টেক্সটাইল, নির্মাণ, জ্বালানি, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং, চামড়া, তৈরি পোশাক কিংবা শিপিংসহ বাংলাদেশে শিল্প খাত দ্রুত সম্প্রসারণ হচ্ছে। সব ক্ষেত্রেই নতুন নতুন উদ্যোগ ও প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ছে। এসব খাতে প্রয়োজনীয় দক্ষ মানবসম্পদের ঘাটতি দিন দিন প্রকট হচ্ছে। দেশের পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটগুলো প্রতি বছর হাজার হাজার ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার তৈরি করছে। অথচ দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার অভাবে তারা বেশির ভাগই বেকার থাকছেন কিংবা চাকরি পাচ্ছেন না। এতে একদিকে যেমন শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বাড়ছে, অন্যদিকে শিল্প খাতে দক্ষ কর্মীর অভাবে বিদেশী কর্মীদের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটগুলোয় মানসম্মত শিক্ষার অভাব, সেকেলে পাঠ্যক্রম, আধুনিক প্রযুক্তি ও যন্ত্রপাতির অভাব এবং শিল্পের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানগুলোর দুর্বল সংযোগের কারণেই দক্ষ ও অভিজ্ঞ কর্মী তৈরি করা যাচ্ছে না।

কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের তথ্যমতে, দেশে ৫০টি সরকারি ও ৪৩২টি বেসরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট আছে। এসব প্রতিষ্ঠান থেকে প্রতি বছর প্রায় পাঁচ হাজার ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার পাস করেন। এর মধ্যে শুধু মেকানিক্যাল টেকনোলজিতেই সরকারি ও বেসরকারি মিলে ভর্তি হন প্রায় সাত হাজারেরও বেশি শিক্ষার্থী। অথচ শিল্প খাতের চাহিদা অনুযায়ী তারা চাকরিযোগ্য হয়ে উঠতে পারছেন না। ২০১৮ সালে কক্সবাজার পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের মেকানিক্যাল টেকনোলজি বিভাগ থেকে জয়নাল আবেদীন পাস করেন। তিনি বণিক বার্তাকে জানান, সাত বছর পেরিয়ে গেলেও তিনি উপযুক্ত কোনো চাকরি পাননি। কম্পিউটারে প্রশিক্ষণ নিয়ে তিনি একটি স্কুলে কম্পিউটার শিক্ষক হিসেবে চাকরি করছেন। আবার যারা চাকরি পেয়েছেন তাদের বেতনও খুব কম। বেতন কম হওয়ায় অনেকেই চাকরি পরিবর্তন করছেন বা বিদেশে যাচ্ছেন। দক্ষ ও অভিজ্ঞ কর্মী তৈরি না হওয়ার পেছনে প্রধান কারণ বাংলাদেশের কারিগরি শিক্ষা এখনো পুরনো পাঠ্যক্রমে চলছে। এখনো পুরনো যন্ত্রপাতির ওপর নির্ভরশীল। যখন বিশ্বের শিল্প খাত দ্রুত অটোমেশন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও স্মার্ট ম্যানুফ্যাকচারিংয়ের যুগে প্রবেশ করছে, সেখানে শিক্ষার্থীরা এখনো পুরনো মেশিনারিজে প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন। ফলে তারা আধুনিক যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা অর্জনে ব্যর্থ। তারা শিল্পের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ ও অভিজ্ঞ না হওয়ায় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে বিদেশীদের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।

কারিগরি শিক্ষায় যুগোপযোগী পাঠ্যক্রম, আধুনিক ল্যাবরেটরি ও দক্ষ প্রশিক্ষকের ঘাটতি দেশের শিল্প খাতের জন্য বড় প্রতিবন্ধকতা। ফলে শিক্ষার্থীদের ডিপ্লোমা পাসের সার্টিফিকেট আছে কিন্তু শিল্পে প্রয়োগযোগ্য বাস্তব দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা নেই। কয়েক বছর ধরেই সরকারি-বেসরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের সংখ্যাও বেড়েছে। তবে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে যেসব প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে সেগুলোর বেশির ভাগেই মানসম্মত শিক্ষার পরিবেশ নেই। তাছাড়া শিক্ষক সংকট, উপযুক্ত শিক্ষার পরিবেশের অভাব এবং শিক্ষাজীবন শেষে চাকরিক্ষেত্রে পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা না পাওয়ায় ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমে যাচ্ছে। কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের সর্বশেষ বার্ষিক প্রতিবেদনেও এ তথ্য উঠে এসেছে। দেশের সরকারি-বেসরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটগুলোয় ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষে মোট আসন ছিল ১ লাখ ৭১ হাজার ৫০০। এর বিপরীতে ভর্তি হয় ৬৮ হাজার ৭৮২ শিক্ষার্থী, যা গত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। অর্থাৎ ইনস্টিটিউটগুলোয় প্রায় ৬০ শতাংশ আসনই ওই শিক্ষা বছরে ফাঁকা ছিল।

দক্ষ ও অভিজ্ঞ মানবসম্পদ গড়ে তুলতে উন্নত দেশের আদলে দেশের কারিগরি শিক্ষা ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে হবে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপান ও জার্মানি প্রায় ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। তার পরও দেশ দুটি আজ বিশ্ব অর্থনীতিতে শক্তিশালী অবস্থান বজায় রেখেছে। জাপান ও জার্মানির বিস্ময়কর উন্নতির প্রধান সোপান হচ্ছে কারিগরি শিক্ষা। কারিগরি শিক্ষার হার জাপানে ৭৩ শতাংশ ও জার্মানিতে ৭১ শতাংশ। শিক্ষার পাঠ্যক্রমও আধুনিক তথা শিল্পের চাহিদামাফিক ও মান খুবই উন্নত। এশিয়ার বেশ কয়েকটি দেশের উন্নতির প্রধান সোপান কারিগরি শিক্ষা। মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, চীন, উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়ার উন্নয়নের মূলে কারিগরি শিক্ষা। সেই অবস্থান থেকে এখনো অনেক দূরে বাংলাদেশ। দেশে কারিগরি শিক্ষার হার বাড়াতে পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর যন্ত্রপাতি ও কোর্সের জন্য প্রয়োজনীয়সংখ্যক ল্যাবরেটরি না থাকার বিষয়টিও উদ্বেগজনক। যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে পাঠ্যক্রমকে সাজানোর পাশাপাশি আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর মেশিনারিজ নিশ্চিত করতে হবে।

বিশ্বে নতুন নতুন অনেক প্রযুক্তি, মেশিনারিজ আসছে। কিন্তু শিক্ষার্থীরা এখনো পুরনো প্রযুক্তি ও মেশিনারিজে প্রশিক্ষণ নিচ্ছে। শিক্ষার্থীদের শিল্পের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ ও অভিজ্ঞ করে তুলতে হলে আধুনিক প্রযুক্তি ও মেশিনারিজে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। আবার যারা প্রশিক্ষক রয়েছেন তাদেরও আধুনিক যন্ত্রের সঙ্গে অভিযোজন করার সক্ষমতা থাকতে হবে। আধুনিক যন্ত্রপাতি থাকলে ও প্রশিক্ষকরা দক্ষ হলে শিক্ষার্থীরা হাতে-কলমে শেখার পাশাপাশি দক্ষ জনশক্তি হয়ে উঠবে।

আরেকটি বিষয় লক্ষণীয়, দেশের আনাচে-কানাচে বেসরকারি পলিটেকনিক গড়ে উঠছে, যেখানে মানসম্মত শিক্ষার পরিবেশ ও দক্ষ শিক্ষকের অভাব রয়েছে। সেখানে শিক্ষার্থীরা সার্টিফিকেট পাচ্ছেন কিন্তু দক্ষতা অর্জন করতে পারছেন না। তাই কারিগরি প্রতিষ্ঠান বাড়ালেই হবে না, বরং মানসম্মত শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিতে বেশি জোর দিতে হবে।

কারিগরি শিক্ষাকে শিল্পোন্নয়ন কৌশলের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করতে হবে। শিল্পোন্নত দেশগুলোয় শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সমন্বয় রয়েছে। সেখানে পাঠ্যক্রমও শিল্পের চাহিদার সঙ্গে যুগোপযোগী। বাংলাদেশেও এমন সমন্বিত কাঠামো গড়ে তোলা জরুরি। শিল্পমালিক, উদ্যোক্তা ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে একসঙ্গে একটি বাস্তবসম্মত কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। যেখানে অগ্রাধিকার পাবে আধুনিক পাঠ্যক্রম, হালনাগাদ সিলেবাস, প্রশিক্ষক দক্ষতা বৃদ্ধি, আধুনিক ল্যাব স্থাপন, শিল্পে ইন্টার্নশিপ বাধ্যতামূলক করা। যারা কারিগরি শিক্ষায় পারদর্শী, তাদের ন্যায্য বেতন কাঠামো ও পেশাগত মর্যাদাও নিশ্চিত করতে হবে। বর্তমানে অনেক দক্ষ কর্মী কম বেতনের কারণে হতাশ হয়ে অন্য পেশায় চলে যাচ্ছেন। এভাবে দেশের অভ্যন্তরে দক্ষ জনবল ধরে রাখা সম্ভব নয়।

শিল্পের বাস্তব চাহিদা ও বৈশ্বিক প্রযুক্তির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে শিক্ষাক্রম সাজাতে হবে। প্রশিক্ষকদের আধুনিকায়ন, ল্যাব ও যন্ত্রপাতি উন্নয়ন এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে পারস্পরিক অংশীদারত্ব ছাড়া কারিগরি শিক্ষায় পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়। বেসরকারি পর্যায়ে যেসব পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে মানসম্মত শিক্ষার পরিবেশ নেই, সেগুলোর বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেয়া জরুরি। শিক্ষাজীবন শেষ করে কোনো শিক্ষার্থীকে যাতে বেকার বসে না থাকতে হয় সে রকম শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি।