শুরু থেকেই বিভাগটি ছিল রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং স্বাধীন চিন্তা নির্মাণের এক দার্শনিক প্রসূতিগার। আমরা প্রতি বছর বিভাগ দিবসে কেবল আনন্দ অনুষ্ঠানে সীমাবদ্ধ থাকি না; বরং সমাজ ও রাষ্ট্রের গভীরতম বুদ্ধিবৃত্তিক সংকটগুলোকে দর্শন ও তাত্ত্বিক কাঠামোর আলোয় বিশ্লেষণ করি। সেই ঐতিহাসিক দায়বদ্ধতা থেকেই এ বছর আয়োজিত সেমিনারের মূল প্রতিপাদ্য, ‘রাজনীতি, ক্ষমতা ও সাংবাদিকতার আন্তঃসংশ্লেষ: তত্ত্ব, বাস্তবতা ও ভবিষ্যৎ।’

যখন আমরা রাজনীতি, ক্ষমতা এবং সাংবাদিকতার সম্পর্ক নিয়ে কথা বলি, তখন আমাদের দুটি মৌলিক দার্শনিক প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়। প্রথম প্রশ্নটি সত্তাতাত্ত্বিক বা অন্টোলজিক্যাল। বাস্তবতার প্রকৃতি কী? সংবাদের মধ্যে যে জগৎটি দেখানো হয়, তা কি বস্তুগতভাবে বিদ্যমান আসল বাস্তবতা নাকি ক্ষমতার নির্মাণে তৈরি করা কৃত্রিম সামাজিক বাস্তবতা? দ্বিতীয় প্রশ্নটি জ্ঞানতাত্ত্বিক বা ইপিস্টেমোলজিক্যাল। আমরা কীভাবে সত্যকে জানি? সংবাদে প্রকাশিত তথ্যটি কতটা বস্তুনিষ্ঠ এবং সত্য হিসেবে আমরা যা গ্রহণ করছি, তার জানার প্রক্রিয়াটি কতটা নিরপেক্ষ ও প্রভাবমুক্ত?

অন্টোলজিক্যাল বা সত্তাতাত্ত্বিক দৃষ্টিতে, সাংবাদিকতার মূল অনুসন্ধান হলো সমাজ ও রাজনীতিতে বিদ্যমান ‘বাস্তবতা’ বা ‘বিইং’। ফরাসি দার্শনিক জঁ বোদ্রিয়ার তার সিমুল্যাকরা অ্যান্ড সিমুলেশন ধারণায় দেখিয়েছিলেন, ক্ষমতা যখন সংবাদপত্র ও মিডিয়াকে পুরোপুরি প্রভাবিত করে, তখন আসল বাস্তবতা বিলুপ্ত হয়ে তৈরি হয় এক ‘হাইপাররিয়্যালিটি’ বা ছায়া-বাস্তবতা। রাজনীতি ও ক্ষমতার এলিটরা সমাজদেহে নিজেদের সুবিধাজনক এক কৃত্রিম বাস্তবতা বা সোশ্যাল কনস্ট্রাকশন তৈরি করতে চায়। সাধারণ মানুষ সেই কৃত্রিম ছবিকেই সত্য বলে ধরে নেয়। ফলে সাংবাদিকতার প্রাথমিক সত্তাতাত্ত্বিক সংকট হলো: সংবাদ কি বাস্তবতার প্রকৃত প্রতিচ্ছবি ধরে রাখছে, নাকি ক্ষমতার তৈরি ছায়াছবিকে পুনরুৎপাদন করছে?

ইপিস্টেমোলজিক্যাল বা জ্ঞানতাত্ত্বিক দৃষ্টিতে, ক্ল্যাসিক্যাল উদারনৈতিক দর্শনে ধরে নেয়া হয়েছিল যে সাংবাদিকতা হলো নিরপেক্ষ তথ্য প্রমাণের মাধ্যম—যেখানে সাংবাদিক একজন ‘বস্তুনিষ্ঠ পর্যবেক্ষক’ হিসেবে সত্য প্রকাশ করবেন। কিন্তু নোয়াম চমস্কি ও এডওয়ার্ড হারম্যান তাদের ম্যানুফ্যাকচারিং কনসেন্ট তাত্ত্বিক কাঠামোতে প্রমাণ করেছেন, জ্ঞানতাত্ত্বিক প্রক্রিয়ায় নিউজরুমের ফিল্টারিং, করপোরেট মালিকানা, রাজনৈতিক চাপ এবং বিজ্ঞাপনের অর্থনৈতিক কাঠামো সত্য জানার প্রক্রিয়াকেই দূষিত করে ফেলে। ফলে সংবাদমাধ্যম ‘সত্য উদ্ঘাটন’ না করে রাজনৈতিক ক্ষমতার অনুকূলে ‘সম্মতি উৎপাদন’ করতে শুরু করে। ইয়ুর্গেন হাবারমাসের পাবলিক স্পিয়ার বা ‘গণপরিসর’ ধারণাও আজ ইপিস্টেমোলজিক্যাল সংকটে—যেখানে মুক্ত আলোচনায় সত্যে পৌঁছানোর বদলে ক্ষমতার অপকৌশলে জনমতকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে পরিচালিত করা হচ্ছে।

এ অন্টোলজিক্যাল ও ইপিস্টেমোলজিক্যাল বোঝাপড়ার আলোয় আমরা যখন বাংলাদেশের বাস্তবতার দিকে তাকাই, তখন এক জটিল ও দ্ব্যর্থবোধক চিত্র ফুটে ওঠে। বাংলাদেশের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে গণমাধ্যম সবসময়ই রাজনৈতিক বিপ্লব ও গণতান্ত্রিক সংগ্রামের অনুঘটক ছিল। কিন্তু আধুনিক যুগে এসে এটি রাজনীতি, করপোরেট পুঁজি এবং আইনি ব্যবস্থার এক ত্রিমুখী গোলকধাঁধায় বন্দি হয়ে পড়েছে।

রাজনৈতিক ক্ষমতার অন্টোলজি

বাংলাদেশে ‘পার্টিসান জার্নালিজম’ বা দলীয় মেরুকরণের কারণে বস্তুনিষ্ঠ বাস্তবতার বদলে দলীয় রাজনৈতিক আখ্যান (পলিটিক্যাল ন্যারেটিভ) সত্যের স্থান দখল করে নিয়েছে। ক্ষমতার পরিবর্তন হলেও মিডিয়ার ওপর প্রভাব বিস্তারের ধরন খুব একটা বদলায় না।

করপোরেট ক্ষমতার ইপিস্টেমোলজি

আজ মিডিয়ার বড় অংশই ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর হাতে চালিত। চমস্কির তাত্ত্বিক ফিল্টারের মতো, এখানেও অর্থনৈতিক সুবিধা রক্ষা করতে গিয়ে সম্পাদকীয় স্বাধীনতা ও নিউজরুমের সত্য অনুসন্ধানের ক্ষমতা বিকিয়ে দিতে হয়।

কাঠামোগত ভয় ও আত্ম-সেন্সরশিপ

আইনি জটিলতা এবং ডিজিটাল পরিবেশের ঝুঁকির কারণে সাংবাদিকরা স্বতঃস্ফূর্ত সত্য প্রকাশের বদলে ‘আত্ম-সেন্সরশিপ’ (সেলফ সেনসরশিপ)-এর আশ্রয় নেন। ক্লাসরুমে আমরা শিক্ষার্থীদের যে তাত্ত্বিক প্রজ্ঞা ও নৈতিক সততার জ্ঞান প্রদান করি, বাস্তব কাজের ক্ষেত্রে নিউজরুমের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক চাপ ও আইনি ভীতি তাদের সেই জ্ঞানকে প্রয়োগ করতে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে।

আমরা এমন একসময় দাঁড়িয়ে আছি যখন প্রথাগত ক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও অ্যালগরিদমের আধিপত্য। এখন আমাদের মুখোমুখি হতে হচ্ছে ‘পোস্ট-ট্রুথ’ বা ‘উত্তর-সত্য’ যুগের ইপিস্টেমোলজিক্যাল চ্যালেঞ্জের।

ডিপফেক, সিন্থেটিক মিডিয়া, ইকো-চেম্বার এবং অ্যালগরিদমিক কারসাজি বাস্তবতার অস্তিত্বকেই (অন্টোলজিক্যাল রিয়ালিটি) প্রতিনিয়ত ভেজালযুক্ত করছে। কোনটা প্রকৃত ঘটনা আর কোনটা কৃত্রিমভাবে তৈরি—তা চেনা আজ অসম্ভব হয়ে উঠছে। এ ঝোড়ো হাওয়ায় সাংবাদিকতার ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করতে হলে আমাদের প্রয়োজন ‘ফ্যাক্ট-চেকিং’, ‘ডেটা জার্নালিজম’ এবং গভীরতর ক্রিটিক্যাল মিডিয়া লিটারেসি।

আমি গভীরভাবে বিশ্বাস করি, রাজনীতি বদলাবে, ক্ষমতার পালাবদল হবে, অ্যালগরিদম পরিবর্তিত হবে; কিন্তু বস্তুনিষ্ঠ তথ্য, পেশাগত সততা এবং দর্শনের মৌলিক সত্যের সন্ধান কখনই মূল্যহীন হবে না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের কাজ হলো এমন এক তরুণ প্রজন্ম গড়ে তোলা, যারা অন্টোলজিক্যাল সচেতনতা নিয়ে বাস্তবতার গভীরে ঢুকবে এবং ইপিস্টেমোলজিক্যাল কঠোরতা দিয়ে সত্যকে ঝালিয়ে নেবে।

এ সেমিনারের গভীর আলোচনার মধ্য দিয়ে আমরা রাজনীতি, ক্ষমতা ও সাংবাদিকতার সব জটিল গোলকধাঁধা কাটিয়ে সত্য, ন্যায় ও নিরপেক্ষতার নতুন আলোয় আলোকিত হই।

(ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত ‘বিভাগ দিবস ও সেমিনার ২০২৬’-এর সভাপতির বক্তব্যের মূল অংশ)

কাজী মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান: অধ্যাপক ও চেয়ারপারসন (ভারপ্রাপ্ত), গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ এবং ডিন, সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়