দেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি বেসরকারি খাত। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানের প্রায় ৯০ শতাংশ এ খাতের ওপর নির্ভরশীল। পাশাপাশি শিল্পের উৎপাদন, বিপণন কিংবা সেবা খাতের সিংহভাগও বেসরকারি খাতনির্ভর। এমন প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে সহজেই অনুমান করা যায়, এ খাতের ওপর যেকোনো অভিঘাত দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। কিংবা বর্তমানে অর্থনীতিতে যেসব সংকট বিরাজ করছে, সে পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে বেসরকারি খাতের জন্য স্বস্তিদায়ক উদ্যোগ নেয়া অপরিহার্য। কিন্তু বাস্তবে এর ভিন্ন চিত্র পরিলক্ষিত হচ্ছে।

বেসরকারি খাতের প্রসারে কিছু বিষয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, যার মধ্যে অন্যতম ব্যাংক ঋণ ও বিনিয়োগ। ঋণ ও বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধি না ঘটলে এ খাতের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের গতি শ্লথ হয়ে আসে। ঋণপ্রবাহ না বাড়ার অন্যতম একটি কারণ ব্যাংকের সুদহার ও নীতি সুদহার বৃদ্ধি। যখন সরকার এ সুদহার বাড়ায়, তখন ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাদের ঋণ গ্রহণের প্রবণতা কমে। বাড়তি সুদের বোঝা তাদের নিরুৎসাহিত করে ঋণ নিতে। আবার ঋণপ্রবাহ না বাড়লে এতে বিনিয়োগও বাধাগ্রস্ত হয়। কারণ ঋণ প্রবৃদ্ধি না হওয়ার অর্থ কর্মকাণ্ডের শ্লথগতি। ফলে স্বাভাবিকভাবে বিনিয়োগকারীরাও নতুন বিনিয়োগে নিরুৎসাহিত বোধ করেন।

দুঃখজনকভাবে দেশের বেসরকারি খাত দীর্ঘদিন ধরে ধুঁকে ধুঁকে চলছে। ঋণপ্রবাহ অনেকটাই স্থবির হয়ে আছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম আট মাসে (জুলাই-ফেব্রুয়ারি) দেশের বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ বেড়েছে মাত্র ২ দশমিক ৬৩ শতাংশ। গত অর্থবছরের একই সময়ে প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৫ দশমিক ৫৩ শতাংশ। এমনকি ২০২৪-এর ফেব্রুয়ারি থেকে চলতি বছরের একই সময়ে ঋণ প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৬ দশমিক ৮২ শতাংশ, যা গত ২১ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংক নির্বাহীরা বলছেন, বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির যে চিত্র বর্তমানে পরিলক্ষিত হচ্ছে, সেটিও নতুন ঋণ নয়। বরং অনাদায়ী সুদ ও সুদহার বৃদ্ধির প্রভাবে স্থিতি বাড়ছে।

ঋণপ্রবাহে এ মন্থরতার কারণ খুঁজতে গেলে প্রথমেই সামনে আসে নীতি সুদহার বৃদ্ধি প্রসঙ্গ। বিশ্বব্যাপী মূল্যস্ফীতির লাগাম টেনে ধরার মৌলিক এক কৌশল হলো নীতি সুদহার বৃদ্ধি। দেশে খাদ্য ও খাদ্য-বহির্ভূত পণ্যের স্তর ‍দিন দিন স্ফীত হয়ে উঠলে এক পর্যায়ে বাংলাদেশ ব্যাংকও তা ‍নিয়ন্ত্রণে সে পথেই হাঁটা শুরু করে। বাজারে অর্থ সরবরাহের লাগাম টেনে ধরে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টায় দফায় দফায় বাড়িয়েছে নীতি সুদহার, যা বর্তমানে দাঁড়িয়েছে ১০ শতাংশে। যদিও এতে মূল্যস্ফীতির হারে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসেনি, কমবেশি ৯ শতাংশের ঘরেই রয়েছে সার্বিক মূল্যস্ফীতির হার।

স্বাভাবিকভাবে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ না বাড়ায় দেশের শিল্প উৎপাদন ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের গতি কমেছে। এতে উৎপাদন ব্যাহত ও সরবরাহ শৃঙ্খলে বিঘ্ন ঘটেছে, যা পক্ষান্তরে বেশির ভাগ সময় বাজারদর আরো উসকে দিয়েছে। সেই সঙ্গে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টিও ব্যাহত হয়েছে। অর্থাৎ একদিকে মূল্যস্ফীতি কমেনি, অন্যদিকে বেসরকারি খাতের শ্লথগতির নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে। এমন পরিস্থিতি বিবেচনায় বলা যায়, নানামুখী সংকটে থাকা অর্থনীতির পুনরুদ্ধারের পথ দিন দিন আরো সংকুচিত হয়ে চলেছে। বেসরকারি খাতকে চাপে রেখে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ বা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের গতি বাড়ানো কঠিন হবে, যা বর্তমানে সবচেয়ে বেশি উদ্বেগের জায়গা। যে দেশে কর্মসংস্থানের প্রধান উৎস বেসরকারি খাত, সে দেশে ঋণপ্রবাহ কমে যাওয়া নিঃসন্দেহে বড় ধরনের অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের পূর্বাভাস। তাছাড়া জ্বালানি সংকট, অপ্রতুল রিজার্ভ, দুর্নীতি, আমলাতান্ত্রিক জটিলতাসহ বিবিধ কারণে এরই মধ্যে নতুন বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও স্থবিরতা তৈরি হয়েছে। সব মিলিয়ে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান ঝুঁকির মুখে রয়েছে। এমন প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে বেসরকারি খাতবান্ধব নীতি কৌশল অতীত জরুরি হয়ে পড়েছে এবং এর দ্রুত বাস্তবায়নও আবশ্যক।

বেসরকারি খাত তথা ব্যবসা-বাণিজ্য, কর্মসংস্থানের সম্প্রসারণ হলে অর্থনীতি গতিশীল হবে। এজন্য দরকার এ খাতে ঋণপ্রবাহ বাড়ানো এবং দেশী-বিদেশী বিনিয়োগ নিশ্চিত করা। এ দুই অনুষঙ্গ ছাড়া বেসরকারি খাতের উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ কঠিন। বিগত সরকারঘনিষ্ঠদের ব্যাংক লুটপাট, দেশী-বিদেশী উৎস থেকে সরকারের ঋণনির্ভরতা, লাগামহীন দুর্নীতি, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, খেলাপি ঋণ বেড়ে যাওয়া, রিজার্ভ সংকট ও বিনিময় হারের অস্থিতিশীলতায় এক ধরনের কোণঠাসা হয়েছিল বেসরকারি খাত। সে জায়গা থেকে বেসরকারি খাতকে টেনে তোলা জরুরি। নয়তো ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিস্থিতি আরো খারাপ হবে। বাড়তি সুদহারের কারণে খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির ঝুঁকি তৈরি হবে। এতে ব্যবসায়ীরাও আরো নাজুক পরিস্থিতিতে পড়বেন। এমনিতে উচ্চ মূল্যস্ফীতির দরুণ ব্যবসার খরচ বেড়েছে। তাছাড়া ব্যাংক সুদহার ও নীতি সুদহার বাড়ানোয় নতুন বিনিয়োগের মাত্রাও কমেছে। আবার নতুন বিনিয়োগ না হলে তাতেও ঋণের চাহিদা কমে ঋণ প্রবৃদ্ধি ব্যাহত হয়। এসব মিলিয়ে দীর্ঘদিন ধরে অনেকটা ধুঁকে ধুঁকে চলছে বেসরকারি খাত। এ বাস্তবতায় কীভাবে ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটানো যায় এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা যায় তা নিয়ে সরকারের কাজ করা আবশ্যক। বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ বাড়ানো না গেলে অর্থনীতির ক্ষত আরো গভীর হবে। আর বেসরকারি খাতের গতি বাড়লে তা সামষ্টিক অর্থনীতির গতিশীলতা বাড়াতে সহায়ক ভূমিকা রাখবে।

অবশ্য এজন্য সামাজিক ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা-অস্থিতিশীলতাও দূর করা প্রয়োজন। কারণ গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে নীতি ধারাবাহিকতার অনিশ্চয়তায় ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাদের আগ্রহ কমেছে নতুন বিনিয়োগে। বলা বাহুল্য, এমন পরিস্থিতিতে দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক অগ্রগতির পথ অনেকটাই সংকুচিত হয়েছে। বেসরকারি খাতের জন্য ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নিয়ে সে পথ প্রশস্ত করা হবে—এটিই প্রত্যাশা।