দেশে মোট রফতানি আয়ের সিংহভাগ আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে। গত অর্থবছরে রফতানিতে এ খাতের অবদান দাঁড়িয়েছে ৮১ দশমিক ৪৯ শতাংশে। আবার তৈরি পোশাক রফতানির অন্যতম গন্তব্য যুক্তরাষ্ট্র। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্যে দেখা গেছে, অর্থমূল্য বিবেচনায় যুক্তরাষ্ট্রে মোট রফতানির ৮৭ শতাংশই তৈরি পোশাক। এর বাইরে তৈরি পোশাকের আরেকটি গন্তব্য হলো ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বাজার। এ তথ্যগুলো দুটি বিষয়কে স্পষ্ট করেছে। প্রথমত, দেশের রফতানি বাণিজ্যে তৈরি পোশাকের একক আধিপত্য রয়েছে। এর অর্থ, রফতানিতে একক পণ্য ও গন্তব্যের ওপর অতিনির্ভরতা তৈরি হয়েছে। দ্বিতীয়ত, রফতানি পণ্য কিংবা গন্তব্যের বৈচিত্র্যায়ণ সম্ভব হয়নি। যদিও গত ২৫ বছরে রফতানি বৈচিত্র্যকরণের লক্ষ্যে নানা নীতি ও কর্মসূচি নেয়া হয়েছে। কিন্তু কোনো উদ্যোগই কাঙ্ক্ষিত ফল আনতে পারেনি। উল্টো বর্তমানে রফতানিতে পাট, চামড়া, হিমায়িত খাদ্য, কৃষিপণ্য কিংবা প্রকৌশল পণ্যের অবদান ক্রমেই কমছে। এতে বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, রফতানিতে একক খাত ও দেশের ওপর অতিনির্ভরতা দেশের অর্থনীতিকে ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে। রফতানি খাতে যেকোনো সময় বড় ধাক্কা আসতে পারে। এছাড়া এটি ভূ-অর্থনৈতিক চাপের কারণও হয়ে উঠছে, যা এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শুল্ক নিয়ে দরকষাকষির ক্ষেত্রে পরিলক্ষিত হয়েছে। এমন প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে সরকারকে মনোযোগ দিতে রফতানি পণ্যে বৈচিত্র্য আনতে। একই সঙ্গে রফতানির নতুন বাজার খুঁজে বের করতে হবে। নয়তো কূটনৈতিক ভারসাম্যও হুমকির মুখে পড়বে।

যুক্তরাষ্ট্র পাল্টা শুল্ক হার ২০ শতাংশে নামানোর ক্ষেত্রে কিছু শর্ত জুড়ে দিয়েছে। যদি পণ্য রফতানিতে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারের প্রতি অতিনির্ভরতা না থাকত তাহলে দেশটি অনেক শর্তই চাপানোর সুযোগ পেত না এবং বাংলাদেশও কূটনৈতিক আলোচনায় বেশি সুবিধা আদায় করতে পারত। তাই রফতানি গন্তব্য বহুমুখী করা জরুরি। এতে কূটনৈতিক অবস্থান দৃঢ় রাখা যাবে। চীন, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, ইইউ বা যে দেশেই পণ্য রফতানি করা হোক না কেন, অর্থনৈতিক স্বার্থকে প্রাধান্য দিতে হবে। ভূরাজনৈতিক সমীকরণের প্রভাব এক্ষেত্রে কোনোভাবেই পড়তে দেয়া যাবে না।

রফতানি বহুমুখীকরণের ক্ষেত্রে চীন অনুসরণীয় হতে পারে। কয়েক দশক আগে চীন শ্রমঘন শিল্প ও অপেক্ষাকৃত স্বল্প মূল্যের পণ্য রফতানির ওপর নির্ভরশীল ছিল। কিন্তু ধীরে ধীরে দেশটি নানা কৌশল নিয়ে উৎপাদনী সক্ষমতা বাড়িয়েছে। রফতানি পণ্য ও গন্তব্যে বৈচিত্র্য এনেছে। যে কারণে চীনকে আখ্যায়িত করা হয়েছে বিশ্বের কারখানা হিসেবে। এক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অবদান সরকারের নেয়া দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই শিল্পনীতি ও দক্ষ শ্রমিক। পোশাক বা খেলনা উৎপাদনের মতো শ্রমঘন শিল্প থেকে ক্রমশ দেশটি প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পে বিনিয়োগ বাড়িয়েছে এবং উচ্চমূল্যের পণ্য উৎপাদনে মনোযোগ দিয়েছে। বহুজাতিক কোম্পানিগুলোকে দেশটিতে কারখানা স্থাপনের সুযোগ দিয়েছে। এর মাধ্যমে দক্ষ জনবল ও প্রযুক্তি স্থানান্তর হয়েছে। এতে চীন বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে যুক্ত হতে পেরেছে। ইলেকট্রনিকস, মেশিনারি, বিদ্যুচ্চালিত গাড়ি, কেমিক্যাল, সেমি কন্ডাক্টার ইত্যাদি উৎপাদন ও রফতানিতে চীন বিশ্বে বড় প্রতিদ্বন্দ্বীতে পরিণত হয়েছে। চীন কেবল যুক্তরাষ্ট্র কিংবা ইইউ নয়, আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা, মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়ার অন্যান্য অঞ্চলের বাজারেও জায়গা করে নিয়েছে। আবার সড়ক ও যোগাযোগ অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগ করে চীন রফতানির সময় ও খরচও কমিয়েছে, যা তাদের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়িয়েছে। চীনের পাশাপাশি ভিয়েতনাম, দক্ষিণ কোরিয়া, ভারত প্রভৃতি দেশও অনেকটা একই উপায়ে রফতানি পণ্যে বৈচিত্র্য এনেছে। বাংলাদেশ কেন গত ২৫ বছরে নানা উদ্যোগ নেয়ার পর এক্ষেত্রে সফল হতে পারেনি সেই সমস্যাগুলো চিহ্নিত করা প্রয়োজন। অর্থনীতবিদ, খাতসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ, নীতিনির্ধারকরা সর্বদা এ বিষয়ে জোর দিয়ে আসছেন, কিন্তু তার পরও সফলতার মাত্রা কম। সবাইকে একযোগে টেকসই ও দীর্ঘমেয়াদি নীতি-কৌশলের দিকে হাঁটতে হবে।

বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের অন্যতম উৎস হলো রফতানি। বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত থেকে উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হলে (এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন) আন্তর্জাতিক বাজারে উন্মুক্ত প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হবে। এ সময় বিদ্যমান বাণিজ্যিক সুবিধা, যেমন শুল্কছাড় প্রভৃতি প্রত্যাহার করা হবে। এর প্রভাব পড়বে রফতানিতে। এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের (এডিবি) তথ্য অনুযায়ী, চূড়ান্তভাবে এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের পর শুল্কছাড় সুবিধা হারানোর ফলে বাংলাদেশের রফতানির পরিমাণ সাড়ে ৫-১৪ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে। আবার ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে জিএসপি প্লাস সুবিধা না পেলে রফতানির ক্ষেত্রে ১২ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপিত হতে পারে। এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত পাল্টা শুল্ক পোশাক রফতানিতে বেশকিছু চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। এমন পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে টিকে থাকতে হলে রফতানি পণ্য ও গন্তব্যের বহুমুখীকরণের বিকল্প নেই। আন্তর্জাতিক বাজারের চাহিদা বুঝে পণ্য উৎপাদনে যেতে হবে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, মধ্য এশিয়া, লাতিন আমেরিকা, আফ্রিকার উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি করা উচিত। ভবিষ্যতে যাতে কোনো একক দেশের আরোপিত শুল্কের কারণে বা শুল্ক সুবিধা প্রত্যাহারের কারণে রফতানি খাতে অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি না হয় সেই উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন।

এক সময় বাংলাদেশের শীর্ষ রফতানি পণ্য ছিল পাট ও পাটজাত পণ্য। মোট রফতানি আয়ের ৯৭ শতাংশই আসত পাট খাত থেকে। এজন্য পাটকে ‘সোনালি আঁশ’ হিসেবেও অভিহিত করা হতো। তবে সময়ের পরিক্রমায় পাটের জায়গা দখল করে নিয়েছে তৈরি পোশাক খাত। সত্তরের দশকে তৈরি পোশাক রফতানি শুরু হলেও এ খাতের বিকাশ হয়েছে এর পরের দশকগুলোয়। এ সময়ে রফতানিতে অন্যান্য খাতের অবদান কমার বিপরীতে পোশাক খাতের হিস্যা বেড়েছে। অর্থাৎ রফতানিতে একক পণ্যনির্ভরতার প্রবণতা দেশের সূচনালগ্ন থেকেই রয়েছে।

ডলারের হিসাবে রফতানির পরিমাণ বাড়লেও রফতানিতে গত দুই দশকে চামড়া ও জুতার অবদান কমে গেছে। আবার রফতানিতে হিমায়িত খাদ্য একসময় দ্বিতীয় অবস্থানে ছিল। যদিও পরবর্তী সময়ে খাতটি এ অবস্থান আর ধরে রাখতে পারেনি। ২০১৮ থেকে ২০২৩ সময়পর্বে প্রতি বছর রফতানিতে হিমায়িত খাদ্যের হিস্যা কমে ১ দশমিক ১ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। সর্বশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৪৪ কোটি ১৬ লাখ ডলারের হিমায়িত ও জীবন্ত মাছ রফতানি হয়েছে। এ সময়ে মোট রফতানিতে খাতটির অবদান ছিল দশমিক ৯১ শতাংশ। একই চিত্র লক্ষ করা যায় প্রকৌশল পণ্যের রফতানিতেও। এ পণ্য রফতানির পরিমাণ ও হিস্যা গত দুই দশকে বাড়লেও মোট রফতানিতে এর পরিমাণ খুব বেশি নয়। দুঃখজনক বিষয় হলো, কৃষিপ্রধান দেশ হওয়া সত্ত্বেও রফতানিতে কৃষিপণ্য এখনো উল্লেখযোগ্য অবস্থান দখল করতে পারেনি। সর্বশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১০০ কোটি ৬৯ লাখ ডলারের কৃষিপণ্য রফতানি হয়েছে, যা এ সময়ে মোট রফতানির ২ দশমিক শূন্য ৯ শতাংশ। এছাড়া গত অর্থবছরে মাত্র চারটি বাজার ইইউ, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও জাপান থেকেই মোট রফতানি আয়ের ৬৮ দশমিক ২৫ শতাংশ এসেছে। এমন হাতেগোনা পণ্য ও গন্তব্যের ওপর অতি নির্ভরতা থেকে রফতানি খাতকে অবশ্যই মুক্ত করতে হবে।