মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও কাঙ্ক্ষিত প্রবৃদ্ধি অর্জনের মধ্যে ভারসাম্য রাখতে মুদ্রানীতি প্রণয়ন ও প্রকাশ করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। দেশের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় মুদ্রানীতি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এর মাধ্যমে অভ্যন্তরীণ ঋণ, মুদ্রা সরবরাহ, অভ্যন্তরীণ সম্পদ ও বৈদেশিক সম্পদ কতটুকু বাড়বে বা কমবে, তার একটি পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংক বছরে দুবার (জানুয়ারি-জুন ও জুলাই-ডিসেম্বর সময়ের জন্য) মুদ্রানীতি ঘোষণা করে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক একদিকে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে চায়, অন্যদিকে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও বিনিয়োগ যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেদিকেও নজর দেয়। এদিকে এবারের মুদ্রানীতিতে গতবারের মতোই নীতি সুদহার ১০ শতাংশ রেখে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের প্রচেষ্টা লক্ষ করা যাচ্ছে। চার বছর ধরে সংকোচনমুখী মুদ্রানীতি অনুসরণ করা হলেও মূল্যস্ফীতি কাঙ্ক্ষিতভাবে নিয়ন্ত্রণে আসেনি; বরং সর্বশেষ গত মে মাসে তা বেড়ে ৯ দশমিক ৪২ শতাংশে পৌঁছেছে যদিও জুনে সামান্য কমে ৯ দশমিক ১৬ শতাংশে নেমেছে। সরকারের বাজেটের লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নতুন অর্থবছরে গড় মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য ঠিক করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। যদিও এখন মূল্যস্ফীতি লক্ষ্যের চেয়ে প্রায় ২ শতাংশ বেশি রয়েছে। বিশেষ করে জ্বালানি তেল এবং এলএনজির মূল্যবৃদ্ধি এবং ফলস্বরূপ পরিবহনে বাড়তি ভাড়া মূল্যস্ফীতিকে উসকে দিয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তাছাড়া আমাদের দেশের মূল্যস্ফীতি অনেকটাই সরবরাহজনিত। ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক শুধু নীতি সুদহার সমন্বয় করে মুদ্রাস্ফীতি কমাতে পারবে না বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। এক্ষেত্রে পণ্যের সরবরাহ বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়া জরুরি। সেক্ষেত্রে উৎপাদনমুখী শিল্পে ঋণপ্রাপ্তি সহজ করা যেতে পারে। একদিকে মুদ্রাস্ফীতি কমানো আবার অন্যদিকে ঋণ বাড়ানোর কথা বৈপরীত্য বলে মনে হয়। তবে এটা নিয়ে অনেক আলোচনা হতে পারে। কিন্তু বাস্তবে উন্নয়নশীল দেশে অনেক ক্ষেত্রে মূল্যস্ফীতিকে কিছুটা সহনীয় রেখে উৎপাদনশীল খাতে ঋণ বাড়ানোর দিকে অনেকেই মত দেন। কারণ উৎপাদনশীল খাতে ঋণ বাড়লে পণ্যের সরবরাহ যেমন বাড়ে তেমনি কর্মসংস্থানে ইতিবাচক ফলাফল লক্ষ করা যায়। এ দ্বৈরথ অর্থনীতিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে সহায়তা করে। অর্থনীতির পালে হাওয়া লাগলে অবশ্যম্ভাবীভাবে সব সূচকে ইতিবাচক ধারা লক্ষ করা যায়, যা পর্যায়ক্রমে মূল্যস্ফীতিসহ অর্থনীতির নেতিবাচক প্রভাবকে প্রতিহত করে। অন্যদিকে আগামী ছয় মাসে ৬ দশমিক ৮ শতাংশ হারে বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে এবং ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ১৭ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সবশেষ তথ্যমতে, গত মে মাসে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি ছিল ৫ শতাংশ। কিন্তু জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত চলমান মুদ্রানীতিতে ৮ দশমিক ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক। সেই লক্ষ্য কোনো মাসেই অর্জিত হয়নি। এবার ছয় মাসের জন্য নির্ধারিত ৬ দশমিক ৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন হবে কিনা তা নিয়ে সংশয় থেকেই যায়। কারণ নীতি সুদহার ১০ শতাংশেই অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। ঋণের উচ্চ সুদহার বজায় রেখেই প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে চায় বাংলাদেশ ব্যাংক। এরই মধ্যে ঋণের সুদহারের ক্ষেত্রে (আমানত এবং ঋণের সুদহারের পার্থক্য) ৪ শতাংশ স্প্রেড রাখার নির্দেশনা প্রদান করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এটা হলে ঋণের সুদ কমার সুযোগ আছে। তাতে করে ভালো ব্যাংকগুলো তার গ্রাহকদের স্বল্প মুনাফায় ঋণ দিতে পারবে। তবে ব্যাংকের মুনাফায় বড় পরিবর্তন আসতে পারে। অন্যদিকে স্প্রেড কম থাকায় ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের ঋণের সুযোগ কমতে পারে। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রণোদনা প্যাকেজ এবং পুনঃঅর্থায়ন সেই ঘাটতি কমাতে সাহায্য করবে। তবে স্প্রেড নির্দিষ্ট করে সুদহার বেঁধে দেয়ার চেয়ে বাজারভিত্তিক সুদহার হলে সুস্থ প্রতিযোগিতার মাধ্যমে এটি নির্ধারিত হলে গ্রাহকরা বেশি সুবিধা পেতেন বলে অনেক অর্থনীতিবিদ মনে করেন। বর্তমানে বাজারে ঋণের চাহিদা কম বলেই বেসরকারি খাতে ঋণ বাড়ছে না। ঋণের চাহিদা বাড়াতে পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ-গ্যাসের সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি। ঋণের সরবরাহ বাড়াতে বাংলাদেশ ব্যাংকের ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ বিশেষ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা যায়। নতুন সরকার প্রথম বাজেট, নতুন গভর্নরের প্রথম মুদ্রানীতি এবং সামগ্রিক উদ্যোগ আমাদের সেই আশার আলোই দেখাচ্ছে। দ্রুতই আমাদের অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াক সেই প্রত্যাশায় গোটা জাতি তাকিয়ে আছে।

আনোয়ার ফারুক তালুকদার: ব্যাংকার ও অর্থনীতি বিশ্লেষক