রাজধানী হিসেবে সব প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দু ঢাকা। স্বাস্থ্য ও শিক্ষাসহ সব আধুনিক সুযোগ-সুবিধা বিদ্যমান। ফলে বিগত সময়ে এ শহরকে কেন্দ্র করেই পুলিশের সব ইউনিট গঠন ও পদায়নে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। ফলে এ শহরে পুলিশও পদায়ন পেতে নানা তদবিরে ব্যস্ত থাকে। ঢাকা একটি জনবহুল শহর হলেও অন্য শহরগুলোর তুলনায় অপরাধের মাত্রা তুলনামূলক কম। জমিসহ সার্বিক অপরাধের মাত্রা সবচেয়ে বেশি খুলনা শহরে। এরপর রয়েছে সিলেটসহ অন্যগুলোয়। তার পরও অপরাধের মাত্রা বিবেচনায় ঢাকা শহরে থানা ও পুলিশ পদায়ন তুলনামূলক অনেক বেশি। শুধু রাজধানীই নয়, পুলিশ সংস্কারে গোটা দেশ ও বাহিনীকে গুরুত্ব দিয়ে কাজ করা উচিত। সব শহরের অপরাধ সমান গুরুত্ব পাওয়া উচিত। পুলিশকে ঢাকামুখী প্রবণতা থেকে বের হয়ে অপরাধ দমনে সব শহরকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে।

গত দেড় দশকে জনবল, সুযোগ-সুবিধা ও কাঠামোগত উন্নয়ন সবই হয়েছে পুলিশের। তার পরও এ বাহিনী জনগণের আস্থা অর্জনে ব্যর্থ হচ্ছে বারবার। এমনকি সেবার গুণগত মান বাড়েনি। পেশাদার বাহিনী হিসেবে গড়ে উঠতে পারেনি এখনো। বিগত বছরে পুলিশকে চাঁদাবাজি, ঘুস, দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, মিথ্যা মামলা দিয়ে সাধারণ মানুষকে হয়রানি-নির্যাতন এবং জনগণের সেবার পরিবর্তে রাজনৈতিক নেতাদের স্বার্থ বাস্তবায়নে তাদের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়তে দেখা গেছে। ফলে সেবার মানে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সূচকেও পিছিয়ে পড়েছে বাহিনীটি।

পুলিশকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার বন্ধ করে মানুষের সেবায় বেশি মনোযোগী হতে হবে। কেননা পুলিশ একটি রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। এজন্য রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রেখে মানুষের সেবায় নিয়োজিত করতে সরকার, রাজনৈতিক দল ও প্রভাবশালী গোষ্ঠীকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। এ বাহিনীকে স্বায়ত্তশাসিত, স্বচ্ছ ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপমুক্ত করে গড়ে তুলতে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারে গুরুত্ব দেয়া উচিত।

উন্নত দেশে সংঘটিত অপরাধের চেয়ে বাংলাদেশে অপরাধের হার বেশি। এর কারণ সেসব দেশে অপরাধীকে দ্রুত আইনের আওতায় আনা হয়। তদন্ত হয় যথার্থ। বিচার হয়। এর অন্যথা হওয়ার সুযোগ খুব কম। আর আমাদের দেশে ঘটে যাওয়া অপরাধে তদন্ত প্রক্রিয়া মন্থরগতির। ক্ষেত্রবিশেষে ত্রুটিপূর্ণ। পক্ষপাতিত্বের অভিযোগও রয়েছে। তদন্ত ও বিচারে দীর্ঘসূত্রতার সুযোগ পায় অভিযুক্ত ব্যক্তি। আদালতে সাক্ষ্যপ্রমাণ হাজির করা খুব কঠিন কাজ। আর অপরাধ যথার্থভাবে প্রমাণ করতে না পারায় আসামি পার পেয়ে যায়। এতে উৎসাহিত হয় অন্য অপরাধীরা।

বাংলাদেশের পুলিশ নিয়ে সাধারণ মানুষের অভিযোগের অন্ত নেই। ঘুস, চাঁদাবাজি, নিরীহ মানুষকে হয়রানি ও মামলা না নেয়াসহ নানা অভিযোগ। আবার মামলা নিলেও তদন্ত ঠিকমতো করা হয় না। পুলিশের কাছে গেলে কোনো ঘটনার প্রতিকার তো পাওয়াই যায় না, উল্টো হয়রানির শিকার হতে হয়। ফলে ভয়ে মানুষ থানায় যেতে চায় না। নানা বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে তারা প্রায়ই সংবাদ শিরোনাম হয়েছেন। আবার কোনো পুলিশের বিরুদ্ধে কোনো কিছু ঘটলেই তাৎক্ষণিকভাবে অভিযুক্তদের ‘ক্লোজড’, ‘সাময়িক বরখাস্ত’, ‘বদলি’, ‘বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ’ ইত্যাদির কথা শোনা যায়। কিন্তু এসব পদক্ষেপে বাস্তবে কী ঘটে তা আর কিছুই জানতে পারে না জনগণ। বিভিন্ন ফৌজদারি অপরাধে দণ্ডিতদের বিভিন্ন মেয়াদে কারাবাস, অর্থদণ্ড, মৃত্যুদণ্ড ইত্যাদি হতে দেখা যায়। কিন্তু অপরাধী পুলিশের কী হয়, সে বিষয়ে কিছুই জানা যায় না। অর্থাৎ অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত পুলিশের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা গেলে বারবার অপরাধে কম জড়াত।

একই সঙ্গে বিশ্বব্যাপী আইন-শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা রক্ষায় নিয়োজিত পেশাদার বাহিনীগুলোর মধ্যে ক্রমেই অবনমন হয়েছে পুলিশের অবস্থান। বিভিন্ন দেশের পুলিশের সেবামান নিয়ে সূচক তৈরি করে ইন্টারন্যাশনাল পুলিশ সায়েন্স অ্যাসোসিয়েশন (আইপিএসএ)। বিশ্বের ১২৫ দেশের পুলিশ সেবার মান নিয়ে প্রকাশিত ওয়ার্ল্ড ইন্টারন্যাশনাল সিকিউরিটি অ্যান্ড পুলিশ ইনডেক্স-২০২৩-এ বাংলাদেশ পুলিশের অবস্থান ১০০তম। সেবামানের দিক থেকে দক্ষিণ এশিয়ায় যুদ্ধবিধ্বস্ত আফগানিস্তান ছাড়া আর কোনো দেশের পুলিশ বাহিনী এত পিছিয়ে নেই। সব ক্যাটাগরিতে শীর্ষ পাঁচ অবস্থানে রয়েছে যথাক্রমে ডেনমার্ক, ফিনল্যান্ড, নরওয়ে, সিঙ্গাপুর ও নেদারল্যান্ডসের পুলিশ।

পুলিশের নেতিবাচক কর্মকাণ্ডের প্রসঙ্গ এলেই বরাবরই জনবল সংকট, বাজেটস্বল্পতা ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতাকে প্রধান কারণ হিসেবে দেখানো হতো। কিন্তু বিগত ১৫ বছরে (২০০৯-২০২৩) এ ধারণায় ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। এ সময়ে পুলিশে ৮৩ হাজার ৭০টি পদ সৃজন করা হয়েছে। ক্যাডার কর্মকর্তাদের জন্য সৃষ্টি করা হয় উচ্চ পর্যায়ের ১৭৮টি পদ। এজন্য শিল্পাঞ্চল পুলিশ, অ্যান্টি টেরোরিজম ইউনিট, কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিট (সিটিটিসি) নামে পৃথক তিনটি ইউনিটও চালু করা হয়। গত দেড় দশকে পুলিশে নতুন নিয়োগ হয়েছে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার।

একই সময়ে বাহিনীটির জন্য বরাদ্দ বেড়েছে ৪৩৩ শতাংশের বেশি। ২০০৯-১০ অর্থবছরে পুলিশের জন্য বরাদ্দ ছিল ৩ হাজার ৩৩১ কোটি টাকার কিছু বেশি। সর্বশেষ ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা ১৭ হাজার ৭৬৫ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়। বিগত সরকারের সময়ে পুলিশে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে অস্ত্র ও গোলাবারুদে। আগে ব্যবহৃত থ্রি নট থ্রি রাইফেলের পরিবর্তে পুলিশকে দেয়া হয়েছে ৭ পয়েন্ট ৬২ এমএম চাইনিজ রাইফেল। এছাড়া এ সময় এসএমজিসহ অত্যাধুনিক অনেক অস্ত্র ও গোলাবারুদ যুক্ত হয়েছে। কিন্তু বিপুল বিনিয়োগ ও জনবল বৃদ্ধির পরও দক্ষতা ও সেবার গুণগত মান বাড়েনি। বিগত সরকারের আমলে নানা সুযোগ-সুবিধা নিয়েছে পুলিশ। রাষ্ট্রীয় এসব সুযোগ-সুবিধা দেয়া হয়েছে মূলত জনগণের অর্থে। কিন্তু তারা জনগণের আস্থা অর্জন করতে পারেনি। জনগণের সেবার পরিবর্তে তারা ক্ষমতাসীনদের রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।

১৮৬১ সালের ব্রিটিশ শাসনামলের আইনে বাংলাদেশ পুলিশ পরিচালিত হচ্ছে। এ আইনের কোথাও পুলিশকে সেবামূলক প্রতিষ্ঠান বলা হয়নি। পুলিশকে সেবা ও জনকল্যাণমুখী হিসেবে গড়ে তুলতে ১৮৬১ সালের নিয়ন্ত্রণকারী পুরনো আইনগুলো সংস্কার করে সময়োপযোগী করা দরকার। বিগত সময়ে পুলিশের সঙ্গে জনগণের ব্যবধান বেড়েছে। এ ব্যবধান কমিয়ে আনতে জনবান্ধব হওয়ার পাশাপাশি জনগণের সঙ্গে মিথস্ত্রিয়া বাড়াতে হবে পুলিশকে। জনগণের আস্থা ও ভালোবাসা অর্জনে মনোযোগী হওয়া দরকার। এসব বিষয় অর্জন করতে হবে কাজ দিয়ে, সেবা দিয়ে, ভালোবাসা দিয়ে। সব দল, মত, ধর্ম ও বর্ণ নির্বিশেষে সবার সঙ্গে সুসম্পর্ক ও যোগাযোগ রাখতে হবে পুলিশকে।

পুলিশের শক্তি প্রয়োগের ক্ষেত্রে জাতিসংঘের শক্তি প্রয়োগের নীতিমালা অনুসারে কাজ করা জরুরি। শক্তি প্রয়োগের জবাবদিহির বিষয়টি গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করা উচিত। জাতিসংঘের শক্তি প্রয়োগের নীতিমালায় জবাবদিহির ক্ষেত্রে শুধু যারা শক্তি প্রয়োগ করছেন তারা নন, যারা পরিকল্পনাকারী, যিনি তার নির্দেশদাতা ও প্রশিক্ষণ প্রদানকারীরাও এর দায় এড়াতে পারেন না।

জনমুখী, জবাবদিহিমূলক, দক্ষ ও নিরপেক্ষ পুলিশ বাহিনী গড়ে তুলতে অন্তর্বর্তী সরকার ‘‌পুলিশ সংস্কার কমিশন’ গঠন করেছে। সংস্কারের মাধ্যমে আইনি কাঠামোসহ পুলিশি সেবা, সক্ষমতা ও ইতিবাচক ধ্যানধারণার ক্ষেত্রে আমূল পরিবর্তন আনতে হবে। শুধু রাজধানীই নয়, পুলিশ সংস্কারে গোটা দেশ ও বাহিনীকে গুরুত্ব দিতে হবে। পুলিশকে সেবামুখী করতে এবং মামলা ও এর তদন্ত, গ্রেফতার এবং অভিযানসহ সব ক্ষেত্রে জবাবদিহির আওতায় আনতে শক্ত কাঠামো তৈরি করতে হবে। এজন্য পুলিশ-সংক্রান্ত কিছু আইন ও বিধান যুগোপযোগী করতে উদ্যোগী হতে হবে সরকারকে। রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ সম্পূর্ণ বন্ধ করে পুলিশের পদায়নে দক্ষতা ও যোগ্যতায় গুরুত্ব দিতে হবে। নিয়োগ প্রক্রিয়া থেকে শুরু করে পদোন্নতি ও পদায়নের জায়গাগুলোয় শতভাগ স্বচ্ছতা আনা উচিত। ঢাকামুখী প্রবণতা থেকে বেরিয়ে এসে অপরাধ দমনে সব শহরকে সমান গুরুত্ব দিয়ে পুলিশের পদায়ন নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।