতা—অর্থাৎ এটি অত্যন্ত ফ্ল্যামেবল (দাহ্যযোগ্য)। সামান্য অসাবধানতায়ও এটি জ্বলে উঠতে পারে বা শ্বাসরোধের কারণ হতে পারে। তাছাড়া এলপিজির নির্দিষ্ট এক্সপোজার লিমিটও আছে—৮০০ পিপিএম থেকে ১০০০ পিপিএম পর্যন্ত। এ মাত্রার ওপরে গ্যাসের সংস্পর্শে এলে শরীরে জ্বালাপোড়া বা বার্নের মতো সমস্যা হতে পারে।
এই কারণেই আমরা বলি, এলপিজি ব্যবহারে সরাসরি স্পর্শ না করাই উত্তম। বিস্ফোরণের ঝুঁকিও এখানে রয়েছে—এটি আরেকটি বড় হ্যাজার্ড। তাই এ ঝুঁকিগুলো নিয়ন্ত্রণের জন্যই আমরা অডারাইজেশন (odourization) নামের একটি প্রক্রিয়া ব্যবহার করি। এতে নির্দিষ্ট এক ধরনের কেমিক্যাল মিশিয়ে গ্যাসে গন্ধ যুক্ত করা হয়, যাতে গ্যাস লিক হলে সহজেই তা টের পাওয়া যায়।
এছাড়া গ্যাস লিক শনাক্ত করার জন্য আমরা বিভিন্ন লিক ডিটেকশন ইকুইপমেন্ট ব্যবহার করি। কাজের সময় ব্যক্তিগত সুরক্ষা সামগ্রী (পিপিই) পরিধান করাও বাধ্যতামূলক। ফায়ার ফাইটিং সিস্টেম এবং সাইটে কার্যকর নিরাপত্তা নীতিমালা মেনে চলাটাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমি এই টুলস বা নিয়মগুলো নিয়ে বিস্তারিত বলছি না, তবে এটুকু বলতে পারি—যদি আমরা এসব নিয়ম-কানুন ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা সঠিকভাবে অনুসরণ করি, তাহলে এলপিজি একটি অত্যন্ত নিরাপদ জ্বালানি।
অনেকেই এখনো মনে করেন এলপিজি বিপজ্জনক, কিন্তু ইতিহাস দেখলে বিষয়টা স্পষ্ট হবে। ১৯৬০ সালে যখন বাংলাদেশে (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান) প্রথম প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহের উদ্যোগ নেয়া হয়, তখনো মানুষ ভয় পেত। সে সময় রাস্তায় মিছিল পর্যন্ত হয়েছিল—‘আমরা গ্যাস চাই না, গ্যাস ভয়ংকর!’ কারণ মানুষ জানত না এ জ্বালানির ব্যবহার কতটা নিরাপদ ও উপকারী হতে পারে।
আজও এলপিজি নিয়ে অনেকের মধ্যে একই ধরনের সংশয় কাজ করে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই এলপিজি এখন নিরাপদভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এটি তিনটি প্রধান ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়—গাড়ির জ্বালানি হিসেবে (অটো গ্যাস), গৃহস্থালি রান্নায় এবং শিল্প-কারখানায়। অর্থাৎ এলপিজি এখন বিশ্বের এক স্বীকৃত, নিরাপদ ও কার্যকর জ্বালানিমাধ্যম।
এগুলোই মূলত আমাদের আলোচনার মূল বিষয়বস্তু। আসলে এটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র—এ মুহূর্তে আমরা যে অনুমানটি করছি, সেটি একটি আনুমানিক হিসাব বা প্রাক্কলন। আমাদের এখন একটি গ্যাস ঘাটতি বিদ্যমান। বিদ্যুৎ উৎপাদনে আমাদের দৈনিক গ্যাসের প্রয়োজন প্রায় দেড়-দুই হাজার মিলিয়ন ঘনফুট, কিন্তু সরবরাহ হচ্ছে মাত্র এক হাজার মিলিয়ন ঘনফুট। ক্যাপটিভ পাওয়ারে চাহিদা প্রায় ৬৮৫ মিলিয়ন ঘনফুট, সেখানে সরবরাহ করা যাচ্ছে ৪২০ মিলিয়ন ঘনফুট। শিল্প খাতে চাহিদা ১ হাজার ১০০ মিলিয়ন ঘনফুট, অথচ আমরা দিতে পারছি মাত্র ৪৬০ মিলিয়ন ঘনফুট। এ ঘাটতি পূরণের ক্ষেত্রেই এলপিজি একটি সম্ভাবনাময় বিকল্প হিসেবে সামনে আসছে। আমরা বলছি, অন্তত ২০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস এলপিজির মাধ্যমে পূরণ করা সম্ভব। অর্থাৎ মোট ঘাটতির প্রায় ৩০ শতাংশ এলপিজি দিয়ে মেটানো যেতে পারে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ খাত হলো গৃহস্থালি বা ডমেস্টিক সেক্টর। এখানে চাহিদা প্রায় ৩৫ মিলিয়ন ঘনফুট, আর আমরা সরবরাহ করতে পারছি ৭৫ মিলিয়ন ঘনফুট (চলমান সংযোগ অনুযায়ী)। ভবিষ্যতে এ চাহিদা আরো বাড়বে এবং সেই সম্ভাব্য ঘাটতিও এলপিজি দিয়েই পূরণ করা যেতে পারে। এলপিজির বৃদ্ধির ধারা এখন শুধু গৃহস্থালি নয়—সিএনজি, বাণিজ্যিক খাত এবং ক্ষুদ্র শিল্প ক্ষেত্রেও তা ছড়িয়ে পড়ছে। বর্তমানে এলপিজির যে ইনফ্রাস্ট্রাকচার বা সরবরাহ ব্যবস্থা বিদ্যমান, তার মাধ্যমে আমরা দৈনিক প্রায় ৪০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের সমপরিমাণ শক্তি বিকল্পভাবে সরবরাহ করতে পারি।
তবে এটাও সত্যি যে যদি আমরা এলএনজি আমদানি করতে চাই, তাহলে তা এলপিজির তুলনায় কিছুটা সস্তা হবে—এ নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু এর জন্য প্রয়োজন বিশাল অবকাঠামো। একটি পূর্ণাঙ্গ এলএনজি রিগ্যাসিফিকেশন ফ্যাসিলিটি বা ল্যান্ড-বেজ টার্মিনাল তৈরি করতে অন্তত তিন থেকে পাঁচ বছর সময় লাগবে। বাস্তব অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, এই সময়ের নিচে কোনো বড় প্রকল্প সম্পন্ন করা সম্ভব নয়।
অন্যদিকে এলপিজি খাতের সক্ষমতা দ্রুত বৃদ্ধি করা সম্ভব। যথাযথ সরকারি নীতিগত সহায়তা পেলে মাত্র এক-দেড় বছরের মধ্যে বর্তমান আমদানির পরিমাণ দ্বিগুণ করা সম্ভব। অর্থাৎ এলপিজি খাতে বিনিয়োগ ও নীতিগত সমর্থন দিলে তা তাৎক্ষণিকভাবে দেশের জ্বালানি সংকট মোকাবেলায় বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
আমার বিশ্বাস, আমাদের এখনই এলএনজি আমদানির উদ্যোগ অব্যাহত রাখতে হবে—চলমান এসএসআরও (স্মল স্কেল রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিট) এবং ল্যান্ডবেজ টার্মিনাল উভয় ব্যবস্থাই একসঙ্গে চালু করা জরুরি। কিন্তু শুধু এলএনজি প্রকল্পের অপেক্ষা করে থাকা যাবে না, কারণ অপেক্ষা করলে আমাদের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি থমকে যাবে, আর তার মূল কারণ হবে জ্বালানি সরবরাহের ঘাটতি।
সুতরাং আমাদের সমাধান হতে হবে দুই দিকেই সমান্তরাল উদ্যোগে—দীর্ঘমেয়াদে এলএনজি ও স্বল্পমেয়াদে এলপিজিকে কার্যকর বিকল্প হিসেবে এগিয়ে নিতে হবে।
অধ্যাপক ম. তামিম: উপাচার্য, ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশ
[‘বাংলাদেশে এলপিজি: অর্থনীতি, পরিবেশ ও নিরাপত্তা’ শীর্ষক পলিসি কনক্লেভে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপকের বক্তব্যে]










